২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান এবং বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে বিগত দুই বছরে মাত্র ৬টি মামলার রায় ঘোষণা করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। প্রায় ১৪শ মানুষ হত্যা ও কয়েক হাজার মানুষ অঙ্গহানি হওয়া এবং কয়েকশ মানুষ গুম হওয়ার ঘটনায় ট্রাইব্যুনালে বিচার কাজ চলছে। এখনো অধিকাংশ আসামীকেই পুলিশ গ্রেফতার করতে পারেনি। রায় হওয়া মামলাগুলোরও অধিকাংশ আসামী এখনো পলাতক।
ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, ট্রাইব্যুনাল ঘোষিত ৬টি মামলার রায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ শীর্ষ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে রাজসাক্ষী হওয়ায় ৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে এ ছয় মামলায় মোট ১৫ জন আসামীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। তবে দণ্ডপ্রাপ্তদের বড় একটি অংশ এখনো আইনের আওতার বাইরে রয়ে গেছেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৫ জন আসামীর মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১১ জনই বর্তমানে পলাতক, আর কারাবন্দী অবস্থায় রয়েছেন মাত্র ৪ জন। ছয়টি মামলায় মোট আসামীর সংখ্যা ছিল ৬৩ জন। তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান দুটি পৃথক মামলায় আসামী হওয়ায় মোট ব্যক্তির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬২ জন। সাজাপ্রাপ্ত এই ৬২ জনের মধ্যে মাত্র ২১জন কারাগারে বন্দী আছেন আর ৪১জনই রয়েছে পলাতক। তাদেরকে গ্রেফতার করতে সরকারের পক্ষ থেকে চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে বলা হলেও তারা এখনো অধরাই রয়ে গেছে।
সাজা : ট্রাইব্যুনালে রায় হওয়া ৬ মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে ১৫ জনকে। এ ছাড়াও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড: ১১ জন, ২০ বছরের কারাদণ্ড: ১ জন, ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড: ৬ জন, ৭ বছরের কারাদণ্ড: ২ জন, ৬ বছরের কারাদণ্ড: ১ জন, ৫ বছরের কারাদণ্ড ও সশ্রম কারাদণ্ড: ৯ জন, ৪ বছরের কারাদণ্ড: ১ জন, ৩ বছরের কারাদণ্ড: ১৪ জন, হাজতবাসকেই দণ্ড হিসেবে গণ্য: ১ জন, খালাস (রাজসাক্ষী হওয়ায়): ১ জন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামীদের বর্তমান পরিস্থিতি
ছয়টি মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মোট ১৫ জন আসামীর মধ্যে ১১ জন পলাতক রয়েছেন এবং ৪ জন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক ১১ জন: আসামীরা হলেনÑশেখ হাসিনা ও অন্যান্য মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল; রামপুরা মামলায় সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, খিলগাঁও জোনের সাবেক এডিসি রাশেদুল ইসলাম ও রামপুরা থানার সাবেক ওসি মশিউর রহমান; আশুলিয়া মামলায় ঢাকা-১৯ আসনের সাবেক এমপি মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, আশুলিয়া থানার তৎকালীন ওসি এএফএম সায়েদ রনি, সাবেক এএসআই বিশ্বজিৎ সাহা ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা রনি ভূঁইয়া এবং চানখাঁরপুল মামলায় সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান (একই ব্যক্তি), ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী ও রমনা জোনের সাবেক এডিসি শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলাম।
অন্যদিকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামীদের মধ্যে বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন ৪ জন। তারা হলেনÑআবু সাঈদ হত্যা মামলায় সাবেক এএসআই আমির হোসেন ও সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায় এবং আশুলিয়া মামলায় এসআই মালেক ও কনস্টেবল মুকুল।
গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকা ২১ আসামী
ট্রাইব্যুনালের ৬টি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন মোট ২১ জন আসামী। তারা হলেনÑইনুর মামলায় সাবেক তথ্যমন্ত্রী ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু; শেখ হাসিনা ও অন্যান্য মামলায় সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন; রামপুরা মামলায় তৎকালীন রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার; আবু সাঈদ হত্যা মামলায় সাবেক এএসআই আমির হোসেন, সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সাবেক প্রক্টর শরীফুল ইসলাম, সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার রাফিউল হাসান রাসেল, বেরোবি ছাত্রলীগ নেতা ইমরান চৌধুরী ওরফে আকাশ ও চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী আনোয়ার পারভেজ ওরফে আপেল; আশুলিয়া মামলায় এসআই মালেক, কনস্টেবল মুকুল, ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত এসপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. আব্দুল্লাহিল কাফী, সাভার সার্কেলের সাবেক অতিরিক্ত এসপি মো. শাহিদুল ইসলাম, ডিবির তৎকালীন পরিদর্শক আরাফাত হোসেন, এসআই আরাফাত উদ্দিন, এএসআই কামরুল হাসান ও রাজসাক্ষী এসআই শেখ আবজালুল হক এবং চানখাঁরপুল মামলায় শাহবাগ থানার সাবেক পরিদর্শক (অপারেশন) মো. আরশাদ হোসেন, সাবেক কনস্টেবল মো. সুজন মিয়া, সাবেক কনস্টেবল মো. ইমাজ হোসেন ইমন ও সাবেক কনস্টেবল মো. নাসিরুল ইসলাম।
পলাতক ৪১ জন আসামী
আইনের আওতার বাইরে থাকা পলাতক আসামীরা হলেনÑশেখ হাসিনা ও অন্যান্য মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল; রামপুরা মামলায় সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, খিলগাঁও জোনের সাবেক এডিসি রাশেদুল ইসলাম, রামপুরা থানার সাবেক ওসি মশিউর রহমান ও সাবেক এসআই তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া; আবু সাঈদ হত্যা মামলায় কোতোয়ালি জোনের সাবেক পুলিশ কমিশনার আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন, তাজহাট থানার সাবেক পুলিশ পরিদর্শক রবিউল ইসলাম ওরফে নয়ন, সাবেক এসআই বিভূতি ভূষণ রায় ওরফে মাধব, বেরোবির সাবেক উপাচার্য হাসিবুর রশীদ ওরফে বাচ্চু, বেরোবির সহযোগী অধ্যাপক মশিউর রহমান, সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মণ্ডল ওরফে আসাদ, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক কমিশনার মনিরুজ্জামান ওরফে বেল্টু, বেরোবি শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি পোমেল বড়ুয়া, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সাবেক উপকমিশনার আবু মারুফ হোসেন ওরফে টিটু, অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহ নূর আলম পাটোয়ারী ওরফে সুমন, বেরোবির অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মাহাবুবার রহমান ওরফে বাবু, বেরোবি ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদুল হাসান ওরফে মাসুদ, রংপুর স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি সারোয়ার হোসেন ওরফে চন্দন, বেরোবির সহকারী রেজিস্ট্রার হাফিজুর রহমান ওরফে তুফান, সেকশন অফিসার মনিরুজ্জামান পলাশ, বেরোবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মাহাফুজুর রহমান শামীম, সহসভাপতি ফজলে রাব্বী ওরফে গ্লোরিয়াস ফজলে রাব্বী, সহসভাপতি আখতার হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক সেজান আহম্মেদ ওরফে আরিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক ধনঞ্জয় কুমার ওরফে টগর, দপ্তর সম্পাদক বাবুল হোসেন, এমএলএসএস মোহাম্মদ নুরুন্নবী মণ্ডল, এ কে এম আমির হোসেন ওরফে আমু ও নিরাপত্তাপ্রহরী নূর আলম মিয়া; আশুলিয়া মামলায় ঢাকা-১৯ আসনের সাবেক এমপি মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম, সাবেক পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান রিপন, আশুলিয়া থানার তৎকালীন ওসি এএফএম সায়েদ রনি, সাবেক পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান, সাবেক পরিদর্শক (অপারেশন) নির্মল কুমার দাস, সাবেক এএসআই বিশ্বজিৎ সাহা ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা রনি ভূঁইয়া এবং চানখাঁরপুল মামলায় সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান (একই ব্যক্তি), ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, রমনা জোনের সাবেক এডিসি শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলাম ও রমনা জোনের সাবেক এসি মোহাম্মদ ইমরুল।
মানবতাবিরোধী অপরাধে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান কামালের মৃত্যুদণ্ড
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ এ রায় দেন। বেঞ্চের অপর দুই সদস্য হলেনÑবিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। মামলায় মোট পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়, যা বিচারিক প্রক্রিয়ায় দুটি প্রধান অভিযোগে রূপান্তর করা হয়। প্রথম অভিযোগে আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’ আখ্যা দিয়ে উসকানি এবং সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি প্রমাণিত হওয়ায় শেখ হাসিনাকে স্বাভাবিক মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কারাদণ্ড (ইমপ্রিসনমেন্ট টিল ন্যাচারাল ডেথ) দেওয়া হয়। অন্যদিকে, হেলিকপ্টার-ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে নির্বিচারে হত্যা, চানখাঁরপুল ও আশুলিয়ার গণহত্যার নির্দেশ প্রমাণিত হওয়ায় দ্বিতীয় প্রধান অভিযোগে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
