শামীমা তাসনীম
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
জনপ্রত্যাশা ও প্রাপ্তির দীর্ঘদিনের বিস্তর ব্যবধান থেকেই মূলত জনমনে ক্ষোভ ও দ্রোহের জন্ম হয়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান হঠাৎ করে আসেনি। ২০১৩ ও ২০১৮ সালের ছাত্রআন্দোলনের ধারাবাহিকতায় মেধার ন্যায্য মূল্যায়নের যৌক্তিক দাবিতেই সূত্রপাত ঘটে কোটা সংস্কার আন্দোলনের। কিন্তু সরকারের চরম উপেক্ষা, কঠোর মনোভাব এবং তৎকালীন সরকারপ্রধানের উসকানিমূলক বক্তব্য এ আন্দোলনকে দাবানলে পরিণত করে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্রআন্দোলনের সূত্র ধরে যে অভ্যুত্থানের জন্ম, তা খুব দ্রুতই কেবল একটি কোটানির্ভর আন্দোলনে সীমাবদ্ধ না থেকে রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে একটি বিস্তৃত জনআকাক্সক্ষার প্রতিফলনে পরিণত হয়েছিল। শুরুতে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ সমাবেশ আর ন্যায়ের দাবি নিয়ে রাজপথে নেমেছিল। তাদের মূল প্রত্যাশা ছিল আলোচনার মাধ্যমে একটি যৌক্তিক সমাধান। কিন্তু কর্তৃপক্ষ সংলাপের পথ রুদ্ধ করে দমন-পীড়ন, লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল ও নির্বিচার গ্রেপ্তারের পথ বেছে নেয়। পুলিশের নির্বিচার গুলি, হত্যা ও গুমের মতো নির্মম নিপীড়ন সত্ত্বেও স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্নবাজ সাহসী তরুণরা রাজপথ ছাড়েনি। রক্তের অক্ষরে লেখা এই সংগ্রামে যখন সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলমত নিজেদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার ক্ষোভ নিয়ে যুক্ত হয়। রাষ্ট্রীয় এই নির্মমতার মুখে শিক্ষার্থীদের দাবি তখন শুধু কোটা সংস্কারে সীমাবদ্ধ না থেকে দ্রুতই সরকার পতনের ‘এক দফা’ দাবিতে রূপান্তরিত হয়। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্ব ছাড়াই ভয়হীন তরুণেরা রাজপথের নিয়ন্ত্রণ নেয়। নেতৃত্বের শূন্যতাকে তারা নিজেদের ঐক্য ও ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তায় শক্তিতে পরিণত করে। এ জন্যই হয়তো তরুণ শক্তির প্রতি নজরুল অবাধ বিস্ময়কর বিশ্বাসে বলেছেন: ‘এই যৌবন-জল-তরঙ্গ রোধিবি কি দিয়া বালির বাঁধ?’ (‘যৌবন-জল-তরঙ্গ’)। নিজেদের সিদ্ধান্তে অদম্য সাহসের সঙ্গে মাঠ সামলে সাধারণ শিক্ষার্থীরাই জুলাই আন্দোলনকে ঐতিহাসিক মাত্রায় উন্নীত করে। তরুণদের এই অদম্য সাহস ও ঐক্যবদ্ধ অবস্থান আবারও প্রমাণ করেছে, সাহসী তরুণরাই জাতির ইতিহাস পরিবর্তনের মূল কারিগর।
জুলাই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দেশের তরুণ প্রজন্মÑ যারা সাহস, সংগঠন ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের গতিপথে নিজেদের উপস্থিতি স্পষ্ট করেছে। শোষণ, দুর্নীতি ও বেকারত্বমুক্ত এক আগামীর বজ্রশপথ বুকে ধারণ করে, বৈষম্যহীন ও মানবিক আগামীর নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে তারা ঘর ছেড়েছিল। ঘরে ফেরা হয়নি অনেকের, অনেকেই আহত হয়ে আজও শারীরিক যন্ত্রণা, মানসিক ট্রমা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সঙ্গে লড়াই করছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে তরুণদের নেতৃত্ব নতুন কোনো ঘটনা নয়। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ কিংবা ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনÑ প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় তরুণেদের অবস্থান অগ্রভাগের সারিতে ছিল। ২০২৪ সালের জুলাই সেই ধারাবাহিকতাকেই নতুন প্রজন্মের বাস্তবতায় পুনর্নির্মাণ করেছে। ডিজিটাল যুগের এই তরুণেরা রাজপথে যেমন সোচ্চার ছিল, তেমনি তথ্যপ্রবাহ, জনমত গঠন এবং নাগরিক সংহতি তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তবে একটি গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত মূল্য তার তাৎক্ষণিক সাফল্যে নয়, বরং পরবর্তী রাষ্ট্রগঠনের সক্ষমতায়। ইতিহাস বলছে, আন্দোলন পরিবর্তনের দরজা খুলে দিতে পারে; কিন্তু সেই পরিবর্তনকে স্থায়ী করে প্রতিষ্ঠান, নীতি ও সুশাসন। ফলে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে বাংলাদেশ কতটা আইনের শাসন, জবাবদিহি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং নাগরিক অধিকারের ভিত্তিতে নিজেদের পুনর্গঠন করতে পারে তার ওপর। এই আন্দোলন তরুণদের জন্যও একটি নতুন