ড. মুহাম্মদ নুরউদ্দিন কাওছার
সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তক
জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক তাৎপর্যপূর্ণ সন্ধিক্ষণ, যা কেবল রাজনৈতিক পালাবদল নয়; বরং ন্যায়, মানবমর্যাদা, স্বাধীনতা ও জবাবদিহিভিত্তিক রাষ্ট্র নির্মাণের আকাক্সক্ষার বহিঃপ্রকাশ। এই পরিবর্তন রাষ্ট্র ও সমাজকে নতুনভাবে ভাবার সুযোগ সৃষ্টি করেছে এবং ক্ষমতা, নাগরিক অধিকার, সামাজিক ন্যায়, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। এ প্রেক্ষাপটে ইসলামী চিন্তার ঐতিহ্য ন্যায়, জ্ঞান, জনকল্যাণ ও নৈতিকতার সমন্বয়ে একটি মানবিক, সুষম, টেকসই ও মূল্যবোধনির্ভর রাষ্ট্র-সমাজ নির্মাণের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি প্রদান করতে পারে।
একটি সার্থক বিপ্লবের প্রকৃত সাফল্য যেখানে
ইতিহাসের বড় বড় বিপ্লব সাধারণত পুরোনো ক্ষমতাকাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করে; কিন্তু সব বিপ্লবই যে একটি নতুন ন্যায়ভিত্তিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়, তা নয়। তাই ক্ষমতার পরিবর্তন এবং কাঠামোগত রূপান্তরের মধ্যে পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতার পালাবদল তুলনামূলকভাবে দ্রুত ঘটতে পারে, কিন্তু একটি কার্যকর ও ন্যায়ভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পুনর্গঠন প্রয়োজন। ইবনে খালদুন তাঁর আল-মুকাদ্দিমাহ-তে রাষ্ট্রের উত্থান-পতন বিশ্লেষণ করতে ‘আসাবিয়্যাহ’, ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন, বিলাসিতার বিস্তার, অর্থনৈতিক চাপ এবং শাসক-জনগণের সম্পর্কের পরিবর্তনকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে জুলাই অভ্যুত্থানকে কেবল একটি সরকারের বিরুদ্ধে জনতার প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখলে এর গভীর তাৎপর্য অনুধাবন করা সম্ভব নয়; বরং এটি রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যকার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক-সংকটেরও বহিঃপ্রকাশ। ইসলামী রাজনৈতিক চিন্তায় রাষ্ট্রক্ষমতা কোনো ব্যক্তিগত অধিকার বা ভোগের বিষয় নয়; এটি একটি আমানত, যার ভিত্তি ন্যায়, দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহি। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, “আমানতসমূহ তাদের হকদারদের কাছে পৌঁছে দেবে এবং মানুষের মধ্যে বিচার করলে ন্যায়বিচার করবে।” (সূরা আন-নিসা, ৪:৫৮)। অতএব, জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে—রাষ্ট্রক্ষমতাকে জনগণের ওপর আধিপত্য বিস্তারের উপায় না বানিয়ে তাদের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার কার্যকর মাধ্যম হিসেবে পুনর্গঠন করা।
আল-মাওয়ার্দীর ‘আল-আহকাম আস-সুলতানিয়্যাহ’ ও ইবনে তাইমিয়্যাহর ‘আস-সিয়াসাহ আশ-শারইয়্যাহ’ ইসলামী রাষ্ট্রচিন্তার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। এ ধারায় রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য কেবল শাসন বা ক্ষমতা রক্ষা নয়; বরং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, অধিকার সংরক্ষণ, জনকল্যাণ নিশ্চিত করা এবং সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা। ইবনে তাইমিয়্যাহর মতে, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারেÑযদি তা ইসলামী পরিচয় না-ও ধারণ করে; কিন্তু জুলুমভিত্তিক রাষ্ট্র টেকসই হয় না। এই দৃষ্টিভঙ্গি আজও প্রাসঙ্গিক। জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ—কার্যকর বিচারব্যবস্থা, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন, দুর্নীতিনিয়ন্ত্রণ, নাগরিক অধিকার সুরক্ষা, আইনের সমতা, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। অর্থাৎ, রাষ্ট্রের প্রকৃত রূপান্তর মানে ক্ষমতার নয়, বরং ক্ষমতার চরিত্রের পরিবর্তন।
রাষ্ট্র কি জনগণের, নাকি জনগণ রাষ্ট্রের?
ইসলামী রাষ্ট্রচিন্তার একটি মৌলিক প্রশ্ন এখানেই এসে দাঁড়ায়। রাষ্ট্র কি জনগণের ওপর কর্তৃত্ব করার প্রতিষ্ঠান? নাকি রাষ্ট্র জনগণের অধিকার রক্ষার আমানত? কুরআনের ন্যায়বিচার, আমানত ও শূরার ধারণা এবং ইসলামী রাজনৈতিক চিন্তার দীর্ঘ ঐতিহ্য থেকে একটি বিষয় স্পষ্টÑরাষ্ট্রের ক্ষমতা সীমাহীন হতে পারে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (সহিহ আল-বুখারি, হাদিস নং ৭১৩৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৮২৯)। এই হাদিসের আলোকে রাজনৈতিক নেতৃত্বও একটি দায়িত্ব। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা তাই জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নয়। জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ সম্ভবত এখানেইÑকীভাবে এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করা যায়, যেখানে ক্ষমতায় থাকা এবং ক্ষমতার জবাবদিহি-দুটিকে একই সঙ্গে স্বাভাবিক রাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করা হবে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার পরিবর্তন স্বাভাবিক। কিন্তু একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রে ক্ষমতার সংস্কৃতির পরিবর্তন আরও গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং জুলাই অভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বাঁক। কিন্তু এর প্রকৃত ঐতিহাসিক মূল্য নির্ধারিত হবে পরবর্তী রাষ্ট্র ও সমাজের চরিত্র দিয়ে।
সার্বভৌমত্ব ও নৈতিক রাজনীতি
সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদীর রাজনৈতিক চিন্তার কেন্দ্রীয় ধারণাগুলোর একটি হলো হাকিমিয়্যাহÑচূড়ান্ত সার্বভৌমত্ব আল্লাহর। মওদূদীর চিন্তায় এই ধারণার অর্থ কেবল একটি ধর্মতাত্ত্বিক ঘোষণা নয়; এর রাজনৈতিক তাৎপর্য হলো—মানুষ বা কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠী নিজেদের ইচ্ছাকে সীমাহীন ও চূড়ান্ত আইন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক শিক্ষা রয়েছে। কোনো শাসকই সর্বময় নয়। কোনো রাজনৈতিক দলই রাষ্ট্রের মালিক নয়। কোনো সংখ্যাগরিষ্ঠতাই অন্যায়কে ন্যায় বানাতে পারে না। এই ধারণাকে আধুনিক সাংবিধানিক ভাষায় অনুবাদ করলে বলা যায়Ñক্ষমতা সীমাবদ্ধ থাকবে ন্যায়, আইন, সংবিধান ও নাগরিক অধিকারের দ্বারা। সুতরাং নতুন রাজনৈতিক কাঠামোর লক্ষ্য হওয়া উচিতÑক্ষমতার কেন্দ্রীভবন নয়, ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা ও জবাবদিহি।
গণতন্ত্র ও ইসলামী রাজনৈতিক চিন্তার সঙ্গে সংলাপ
ইসলামী রাজনৈতিক চিন্তা ও আধুনিক গণতন্ত্রের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে। এক পক্ষ শূরা ও গণতন্ত্রের মধ্যে সাদৃশ্য দেখলেও অন্য পক্ষ সার্বভৌমত্বের ভিন্ন ধারণার কারণে মৌলিক পার্থক্য তুলে ধরে।
বাস্তবে উভয়ের মধ্যে যেমন পার্থক্য আছে, তেমনি কিছু মূল্যবোধগত মিলও রয়েছে—জনঅংশগ্রহণ, জবাবদিহি, শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর, বহুত্ববাদ, নাগরিক অধিকার ও আইনের শাসন। ইসলামী চিন্তায় শূরা, আমানত, ন্যায়, জনকল্যাণ ও জুলুমবিরোধিতার গুরুত্ব রয়েছে। বাংলাদেশের জন্য তাই নৈতিক ও সাংবিধানিক সীমারেখাসম্পন্ন অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা একটি সম্ভাবনাময় পথ হতে পারে।
ইসলামী সামাজিক দর্শনের আলোকে আধুনিক কল্যাণরাষ্ট্রের পুনর্গঠন
আধুনিক welfare state এবং ইসলামী সামাজিক দর্শনের মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সাদৃশ্য রয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই দুর্বল ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সুরক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শ্রমিকের অধিকার এবং সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে ইসলামী কাঠামো এসব বিষয়ের সঙ্গে একটি নৈতিক মাত্রা যুক্ত করে—সামাজিক দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্রের নয়; ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজেরও।
অতএব, একদিকে যেমন সব দায়িত্ব কেবল রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল নয়, তেমনি সামাজিক কল্যাণকে শুধু ব্যক্তিগত দান-সদকার ওপরও ছেড়ে দেওয়া যায় না। প্রয়োজন একটি সমন্বিত সামাজিক দায়িত্বব্যবস্থা, যেখানে পরিবার, সমাজ, ওয়াকফ, যাকাত, বাজার ও রাষ্ট্র পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে একটি কার্যকর ও টেকসই সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তুলবে।
শূরা: অংশগ্রহণমূলক শাসনের নৈতিক ভিত্তি
ইসলামী রাজনৈতিক চিন্তায় শূরা একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। কুরআন মুমিনদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে বলেছে: “তাদের কার্যাবলি পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়।” (সূরা আশ-শূরা, ৪২: ৩৮)। শূরার অর্থ শুধু পরামর্শ গ্রহণ নয়; এর মধ্যে রয়েছে অংশগ্রহণ, মতবিনিময়, সম্মিলিত সিদ্ধান্ত এবং ক্ষমতার একচেটিয়াকরণ থেকে বিরত থাকা। আধুনিক গণতন্ত্র ও শূরা এক জিনিস নয়; তাদের ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক ভিত্তি ভিন্ন। কিন্তু উভয়ের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক সাদ