জাবালুন নূর

সাংবাদিক

গত ১৬ বছরে, বাংলাদেশের ফ্যাসিস্ট শাসন ব্যবস্থা নাগরিক স্বাধীনতা খর্ব করার সাথে সাথে ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয়করণ করেছে । রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি অংশ শোষকের হাতিয়ারে পরিণত হওয়ার কারণে আজ প্রতিটি নাগরিকের জীবনে এক ধরনের অস্থিরতা, ভয় এবং আস্থাহীনতা দৃশ্যমান। যখন সামাজিক ও রাজনৈতিক নিয়ম দুর্বল হয়ে যায়,তখন সমাজে এক ধরনের দিশাহীনতা তৈরি হয়। এতে অপরাধ এবং নৈতিক অবক্ষয় বাড়ে। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন দুর্নীতি-ঘুষকে স্বাভাবিক মনে করার প্রবণতা এর উদাহরণ। আবার বিপরীতে বাংলাদেশে দুর্বল রাজনীতি মানুষের আস্থা নষ্ট করেছে।

এতসব হতাশার মাঝেও চব্বিশে জেগেছিলো বাংলাদেশ। দীর্ঘদিন শোষণের ছাইচাপা আগুন থেকে স্ফুলিঙ্গ হয়ে দাবানর ছড়িয়েছিলো বাংলার জেনজিরা। তাঁরা মোবাইলে মুখ গুঁজে থাকা এক প্রজন্ম। এই প্রজন্মকে যারা আত্মকেন্দ্রীক ভাবতেন তাদের ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে আজ সাম্য প্রতিষ্ঠার নতুন স্বপ্ন দেখাচ্ছেন জেন-জিরা। জেন-জি এখন এক প্রচ- শক্তির নাম, যাঁরা প্রথাগত রাজনৈতিক ও সমাজব্যবস্থা ভেঙেচুরে নতুন রূপ দিয়েছেন। যে ডিজিটাল দুনিয়াকে তাঁদের দুর্বলতা ভাবা হতো, তাঁরা সেটাকেই করে তুলেছেন তাঁদের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।

বাংলাদেশে ৩৬ দিনের এই আন্দোলন হয়েছিলো সেই সময় যখন রাজনৈতিক দলগুলো বার বার ঈদের পর আন্দোলন ডেকেও সাড়া পাচ্ছিলোনা। ক্রমাগত গুম আর হামলা-মামলার শিকার হচ্ছিলো সবগুলো বিরোধী মতও পথের মানুষ। এসময় যেসব আনকোরা মুখগুলো চাকরির দাবিতে মাঠে নামলো তাদের তো দেশের সাধারণ জনগণ চিনতো না, তবে কেন তাদের ডাকে পথে নেমে এলো দেশের সকল মুক্তিকামী জনতা?

যদি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ন্যায়বিচার না করে, মানুষ ভেতরে এককভাবে ভাবে, বাইরে আরেকভাবে প্রকাশ করে যা একধরনের দ্বিচারিতা। যদি শাসকগোষ্ঠী নিয়ম ভাঙতে অভ্যস্ত হয়, নাগরিকরাও ম্যানেজ করা শিখে নেয়। দুর্নীতি তখন অপরাধ নয়, বরং সামাজিক স্বাভাবিকতা হয়ে দাঁড়ায়। আর সেখানেই বিপর্যয়। প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রচ- অবজ্ঞা আর ঘৃণা নিয়ে দেশের নাগরিক জীবন কাটায়। চব্বিশে আন্দোলনে জনগণ কোন দলীয় মোড়কে তাদের মুক্তির সনদ লিখতে চায়নি কারণ তারা মনে করেছে সকল রাজনৈতিক দলই একই ব্যবস্থার অংশ, যেখানে ক্ষমতার রাজনীতিতে জনতা হেরে যায়। অধরা থেকে যায় প্রান্তিক মানুষগুলোর মৌলিক চাহিদাগুলো।

রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের বিলোপ ঘটিয়ে দেশ আবার গণতন্ত্রে পথে হাটছে। কিন্তু আস্থাহীনতা কটেনি। গুম, খুন ক্রসফায়ার আর ভয়ের রাজনীতির দিনগুলো পেরোলেও বিগত সরকারের আমলে হওয়া অপরাধীদের বিচার এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। পরিবর্তন আসেনি দেশের আইন, শাসন ও বিচার কাঠামোতে। অথচ জনগণ গণভোটে পরিবর্তনে পক্ষেই রায় দিয়েছে। চেয়েছে প্রবল শক্তিশালী ফ্যাসিস্টের পলায়ন থেকে দেশের কান্ডারীরা শিখুক, বিলোপ ঘটাক সব অপরাজনীতির নিয়মকানুনগুলোর।

গণতন্ত্রের এই নবযাত্রায় যখন দেশের উত্তরণের পথে হাটার কথা ছিলো, তার বিপরীতে বাংলাদেশ আজ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক নানা সংকটে ঘেরা। এসবের সমাধান কোনো তাৎক্ষণিক উদ্যোগে সম্ভব নয় প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টা, যেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে রাষ্ট্রের প্রতিটি খাতকে নতুন করে সাজাতে হবে।

এর জন্য যা সবচেয়ে জরুরি হলো প্রতিযোগিতামূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। স্বাধীন নির্বাচন কমিশন,যে কাঠামোই হোক না কেন, যা ভোটের মাঠে সমান সুযোগ নিশ্চিত করবে। সেইসাথে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন বা সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টকে আন্তর্জাতিক মানদ-ে পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। অপরাধ দমনে আধুনিক পদ্ধতি গ্রহণ,সর্বস্তরে আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও শাস্তির কাঠামোতে স্বচ্ছতা আনতে হবে। একইসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চত করতে হবে, তাদের মাইন্ডসেট ঠিক করতে যে বাহিনী কোন দলের হতে পারে না।

অর্থনীতির ভঙ্গুর দশা কাটাতে ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপিদের বিরুদ্ধে সিভিল ও ক্রিমিনাল উভয়ধারার ব্যবস্থা নিতে হবে। সাধারণ মানুষ যেন তাদের আমানত ব্যাংকে রেখে নিশ্চিন্তে থাকতে পারে সেজন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সামাজিক আস্থা পুনর্গঠনের জন্য সামাজিক আস্থা গড়ে তুলতে প্রয়োজন কমিউনিটি–পুলিশিং, যাতে জনগণ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা তৈরি হয়; লিগ্যাল এইড সেবা, যাতে সাধারণ মানুষ সহজে ন্যায়বিচার পেতে পারে; এবং সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা, যা একটি সুস্থ ও নৈতিক সমাজ গঠনে অপরিহার্য। এছাড়া দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব, এবং পুলিশ প্রশাসনের জবাবদিহিতার সীমাবদ্ধতা আইন–শৃঙ্খলা রক্ষায় বড় বাধা হয়েছে। মামলার তদন্ত প্রক্রিয়ায় দেরি, সাক্ষীর নিরাপত্তার অভাব, ও মামলার দীর্ঘসূত্রিতা বিদ্যমান রয়েছে।

আইন–শৃঙ্খলা বাহিনী দায়সারা ভাবে কাজ করছে যেন কোন জবাবদিহিতা নেই। এই অবস্থার উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করা। বিশেষ করে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অপরাধে দায়মুক্তি সংস্কৃতি ভাঙাতে হবে। আর এটা তখনই সম্ভব হবে যখন বিদ্যামান ব্যবস্থা বিলোপ করে সরকার সংস্কারের পথে হাটবে।

রাষ্ট্র যখন নাগরিকের নিরাপত্তা ও ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তখন সামাজিক কাঠামো ভেঙে যায়। গণতন্ত্র কেবল কাগজে-কলমে থেকে যায়,বাস্তবে আর কার্যকর হয় না। তাই সাধারণ জনগণ যে সংস্কারের পক্ষে রায় দিলো সেই সংস্কার নিশ্চিত করে রাজনৈতিক পরিমন্ডলে দ্বি-চারিতার অবসান ঘটুক। নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশায় জীবন দেয়া শহীদের আকাক্সক্ষা পুরণ হোক।