আমি একজন অবসর প্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক। আমার বাড়ি দ্বীপ জেলা ভোলায়। মাঝে মধ্যে ঢাকায় আমি আসি বেড়াতে। কিংবা ছোট খাটো কাজকর্ম বাস্তবয়ানের জন্যে-ছুটে আসি রাজধানীতে। তবে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পুরো সময়টাই আমি ঢাকায় ছিলাম।

ছাত্ররা কোটা বিরোধী আন্দোলনে অংশ নিচ্ছে। আন্দোলন জোরদার হচ্ছে সবই প্রত্যক্ষ করছিলাম। ফ্যাসিষ্ট হাসিনার জিঘাংসা মিশ্রিত কথা বার্তা শুনছিলাম। আর হিংস্র পুলিশ এবং পাষন্ড হেলমেট বাহিনীর তান্ডব প্রত্যক্ষ করছিলাম। হতাহতদের খবরা খবর রাখছিলাম। ক্রমান্বয়ে কালো অধ্যায়ের আশংকা করছিলাম। শেষ মেশ কি ঘটে যায়-কি কি ঘটানো হয়- তার জন্যে আপেক্ষার দিন গুলো- প্রহরগুলো গুনছিলাম।

গণভবনের আশে পাশে ট্যাংকের বহর দেখলাম। বিজিবির টহলও প্রত্যক্ষ করলাম। মহা আতংকের মধ্যে দিনাতিপাত করছিলাম। কোথায় কোন সময় কি ঘটে যায় বলাতো যায় না। দেশের দামাল ছেলেদের নিয়ে মহা আতংক ও আশংকা যেনো অক্টোপাশের মতো ধেয়ে আস্ছিলো।

অথচ ইতোমধ্যে এসেগেলো-১৬জুলাই আবু সাঈদ সহ বেশ কজন মেধাবী ছাত্র শহীদ হলেন। সেই দিন ঢাকার বনশ্রীতে বসবাসরত -আমার বড় মেয়ে আমাকে কাঁদো কাঁদো স্বরে বল্লো আব্বা শেখ হাসিনারা তো আমাদের সোনার ছেলে গুলোকে নির্বিচারে মেরে ফেলছে। নির্মমভাবে হত্যা করে লাশ গুম করছে। এর বিচার কে করবে ? এসবের কি বিচার হবে না ? আমি বলেছিলাম মাগো হাসিনার উপর আল্লাহর গজব যেন নাযিল হয় তার জন্য ফরিয়াদ জানাও। তোমরা যারা নিরীহ নি®পাপ তোমাদের প্রার্থনা ব্যর্থ হবার নয়। তোমাদের আকুল আবেদন আল্লাহ শুনবেন বলে আমার দৃঢ় আস্থা রয়েছে।

আমরা দেখলাম হেলিকপ্টার থেকে গুলী করা হচ্ছে। বিভিন্ন জায়গায় ধোয়া উড়ছে। আগুনের লেলিহান শিখা ছেয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন ঘরবাড়িতে। সাধারণ মানুষ প্রাণভয়ে ছুটাছুটি করছে। হায় কি এক মর্মান্তিক ও ভয়াবহ দৃশ্য বাংলাদেশ নামক আমাদের এই দেশে। জনগণের অর্থে কেনা বুলেট হেলিকপ্টার দিয়ে মানুষ মারা হচ্ছে। এমন কি অবুঝ শিশুও রেহাই পাচ্ছে না। এ কেমন এক বাংলাদেশের চিত্র আমরা প্রত্যক্ষ করছি।

