ইতিহাসের গতিপথ কখনো কেবল একটি দেশের ভৌগোলিক সীমারেখার ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রযুক্তি, যোগাযোগ এবং বিশ্বায়নের এই যুগে একটি দেশের রাজনৈতিক বা সামাজিক আন্দোলনের প্রতিধ্বনি মুহূর্তেই পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশের যে গণ-আন্দোলন সংঘটিত হয়, তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল দেশের অভ্যন্তরে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের ব্যাপক সম্পৃক্ততা। তারা কেউ রাজনীতিবিদ ছিলেন না, কেউ পেশাজীবী, কেউ শিক্ষার্থী, কেউ ব্যবসায়ী, আবার কেউ দীর্ঘদিনের অভিবাসী। কিন্তু একটি বিষয় তাদের একসূত্রে গেঁথেছিলÍবাংলাদেশের প্রতি গভীর মমত্ববোধ এবং সংকটের সময় নিজ দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার।

বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রবাসীদের অবদান নতুন নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিরা জনমত গঠন, অর্থ সংগ্রহ এবং কূটনৈতিক প্রচারণায় অসামান্য ভূমিকা রেখেছিলেন।

কিন্তু ২০২৪ সালের আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। এটি এমন এক সময়ে সংঘটিত হয়, যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, তাৎক্ষণিক বার্তা আদান-প্রদান, ডিজিটাল সম্প্রচার এবং আন্তর্জাতিক সংবাদ নেটওয়ার্ক পৃথিবীকে একটি বৈশ্বিক জনপরিসরে রূপান্তর করেছে। ফলে দেশের ভেতরের একটি ঘটনা কয়েক মিনিটের মধ্যেই আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় প্রবাসীরা কেবল দর্শক ছিলেন না; তারা হয়ে উঠেছিলেন তথ্যপ্রচারক, সংগঠক, জনমত নির্মাতা এবং আন্তর্জাতিক সংহতির অন্যতম মুখ।

প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় তাদের সাংগঠনিক শক্তির কথা। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরা খুব অল্প সময়ের মধ্যে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ, মানববন্ধন, প্রতিবাদ কর্মসূচি এবং আলোচনা সভার আয়োজন করেন। অনেক ক্ষেত্রে এসব কর্মসূচিতে দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের প্রবাসী তরুণরাও অংশগ্রহণ করেন, যারা বাংলা ভাষায় ততটা দক্ষ না হলেও বাংলাদেশের ইতিহাস ও সমসাময়িক বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের পরিচয়কে যুক্ত করতে আগ্রহী ছিলেন। এই অংশগ্রহণ দেখিয়ে দিয়েছে যে প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মও তাদের শিকড়ের প্রতি দায়বদ্ধতা অনুভব করে।

আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তথ্যপ্রবাহ। দেশে যখন ইন্টারনেট সেবা সীমিত হয়ে পড়ে বা যোগাযোগে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়, তখন বিদেশে থাকা বাংলাদেশিরা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, মানবাধিকার সংস্থা এবং গবেষকদের কাছে তথ্য পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অনেকেই বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া ছবি, ভিডিও এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুবাদ করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রচার করেন। একই সঙ্গে অনেক প্রবাসী গবেষক ও প্রযুক্তিবিদ তথ্য যাচাইয়ের কাজেও যুক্ত ছিলেন। কারণ তারা বুঝতে পেরেছিলেন, ভুল তথ্য আন্দোলনের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ফলে তথ্যের সত্যতা যাচাই এবং নির্ভুল উপস্থাপনার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বিশ্বের বড় বড় শহরে বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রতিবাদ কর্মসূচি শুধু প্রতীকী ছিল না; এগুলো আন্তর্জাতিক জনমত তৈরির ক্ষেত্রেও কার্যকর ভূমিকা পালন করে। বিদেশি সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকরা এসব সমাবেশে উপস্থিত হয়ে আন্দোলনকারীদের বক্তব্য গ্রহণ করেন। বিভিন্ন দেশের সংসদ সদস্য, মানবাধিকারকর্মী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের কাছেও স্মারকলিপি পৌঁছে দেওয়া হয়। এর ফলে বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট যে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতার আলোচনার অংশ হতে পারে, প্রবাসীদের উদ্যোগ সেই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও ছিল প্রবাসী তরুণদের সক্রিয়তার অন্যতম কেন্দ্র। অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, হার্ভার্ড, টরন্টো, মেলবোর্ন, সোরবোনসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা আলোচনা সভা, সংহতি সমাবেশ এবং মতবিনিময় অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। তারা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী সমাজের কাছে বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরেন এবং শান্তিপূর্ণ নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে বৈশ্বিক সংহতির আহ্বান জানান। এই উদ্যোগ শুধু রাজনৈতিক সমর্থনের জন্য ছিল না; বরং বাংলাদেশের বাস্তবতা সম্পর্কে একটি তথ্যনির্ভর ধারণা গড়ে তোলার প্রচেষ্টাও ছিল।

