নুসরাত জাহান স্মরণিকা
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
একটি জাতির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন ক্যালেন্ডারের একটি মাস কেবল সময়ের হিসাব থাকে না, সেটি হয়ে ওঠে বিবেকের আয়না। জুলাই তেমনই এক মাস। বর্ষার বৃষ্টিতে যেমন সব ময়লা-আবর্জনা ধুয়ে যায়, তেমনি এক রক্তাক্ত জুলাই বাংলাদেশের মানুষের মন থেকে ধুয়ে দিয়েছিল দীর্ঘদিনের ভয়, নীরবতা ও আত্মসমর্পণের সংস্কৃতি থেকে। রাজপথে পড়ে থাকা রক্ত তখন শুধু কয়েকজন তরুণের শরীর থেকে ঝরে পড়া লাল তরল রক্ত ছিল না, সেটি ছিল একটি জাতির ক্ষোভ, প্রতিবাদ এবং নতুন রাষ্ট্রচিন্তার ঘোষণা।
ইতিহাসের প্রতিটি গণঅভ্যুত্থান একটি প্রশ্ন রেখে যায় ক্ষমতার পরিবর্তনই কি চূড়ান্ত লক্ষ্য, নাকি রাষ্ট্রের চরিত্র বদলানো? জুলাই গণঅভ্যুত্থানও সেই প্রশ্ন আমাদের সামনে রেখে গেছে। কারণ অভ্যুত্থান একদিনে ঘটে, কিন্তু রাষ্ট্র নির্মাণ একটি দীর্ঘ ও কঠিন প্রক্রিয়া।
তাই দুই বছর পর দাঁড়িয়ে জুলাইকে স্মরণ করার অর্থ শুধু শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন নয় বরং নিজেদেরও প্রশ্ন করা, যে স্বপ্নের জন্য তরুণেরা বুক পেতে দিয়েছিল, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমরা কতটা এগিয়েছি?
জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল না কোনো আকস্মিক বিস্ফোরণ। এটি ছিল দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের বহিঃপ্রকাশ। মানুষের মধ্যে যখন ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা কমে যায়, মতপ্রকাশের পরিসর সংকুচিত হয়, রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে এবং তরুণেরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগে তখন প্রতিবাদ আর কেবল একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি থাকে না, সেটি নাগরিক অস্তিত্বের প্রশ্নে পরিণত হয়।
এই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এর বহুমাত্রিক অংশগ্রহণ। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী যেমন ছিলেন, তেমনি ছিলেন অভিভাবক, শিক্ষক, শ্রমজীবী মানুষ, পেশাজীবী এবং সাধারণ নাগরিক। কেউ কোনো ব্যক্তির জন্য নয়, বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশায় রাজপথে নেমেছিলেন।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ কিংবা নব্বইয়ের গণআন্দোলনের মতো ঘটনাগুলো জাতীয় চেতনার ভিত্তি নির্মাণ করেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান সেই ধারাবাহিকতায় নতুন একটি অধ্যায় যোগ করেছে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে গণতন্ত্র কেবল সংবিধানের শব্দ নয়, এটি মানুষের প্রতিদিনের অধিকার, মর্যাদা এবং অংশগ্রহণের নাম।
জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, তরুণ প্রজন্মকে কখনোই অবমূল্যায়ন করা যায় না। অনেক সময় বলা হয়, বর্তমান প্রজন্ম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সীমাবদ্ধ, তারা বাস্তব সংকটে নেতৃত্ব দিতে পারে না।
কিন্তু জুলাই সেই ধারণাকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করেছে। যে তরুণেরা একসময় ক্যাম্পাসে ক্লাস করছিল, চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছিল কিংবা পরিবার নিয়ে স্বপ্ন দেখছিল, তারাই প্রয়োজনে রাজপথে দাঁড়িয়েছে। কেউ আহত হয়েছে, কেউ গ্রেপ্তার হয়েছে, কেউ চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেছে। তাদের আত্মত্যাগ প্রমাণ করেছে, দেশের সংকটে তরুণরাই সবচেয়ে বড় শক্তি।
কিন্তু এই আত্মত্যাগের মূল্যায়ন কেবল স্মৃতিচারণে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। শহীদদের পরিবারের নিরাপত্তা, আহতদের পুনর্বাসন, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যেসব রাষ্ট্র তাদের আত্মত্যাগের ইতিহাসকে কেবল আবেগে সীমাবদ্ধ রেখেছে, তারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে।
অন্যদিকে, জুলাই গণঅভ্যুত্থান আন্তর্জাতিক পরিসরেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে।
বিশ্ব বুঝেছে, বাংলাদেশের জনগণ নাগরিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রশ্নে আপস করতে রাজি নয়। এটি শুধু একটি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঘটনা ছিল না, বরং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রশ্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। তবে এখানেই একটি সতর্কবার্তাও রয়েছে। ইতিহাসে বহু গণঅভ্যুত্থান ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটিয়েছে, কিন্তু কাক্সিক্ষত রাষ্ট্র পরিবর্তন আনতে পারেনি। কারণ আন্দোলনের চেতনা যদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে রূপ না নেয়, তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চেতনা দুর্বল হয়ে পড়ে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পেছনে কয়েকটি মৌলিক কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, জবাবদিহির সংকট। রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছিল। জনগণ অনুভব করছিল, তাদের মতামত এবং অধিকার যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না। দ্বিতীয়ত, আইনের শাসনের প্রতি আস্থাহীনতা। একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে যে আইনের চোখে সবাই সমান। সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরলে নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভ জমতে থাকে। তৃতীয়ত, তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা।