এ মামলার একমাত্র গ্রেপ্তারকৃত আসামী সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন নিজের অপরাধ স্বীকার করে রাজসাক্ষী (অ্যাপ্রুভার) হিসেবে জবানবন্দী দেওয়ায় ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে ৫ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেন। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকারের পতনের পর ট্রাইব্যুনালে এটিই ছিল প্রথম মামলার রায়।
ইনুর বিরুদ্ধে উসকানি ও হত্যার নির্দেশ প্রমাণিত, ১০ বছরের জেল
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় উসকানিমূলক বক্তব্য, আন্দোলন দমনে নির্দেশ প্রদান ও হত্যার ঘটনায় অংশ নেওয়ার অভিযোগে সাবেক তথ্যমন্ত্রী ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। চলতি বছরের ৩০ জুন ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য সদস্যরা হলেনÑবিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
ইনুর বিরুদ্ধে আনা ৮টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের মধ্যে রয়েছেÑ১৮ জুলাই ভারতীয় গণমাধ্যমে উসকানিমূলক বক্তব্য, ১৯ জুলাই ১৪-দলীয় জোটের বৈঠকে ‘শুট অ্যাট সাইট’ সিদ্ধান্তের সমর্থন, ২০ জুলাই কুষ্টিয়ার এসপিকে ফোন করে আন্দোলনকারীদের আটকের নির্দেশ, ৪ আগস্ট শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনালাপে কার্ফিউ ও গুলী চালানোর সিদ্ধান্ত এবং ৫ আগস্ট কুষ্টিয়ায় ইউসুফ শেখ, উসামা, সুরুজ আলীসহ বেশ কয়েকজনকে হত্যার নির্দেশ ও সহায়তা প্রদান।
কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণকে গুলী ও দুই হত্যা: সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুরসহ ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড
রামপুরায় নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা আমির হোসেন নামের এক তরুণকে লক্ষ্য করে গুলী এবং নাদিম ও মায়া ইসলামকে হত্যার ঘটনায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। চলতি বছরের ২৮ জুন বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেল এ রায় দেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপর দুই আসামী হলেনÑখিলগাঁও জোনের সাবেক এডিসি রাশেদুল ইসলাম ও রামপুরা থানার সাবেক ওসি মশিউর রহমান। তারা তিনজনই পলাতক। এছাড়া রামপুরা থানার সাবেক এসআই তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়াকে যাবজ্জীবন এবং একমাত্র গ্রেপ্তার আসামী সাবেক এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার বিবরণী থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই পুলিশের গুলী থেকে বাঁচতে আমির হোসেন কার্নিশে ঝুলে থাকলে তাকে লক্ষ্য করে ৬ রাউন্ড গুলী চালানো হয়। এতে তিনি গুরুতর আহত হলেও বেঁচে যান। কিন্তু একই দিনে পুলিশের গুলীতে নাদিম ও মায়া ইসলাম শহীদ হন এবং ছয় বছরের শিশু বাসিত খান মুসা গুলীবিদ্ধ হয়ে বাকশক্তি হারায়।
আবু সাঈদ হত্যায় দুই পুলিশ সদস্যের মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন ৩ জনের
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলায় সাবেক দুই পুলিশ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড এবং তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। চলতি বছরের ৯ এপ্রিল বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেনÑসাবেক এএসআই আমির হোসেন ও সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায় (উভয়েই গ্রেপ্তার)। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত তিনজন হলেনÑসাবেক পুলিশ কমিশনার (কোতোয়ালি জোন) আরিফুজ্জামান ওরফে জীবন, তাজহাট থানার সাবেক পরিদর্শক রবিউল ইসলাম এবং এসআই বিভূতি ভূষণ রায়।
মামলার মোট ৩০ জন আসামীর সবাই দণ্ডিত হয়েছেন। বাকি ২৫ জনের মধ্যে বেরোবির সাবেক উপাচার্য হাসিবুর রশীদসহ ৫ জনকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, ৮ জনকে ৫ বছরের কারাদণ্ড এবং ১১ জনকে ৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী আনোয়ার পারভেজের হাজতবাসকে দণ্ড হিসেবে গণ্য করা হয়। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বুক পেতে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় পুলিশের গুলীতে আবু সাঈদ শহীদ হওয়ার ঘটনাটি দেশজুড়ে আন্দোলন তীব্র করে তুলেছিল।
আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর মামলায় সাবেক এমপি সাইফুলসহ ৬ জনের মৃত্যুদণ্ড
সাভারের আশুলিয়ায় আন্দোলনকারীদের গুলী করে হত্যার পর পুলিশ ভ্যানে লাশ রেখে পুড়িয়ে দেওয়ার বর্বরোচিত ঘটনায় ঢাকা-১৯ আসনের সাবেক এমপি মুহাম্মদ সাইফুল ইসলামসহ ৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল-২। চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এ রায় দেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপর আসামীরা হলেনÑআশুলিয়া থানার তৎকালীন ওসি এএফএম সায়েদ রনি, এসআই মালেক, সাবেক এএসআই বিশ্বজিৎ সাহা, কনস্টেবল মুকুল ও স্থানীয় লীগ নেতা রনি ভূঁইয়া। এছাড়া ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম, সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহিল কাফীসহ ৭ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ২ জনকে ৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মামলার ১৬ আসামীর মধ্যে নিজ দোষ স্বীকার করে রাজসাক্ষী হওয়া এসআই শেখ আবজালুল হককে খালাস দেন আদালত।
তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আশুলিয়া থানার সামনে গুলী করে অন্তত ৬ জনকে হত্যা ও আহত করার পর তাদের পুলিশ ভ্যানে তুলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়, যার মধ্যে একজন জীবিত ছিলেন।
চানখাঁরপুলে ৬ হত্যা: ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুরসহ ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড
রাজধানীর চানখাঁরপুলে শিক্ষার্থীদের ওপর নির্বিচারে গুলী চালিয়ে ৬ জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন প্যানেল এ রায় দেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপর দুই আসামী হলেনÑডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী ও সাবেক এডিসি শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলাম।
এছাড়া সাবেক এসি মোহাম্মদ ইমরুলকে ৬ বছর, পরিদর্শক আরশাদ হোসেনকে ৪ বছর এবং তিন কনস্টেবলকে ৩ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। কম সাজাপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করার ঘোষণা দিয়েছে প্রসিকিউশন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির দিন চানখাঁরপুলে পুলিশের গুলিতে শাহরিয়ার খান আনাস, শেখ জুনায়েদসহ ৬ জন শহীদ হন।
রায়ের অপেক্ষায় কুষ্টিয়ায় ছয় হত্যা মামলা
চব্বিশের অভ্যুত্থানে কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফসহ চারজনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ঘোষণা হবে যে কোনো দিন।
গত ১০ জুন প্রসিকিউশন ও আসামীপক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমান (সিএভি) রাখে।
হানিফ ছাড়া মামলার অপর তিন আসামী হলেন কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি সদর উদ্দিন খান, জেলা সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী এবং সাবেক সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতা। তারা সবাই পলাতক।
এ ছাড়াও বেশ কয়েকটি মামলা দু’টি ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে। গুমের মামলা, জাহাজবাড়ী হত্যা মামলাসহ বেশকিছু মামলার স্বাক্ষ্যগ্রহণ চলছে।
শাপলা চত্বর গণহত্যা: হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট আমলে গ্রহণ
রাজধানীর মতিঝিল শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) আমলে নিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল-২। গত ২৭ জুলাই বিচারপতি নজরুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ পলাতক ৩১ আসামীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।
চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানান, তদন্তে এখন পর্যন্ত নিহত ৬১ জনের তালিকা পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ৫৮ জনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। চার্জশিটে অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর, শামসুল হক টুকু, হাসানুল হক ইনু, দীপু মনি, সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ, এনটিএমসি প্রধান জিয়াউল আহসান ও সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ। বর্তমানে দীপু মনি, জিয়াউল আহসানসহ ১০ জন আসামী এ মামলায় কারাগারে রয়েছেন।