প্রবাসীদের ভূমিকার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল মানবিক সহায়তা। আন্দোলনে আহত শিক্ষার্থী ও নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে সহায়তা তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কেউ চিকিৎসা সহায়তার জন্য অর্থ পাঠিয়েছেন, কেউ আইনি সহায়তার ব্যয় বহন করেছেন, আবার কেউ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও কাউন্সেলিংয়ের জন্য বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে এই সহায়তা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে, কোনো রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়াই পরিচালিত হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে প্রবাসী সমাজ শুধু রাজনৈতিক অবস্থান নয়, মানবিক মূল্যবোধকেও অগ্রাধিকার দিয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়। ফেসবুক, এক্স, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রবাসীরা ধারাবাহিকভাবে তথ্য, বিশ্লেষণ, ভিডিও এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন প্রচার ও প্রচারণা চালান। বহু বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কনটেন্ট নির্মাতা, গবেষক ও বিশ্লেষক ইংরেজি ভাষায় ব্যাখ্যামূলক ভিডিও ও নিবন্ধ প্রকাশ করেন, যাতে বিদেশি দর্শক ও নীতিনির্ধারকেরা বাংলাদেশের পরিস্থিতি সহজে অনুধাবন করতে পারেন। এর ফলে বাংলাদেশের সংকট কেবল প্রবাসী বাংলাদেশিদের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, মানবাধিকার মহল এবং বৈশ্বিক নাগরিক সমাজেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়।

প্রবাসে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচি ও জনসমাবেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; সমান্তরালভাবে চলেছে অনলাইন পরিসরে এক নিরবচ্ছিন্ন মতাদর্শিক সংগ্রাম। অসংখ্য সাহসী লেখক, সাংবাদিক, গবেষক, বিশ্লেষক, কনটেন্ট নির্মাতা ও সমাজকর্মী নিজ নিজ অবস্থান থেকে অন্যায়, দমন-পীড়ন ও স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন। তাঁদের মধ্যে প্যারিসপ্রবাসী লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট পিনাকী ভট্টাচার্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি ধারাবাহিকভাবে প্রতিবাদী, অনুসন্ধানী ও বিশ্লেষণধর্মী কনটেন্ট প্রকাশের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেন এবং প্রবাসী ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে নতুন গতি ও ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা সৃষ্টি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