দায়িত্ব তৈরি করেছে। প্রতিবাদ যেমন গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ, তেমনি গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সহনশীলতা, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং যুক্তিনির্ভর রাজনৈতিক সংস্কৃতি। যে প্রজন্ম পরিবর্তনের দাবি তোলে, সেই প্রজন্মকেই পরিবর্তনের দায়িত্বও বহন করতে হয়। আন্দোলন শেষে শিক্ষার্থীদের উচিত শিক্ষাঙ্গনে ফিরে যাওয়া এবং ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমে মূলধারার রাজনীতির সাথে যুক্ত হওয়া। কিন্তু আন্দোলনের পরে অনেকে সযোগের সৎ ব্যবহার করে জাতীয় রাজনৈতিক পদে আসীন হতে চেয়েছে। ফলে জুলাই কিছুটা বিতর্কিতও হয়েছে। সেই জায়গা থেকে তরুণদের যুক্তি, মূল্যবোধ, সহনশীলতা এবং নৈতিক নেতৃত্বের বিকাশ আজ অত্যন্ত জরুরি।
তরুণদের কণ্ঠস্বরকে প্রতিপক্ষ নয়, জাতীয় সম্পদ হিসেবে দেখার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং ন্যায়সংগত সুযোগ নিশ্চিত না করে কোনো দেশ তার তরুণ জনগোষ্ঠীর শক্তিকে কাজে লাগাতে পারে না। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ। এই জনশক্তিকে যদি মানসম্মত শিক্ষা, গবেষণা, কর্মসংস্থান এবং উদ্ভাবনের সুযোগ দেওয়া যায়, তাহলে সেটিই দেশের সবচেয়ে বড় উন্নয়নের চালিকাশক্তি হয়ে ওঠবে। অন্যদিকে, যদি তাদের প্রত্যাশা উপেক্ষিত হয়, তাহলে হতাশা ও অনিশ্চয়তা সমাজে নতুন সংকট তৈরি করতে পারে। ফলে তরুণদের কণ্ঠস্বরকে শোনা এবং নীতিনির্ধারণে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। জুলাই বিপ্লবের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল কর্মসংস্থান সৃষ্টি। তরুণদের উন্নত জীবন এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ উপহার দিতে পারলেই তা জুলাই বিপ্লবের তাৎপর্যময় বাস্তবায়ন হবে।
২০২৪ সালের জুলাই আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে, একটি জাতির ভবিষ্যৎ শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে তার তরুণদের স্বপ্ন, সাহস ও দায়িত্ববোধের ওপর। এই অভিজ্ঞতা যদি সুশাসন, ন্যায়বিচার, মানবিক মূল্যবোধ এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি শক্তিশালী করার প্রেরণা হয়ে ওঠে, তবে জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসে শুধু একটি আন্দোলন নয়, একটি নতুন রাষ্ট্রচিন্তার ভিত্তি হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাদেরই মনে রাখে, যারা পরিবর্তনের আহ্বানকে কেবল স্লোগানে নয়, রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের বাস্তব কর্মযজ্ঞে রূপ দিতে পারে। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের বিশেষত্ব হলো- এটি কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন আনেনি, রাষ্ট্রের প্রকৃতি ও কাঠামো নিয়ে নতুনভাবে চিন্তার প্রয়োজন তৈরি করেছে। একদিকে এটি ক্ষমতার কাঠামোর বিরুদ্ধে সংগ্রাম, অন্যদিকে এটি রাজনৈতিক ভাবধারার একটি পুনঃসংজ্ঞায়নও বটে।
স্বৈরশাসনের অবসান ঘটলেও প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোতে পুরোনো বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার ছায়া এখনো বিদ্যমান। নাগরিক অধিকার ও মানবাধিকার রক্ষার এই লড়াই আমাদের এক কঠিন যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আত্মত্যাগের ফলে বাংলাদেশ এসে দাঁড়াল সে জায়গায়, যেখানে মুখোশবিহীন, বৈষম্যবিহীন একটি দেশ পুনর্গঠনের মুখোমুখি আমরা।
শহীদদের রক্তে রঞ্জিত রাজপথে অর্জিত স্বাধীনতার আলো যেন ক্ষণিকের অবহেলা কিংবা নীরবতার আঁধারে নিভে না যায়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দেশের তরুণ সমাজ জাতিকে, দেশকে একটি নতুন স্বপ্ন দেখানোর যে প্রেক্ষাপট তৈরি করে দিয়েছে, সেটি সফল করতে হবে।
আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণ হবে একটি আদর্শ, একটি স্বপ্ন, যেখানে দেশ ও জনগণের কল্যাণই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে তার ভিত্তিতে। এই লড়াই বহুদিনের, গন্তব্য আরও বহুদূরের।
বাংলাদেশের শিক্ষার্থী, শ্রমিক, কৃষক, আদিবাসী, মাদরাসা, মন্দির, প্যাগোডা মিলেই আবারও জাগরণ হবে। এই লঙ্ঘিত মানবাধিকার, স্বৈরতান্ত্রিক, বিলাসী, দুর্নীতিবাজ আর স্বজনপ্রীতির আখড়ার কাঠামো একদিন ভাঙবে। গড়ে উঠবে নতুন বাংলাদেশ। সেই দিনেরই স্বপ্ন দেখি।