অবাককরা ব্যাপার যা বোধ গম্যের বাইরেই বলতে হবে। সময় বেশি নেয়নি-খুব জলদি ঐসব নিরীহ নি®পাপ সাধারণ মানুষের সেই আকুল ভরা আকুতি আল্লাহ রাব্বুল আলামীন শুনেছেন বলেই মনে হল। ফ্যাসিস্ট হাসিনারা ৫ আগস্ট দুপুরের খাবার খাওয়ার সুযোগ পর্যন্ত পায়নি। তলপি তলপা এবং অনেক অর্থ স¤পদের বিলিফ কেস গুলো নিয়ে দ্রুত হেলিকপ্টারে কুর্মিটোলা তারপর বিশেষ বিমানে করে দিল্লীর উদ্দেশ্যে উড়াল মারলো হাসিনা ও তার দোসররা। এটাই প্রকৃতির নির্মম প্রতিশোধ। এটাই ওদের জঘন্য কুকর্মের পুরস্কার। নিরীহ নিষ্পাপ ছাত্র-জনতার ওপর লেলিয়ে দেওয়া স্বসস্ত্র গুণ্ডা বাহিনী দিয়ে যে তাণ্ডব ও রক্তের বন্যা বইয়ে দিয়ে যে মহা হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত করল ফ্যাসিস্ট হাসিনা তা বাংলাদেশের ইতিহাসের কালো অধ্যায় হয়ে রইবে চিরকাল। ফ্যাসিস্ট হাসিনার ক্ষমতার এমন নিষ্ঠুর মোহ বাংলার মানুষ কখনো দেখেনি। কোন্ দেশ এটা ? এ যে পাক হানাদারদেরও হার মানিয়ে দিয়েছে।

ইন্টারনেট বন্ধ করে কারফিউ জারি করে জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ করে পাড় পাওয়া যায়নি, পাড় পাওয়া গেল না। অসংখ্য অগণিত প্রায়- দুই হাজার নিরীহ ছাত্র জনতার হত্যা, ঘুম প্রায়- চল্লিশ হাজার নিরীহ নিরপরাধ শিক্ষার্থী সহ সাধারণ মানুষকে পঙ্গু করা , অন্ধ করা, চিরতরে অকর্মন্য করে দিয়েছে যে, ফ্যাসিস্ট হাসিনারা - এ কুকর্মের বিচার কি বাংলার মাটিতে হবে না ? হওয়া কি উচিত নয়? অবশ্যই হবে।

বর্তমানে জুলাই সনদ, গণ ভোটের গণ রায় বাস্তবায়নে যে অবিমৃশ্যকারিতা এবং বিশ্বাসঘাতকতা করা হচ্ছে - সংবিধান সংশোধন পরিষদ গঠন সহ অনেক প্রতিশ্রুতি এবং প্রতিজ্ঞা বাস্তবায়ন করা নিয়ে যে তালবাহানা করা হচ্ছে - তার পরিণাম ও পরিণতি কোথায় গিয়ে ঠেকে তা বলা

এই মুহূর্তে না গেলেও আশু ভবিষ্যৎ যে ভীষণ অন্ধকারে তলিয়ে যেতে পারে এটা প্রায় সুনিশ্চিত।

নব্য ফ্যাসিস্ট হতে যাওয়া, অতীত ফ্যাসিস্টদের থেকে শিক্ষা নেওয়া কি নিজেদের স্বার্থেই উচিত নয়?

উচিত অনুচিত এর কথা না হয় এই মুহূর্তে বাদ দিয়ে কি বলা কি ঠিক হবে না? আমরা কোথায় যাচ্ছি? দেশকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে? অতীত থেকে কি আমরা কোন সবক নেব না? ফ্যাসিস্ট হওয়ার প্রতিযোগিতা কি আমাদের কিছু ছাড়বে না? বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও জাতির ফ্যাসিস্টদের পরিণাম ও পরিণতি আমাদের কি আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে না? অত্যাচারি জালেমদের শেষ পরিণতি দেখে কি আমরা শিক্ষা নিব না ? হিটলার মুসোলিনি ,ইরাক লিবিয়া এবং সিরিয়ার স্বৈরশাসক ফ্যাসিস্টদের করুণতম পরিণতি কি আমরা ভুলে বসে আছি? ভুলে বসে থাকবো কতদিন?

জুলাই বিপ্লবের সঙ্গে প্রতারণা করে, জুলাই বিপ্লবের শহীদ এবং পঙ্গুত্ব বরণকারীদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে- আধিপত্য বাদীদের ফাঁদে যদি পা দেওয়া হয়, তবে- বর্তমান ক্ষমতাসীনরা কোথায় যে হারিয়ে যাবেন ? তা টের পেতে বেশি সময় নেবে বলে মনে হয় না। তাই সময় থাকতে সাধু সাবধান! ইতিহাসের দুঃখময় পুনরাবৃত্তি আমরা আর প্রত্যক্ষ করতে চাই না।