শিক্ষাজীবন শেষে কর্মসংস্থান, যোগ্যতার মূল্যায়ন এবং বৈষম্যের প্রশ্ন তরুণ সমাজকে দীর্ঘদিন ধরে হতাশ করে তুলেছিল। এই হতাশা ধীরে ধীরে সামাজিক ক্ষোভে পরিণত হয়। চতুর্থত, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ভিন্নমত রাষ্ট্রের শত্রু নয়, বরং উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি। কিন্তু যখন সমালোচনাকে বিরোধিতা হিসেবে দেখা হয়, তখন সমাজে সংলাপের পরিবর্তে বিভাজন তৈরি হয়। সবশেষে, নাগরিকদের মধ্যে একটি উপলব্ধি তৈরি হয়েছিল যে রাষ্ট্রকে আরও মানবিক, আরও জবাবদিহিমূলক এবং আরও অংশগ্রহণমূলক হতে হবে। এই সম্মিলিত আকাক্সক্ষাই গণঅভ্যুত্থানের ভিত্তি গড়ে দেয়।
জুলাইয়ের চেতনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তন যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন। প্রথমত, রাষ্ট্রের প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীন ও কার্যকর করতে হবে। বিচারব্যবস্থা, নির্বাচনব্যবস্থা, প্রশাসন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। কোনো নাগরিক যেন রাজনৈতিক পরিচয়, মতাদর্শ কিংবা সামাজিক অবস্থানের কারণে বৈষম্যের শিকার না হন। তৃতীয়ত, শহীদ ও আহতদের আত্মত্যাগকে রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে।
তাদের পরিবারকে সম্মান, নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা শুধু দায়িত্ব নয়, জাতীয় কৃতজ্ঞতার প্রকাশ। চতুর্থত, তরুণদের রাষ্ট্র পরিচালনার প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে হবে। নীতিনির্ধারণ, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা সংস্কার এবং প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। পঞ্চমত, শিক্ষা ব্যবস্থায় গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সাংবিধানিক মূল্যবোধ এবং নাগরিক দায়িত্বের চর্চা বাড়াতে হবে। কারণ সচেতন নাগরিক ছাড়া কোনো গণতন্ত্র দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। ষষ্ঠত, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সহনশীলতা ফিরিয়ে আনতে হবে। ভিন্নমতকে শত্রু নয়, গণতন্ত্রের অপরিহার্য উপাদান হিসেবে গ্রহণ করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। সংলাপ, সমঝোতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার সংস্কৃতি ছাড়া কোনো রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল হতে পারে না।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী অধ্যায়। তবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো অনেক সময় আমরা ঘটনাকে স্মরণ করি, কিন্তু তার শিক্ষা ভুলে যাই। শহীদদের ছবি বহন করা সহজ, কিন্তু তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা কঠিন।
দুই বছর পর দাঁড়িয়ে আমাদের উপলব্ধি করতে হবে, জুলাই কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পদ নয়, এটি পুরো জাতির অর্জন। তাই এই ইতিহাসকে বিভাজনের নয়, ঐক্যের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
নতুন বাংলাদেশ গড়ার অর্থ কেবল সরকার পরিবর্তন নয় বরং এমন একটি রাষ্ট্র গঠন, যেখানে আইন সবার জন্য সমান হবে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে, তরুণেরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হবে এবং জনগণের কাছে রাষ্ট্রের জবাবদিহি থাকবে।
জুলাই আমাদের শিখিয়েছে, সাধারণ মানুষের নীরবতা চিরস্থায়ী নয়। অন্যায় যখন সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন ইতিহাস নতুন পথ খুঁজে নেয়। কিন্তু সেই নতুন পথকে টেকসই করতে হলে আবেগের পাশাপাশি প্রয়োজন দূরদর্শিতা, নৈতিক নেতৃত্ব এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান।
রক্তে লেখা ইতিহাসের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা ফুল দিয়ে নয়, রাষ্ট্রকে ন্যায়ভিত্তিক করার মধ্যেই নিহিত। আগামী প্রজন্ম যেন জুলাইকে শুধু একটি রক্তাক্ত স্মৃতি হিসেবে নয়, বরং গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মোড় পরিবর্তনের মুহূর্ত হিসেবে মনে রাখে সেই দায়িত্ব আজ আমাদের সবার। ইতিহাসের কাছে এটাই হবে জুলাইয়ের শহীদদের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান।