কুষ্টিয়ার বিভিন্ন এলাকায় চলছে আমন ধানের চারা রোপণের কাজ। জেলার ৬ উপজেলার কৃষকেরা ব্যস্ত সময় পার করছেন জমি প্রস্তুত, চারা রোপণ ও পরবর্তী পরিচর্যায়। কুষ্টিয়ার সদর, কুমারখালী, খোকসা, মিরপুর, ভেড়ামারা ও দৌলতপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় আমন ধানের চারা রোপণ করা হয়ে গেছে। উঁচু জমিতে অনেকেই রোপন করছেন। বৃষ্টির পানি ও অনুকূল আবহাওয়ায় অনেক জমিতে রোপণ কার্যক্রম জোরদার হয়েছে।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এর আগে কুষ্টিয়ায় এক মৌসুমে ৮৮ হাজার ৯১৯ হেক্টর জমিতে রোপা আমনের চাষ হয়েছিল এবং উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ৩ লাখ টন।

এবার ১লাখ ১৬ হাজার হেক্টর জমিতে আমনের আবাদ করা হচ্ছে। এদিকে কুমারখালীতে চলতি অর্থবছরে উফশী আমন ধানের আবাদ ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২ হাজার ২০০ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষককে বিনামূল্যে বীজ ও সার দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সময়মতো চারা রোপণ, সুষম সার প্রয়োগ, আগাছা ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজনীয় পরিচর্যা নিশ্চিত করা গেলে আমনের উচ্চ ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব। কৃষকরাও অনুকূল আবহাওয়া ও ন্যায্যমূল্য পাওয়ার প্রত্যাশায় আমন আবাদে মনোযোগী হয়েছেন।

কৃষকরা জানান, সময়মতো বৃষ্টি হওয়ায় আমন চাষে এবার সুবিধা হচ্ছে। তবে সার সরবরাহ নিয়ে কিছু এলাকায় কৃষকদের ভোগান্তির অভিযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক কুষ্টিয়ার উপজেলাগুলোতে আমন মৌসুমে প্রয়োজনীয় সার পেতে কৃষকদের সমস্যার কথা উঠে এসেছে।

চলতি কুষ্টিয়ায় রোপণ আমন চাষের শুরুতেই সার সংকটের মুখোমুখি হয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। প্রকারভেদে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কেজিতে ৫ থেকে ৯ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে সার বিক্রি করার অভিযোগ উঠেছে খুচরা বিক্রেতা ও ডিলারদের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে ইউরিয়া, টিএসপি এবং এমওপি (পটাশ) সারের ক্ষেত্রে ইচ্ছেমতো দাম হাঁকানো হচ্ছে। আমনের এই ভরা মৌসুমে ডিলারদের দোকানে গিয়ে বারবার খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী চাষিরা।

এক আমন চাষী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, সার কিনতে গেলে দোকান থেকে ৪/৫ দিন পর আসতে বলা হয়। কিন্তু নির্দিষ্ট দিন পার হয়ে গেলে বলা হয় সার শেষ হয়ে গেছে।

কৃষকদের অভিযোগ, মূলত সার গুদামে বা অন্যত্র মজুত করে রেখে রাতের আঁধারে ভ্যানে করে তা খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বেশি দামে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ড্যাপ সারের কেজি সরকারিভাবে ২৫ টাকা নির্ধারিত থাকলেও খুচরা বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ৪০ টাকা কেজি দরে।

একই ধরনের অভিযোগ করেন সদরের আলামপুরের জমির নামে অন্য এক চাষি। ডিলারদের কাছে সময়মতো সার না পেয়ে ক্ষোভ জানিয়ে ডিলারদের দোকানে না পাওয়ার আক্ষেপ প্রকাশ করেন তিনি।

কুমারখালী উপজেলার বাঁঝগ্রামের আমন চাষি রুস্তম আলী শেখ জানান, সেখানেও ডিলারদের কাছ থেকে চড়া দামে সার কিনতে হচ্ছে। ড্যাপের কেজি ২৫/২৬ টাকা এবং ইউরিয়া ৩২ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হচ্ছে। অনেক কৃষক সরকারের সঠিক মূল্যতালিকা ও সাম্প্রতিক দর পরিবর্তন সম্পর্কে না জেনে বাধ্য হয়েই চড়া দামে সার কিনছেন।

এদিকে খুচরা সার বিক্রেতা তপন জানান, ডিলাররাই আগে সারের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। পেঁয়াজ উঠার পর থেকেই ডিলাররা সার সংকট দেখিয়ে প্রতি বস্তায় সরকারি দামের চেয়ে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি রাখছে। বিভিন্ন জায়গা থেকে বাড়তি দামে সার সংগ্রহ করায় খুচরা বিক্রেতারাও বেশি দামে সার বেচতে বাধ্য হচ্ছেন বলে দাবি করেন তিনি।

তবে এই ধরনের সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সার ডিলাররা। ডিলার শরিফুল ইসলাম দাবি করেন, অতি সীমিত লাভে সার বিক্রি করা হচ্ছে। তাঁর ভাষ্যমতে, প্রতি বস্তা ইউরিয়া সারের সরকারি সরকারি মূল্য ১২৫০ টাকা, টিএসপি ১২৫০ টাকা, ডিএপি ৯৫০ টাকা এবং এমওপি ৯০০ টাকা। ডিলারদের বস্তাপ্রতি ১০০ টাকা পরিবহন খরচ দেওয়া হয়। খুচরা দোকানগুলোতে কৃষকরা বাকিতে সার কেনায় ৬ মাস বা ১ বছর পর টাকা পরিশোধ করার কারণে তারা কেজিতে ২৩ টাকা বেশি আদায় করতে পারে।

অতিরিক্ত দাম নেওয়ার বিষয়টি জানা নেই বলে জানিয়েছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ। কুষ্টিয়ায় সার সংকট ও দাম বৃদ্ধির কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কুষ্টিয়া সদর উপজেলার সভাপতি আজমল ইসলাম। তিনি বলেন, যে কৃষকদের আবাদকৃত ফসল খেয়ে সর্বশ্রেনীর মানুষ উপকৃত হচ্ছে অথচ এই কৃষকদের কোন মূল্যায়ন করা হচ্ছেনা। বরং কৃষি আবাদের উপকরণের দাম বৃদ্ধি করে চাষীদের আবাদে লোকসানের মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। সার সংকট দেখিয়ে চাষীদের চরম হয়রানী করা হচ্ছে।

শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। সেই সাথে কৃষকদের ন্যায্য মূল্যে সার পাওয়ার নিশ্চিত দাবী করেন।

কুষ্টিয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক ওয়াহিদুজ্জামান জানান, সারের দাম বেশি নেওয়ার কোনো তথ্য তাঁদের কাছে ছিল না। অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে তারা অবিলম্বে তদন্ত করে দেখবেন এবং ডিলার ও সাবডিলাররা কোনো অনিয়ম করছেন কি না তার সতত্যা যাচাই করবেন। ডিলার, খুচরা বিক্রেতা ও কৃষি বিভাগ পাল্টাপাল্টি দায় এড়ালেও শেষ পর্যন্ত সারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছেন সাধারণ কৃষকরাই।

রোপণ আমন মৌসুমের শুরুতে সারের ন্যায্যমূল্য ও সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা না গেলে চাষিরা ধান চাষে আগ্রহ হারাবেন বলে মনে করেন স্থানীয় কৃষক নেতারা। সারের বাজার নিয়ন্ত্রণে ও কৃষকদের লোকসান থেকে বাঁচাতে সরকারের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন জেলার কৃষকরা।