অন্যদিকে, অজ্ঞাত স্থান থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আওয়ামী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে নিরবচ্ছিন্নভাবে লেখালেখি চালিয়ে যান আগস্ট বিপ্লবের অন্যতম মহানায়ক হিসেবে পরিচিত বীর মুক্তিযোদ্ধা লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) শরিফুল হক ডালিম, বীর উত্তম।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে মুশফিকুল ফজল আনসারী, আরকান উল্লাহ হারুনী, সাংবাদিক কনক সরোয়ার, ইলিয়াস হোসেন, সাংবাদিক মনির হায়দার, কর্নেল (অব.) মোস্তাফিজুর রহমান, মেজর (অব.) সুমন, জ্যাকব মিল্টন, নায়েব আলী, এম রহমান মাসুম, সাংবাদিক নাজমুস সাকিব, শাহেদ আলম, কবি সাজ্জাদ বিপ্লব, নাকিবুর রহমান, সোয়াইব আহমেদ এবং মিনা ফারাহ; যুক্তরাজ্য থেকে ব্যারিস্টার আবু বকর সিদ্দিক মোল্লা, সাংবাদিক সামসুল আলম লিটন, আলোচিত সাংবাদিক ওয়ালী উল্লাহ নোমান, সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের, ব্যারিস্টার মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম, কর্নেল (অব.) শহীদ উদ্দিন খান, সৈয়দ মাসুক এবং হাসিনা আক্তার; ফ্রান্স থেকে পিনাকী ভট্টাচার্য, অ্যাডভোকেট কাজী আব্দুল্লাহ আল মামুন, আব্দুল মান্নান আজাদ, মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন, মোহাম্মদ আরিফ উল্লাহ, মোহাম্মদ আলী চৌধুরী, কবি খান বাহাদুর আতিকুল ইসলাম, সুস্ময় শরীফ, তানভীর আহমদ তোহা, খালেদ মাহমুদ, সজিব খান, মনোয়ার হোসেন পাটোয়ারী, এমডি নূর এবং আজিমুল হক খান; সুইডেন থেকে আলোচিত সাংবাদিক ও নেত্র নিউজের সম্পাদক তাসনিম খলিল; কানাডা থেকে ড. তাজ হাশমী, ক্যাপ্টেন (অব.) শহিদুল ইসলাম, সাংবাদিক টিটো রহমান এবং মেজর (অব.) দেলোয়ার হোসেন সাইফুর রহমান সাগর; অস্ট্রেলিয়া থেকে ফাহাম আব্দুস সালাম ও বনি আমিন; স্পেন থেকে নুরুল আলম ও ফখরুদ্দীন রাজী; নেদারল্যান্ডস থেকে সাংবাদিক রাজা গোলাম রব্বানী; এবং আমি প্যারিস থেকে প্রতি শনিবার সিটিজেন ভিউজ টকশোতে ফ্যাসিবাদের বিভিন্ন দিক নিয়ে নিয়মিত আলোচনা ও সমালোচনায় অংশ নিতাম। মালয়েশিয়া থেকে একেএম ওয়াহিদুজ্জামান ও ড. ফয়জুল হকও এ ধারাবাহিক জনমত গঠনের প্রচেষ্টায় সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

এ ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত অসংখ্য প্রবাসী সাংবাদিক, লেখক, গবেষক, বুদ্ধিজীবী ও সমাজকর্মী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে লেখালেখি, বিশ্লেষণ ও মতামত প্রদানের মাধ্যমে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

এখানে একটি ঐতিহাসিক ঘটনার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশে জুলাই বিপ্লব চলাকালে ৫ আগস্ট প্যারিসের রিপাবলিক চত্বরে তরুণ সমাজকর্মী ওবায়দুল্লাহ কয়েস এবং সমাজকর্মী শহিদুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে বহির্বিশ্বে ফ্যাসিবাদ পতন উপলক্ষে প্রথম বিজয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপিসহ জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মী এবং প্রায় দশ হাজার মানুষের উপস্থিতিতে আয়োজিত ওই সমাবেশে জুলাই বিপ্লবের অন্যতম কারিগর পিনাকী ভট্টাচার্য একটি আবেগঘন ও উদ্দীপনামূলক বক্তব্য প্রদান করেন। উপস্থিত জনতার ব্যাপক অংশগ্রহণ, উচ্ছ্বাস ও প্রত্যাশা সমাবেশটিকে প্রবাসে জুলাই আন্দোলনের ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায়ে পরিণত করে।

অন্যদিকে, একই দিন প্রবাসে সর্বাধিক বাংলাদেশির বসবাসকারী গ্রেট ব্রিটেনের বার্মিংহাম, ম্যানচেস্টার এবং পূর্ব লন্ডনে সকাল থেকেই ফ্যাসিবাদবিরোধী মঞ্চ গঠন করে বাংলাদেশে চলমান আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়। পূর্ব লন্ডনের আলতাফ আলী পার্কে দুপুর ১টায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে বিএনপি, জামায়াতসহ ফ্যাসিবাদবিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির নেতৃবৃন্দ ঐক্যবদ্ধভাবে অংশগ্রহণ করেন। হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত ওই সমাবেশ থেকে বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের বিজয়ের ঘোষণা দেওয়া হয়।

আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সংবাদ ও বাস্তবতা তুলে ধরার ক্ষেত্রে ফ্রান্সের মূলধারার সংবাদমাধ্যম তুলনামূলকভাবে অধিক সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণ সাংবাদিক মোহাম্মদ আরিফ উল্লাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি পেশাগত দক্ষতা, নিষ্ঠা ও নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী আন্দোলনের বিভিন্ন দিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরতে সচেষ্ট ছিলেন। তাঁর এই প্রচেষ্টার ফলে বাংলাদেশের পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও ব্যাপকভাবে আলোচিত হয় এবং বিশ্বজনমতের দৃষ্টি আকর্ষণে তা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে।

তবে প্রবাসীদের ভূমিকার ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত তথ্য ছড়িয়ে পড়ার কারণে অনেক সময় যাচাই না করা তথ্যও প্রচারিত হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে পুরোনো ছবি বা ভিন্ন ঘটনার ভিডিও নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে প্রচার করা হয়েছে, যা বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে। এই অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায় যে ডিজিটাল যুগে তথ্যের গতি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তথ্যের নির্ভুলতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে যেকোনো জাতীয় সংকটে প্রবাসীদের আরও সংগঠিত তথ্য-যাচাই নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলোÍপ্রবাসীদের এই সম্পৃক্ততা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি ও সমাজে কী প্রভাব ফেলতে পারে? বাস্তবতা হলো, বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং কূটনীতিতে প্রবাসীদের অবদান ক্রমেই বাড়ছে। তারা শুধু রেমিট্যান্স পাঠান না; জ্ঞান, দক্ষতা, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এবং বৈশ্বিক যোগাযোগও দেশের উন্নয়নে যুক্ত করেন।

২০২৪ সালের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে সংকটের সময়ও তারা দেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। তাই ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের উচিত প্রবাসীদের কেবল অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে নয়, নীতি-পরামর্শ, গবেষণা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং নাগরিক সম্পৃক্ততার অংশীদার হিসেবেও মূল্যায়ন করা।

আজকের পৃথিবীতে প্রবাসী জনগোষ্ঠী একটি দেশের “সফট পাওয়ার”-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ভারত, আয়ারল্যান্ড, ইসরায়েল, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা আর্মেনিয়ার মতো বহু দেশ তাদের প্রবাসীদের জ্ঞান, যোগাযোগ এবং প্রভাবকে জাতীয় স্বার্থে ব্যবহার করছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই সম্ভাবনা বিদ্যমান।

জুলাই ২০২৪-এর অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, সুসংগঠিত ও দায়িত্বশীল প্রবাসী সমাজ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের পক্ষে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম।

তবে একটি বিষয় সবসময় স্মরণে রাখতে হবেÍপ্রবাসীদের শক্তি তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা সত্য, ন্যায়, মানবিক মূল্যবোধ এবং গণতান্ত্রিক চর্চার ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। মতভেদ থাকতেই পারে; কিন্তু ভিন্নমতকে সম্মান, তথ্যের সত্যতা যাচাই এবং শান্তিপূর্ণ নাগরিক অংশগ্রহণই একটি পরিণত জাতির পরিচয়। আন্তর্জাতিক জনমত গঠনের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য।

জুলাই ২০২৪-এর ঘটনাবলি নিয়ে ভবিষ্যতে আরও গবেষণা হবে, নতুন তথ্য প্রকাশ পাবে এবং ইতিহাসের মূল্যায়ন আরও পরিপূর্ণ হবে। কিন্তু একটি বিষয় ইতোমধ্যেই স্পষ্টÍবিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রমাণ করেছেন যে দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা কেবল ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করে না। হৃদয়ে বাংলাদেশকে ধারণ করলে হাজার হাজার কিলোমিটার দূর থেকেও দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব।

এই অভিজ্ঞতা আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। প্রবাসীরা কেবল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের উৎস নন; তারা জাতির জ্ঞানসম্পদ, আন্তর্জাতিক পরিচয়ের বাহক এবং সংকটকালে দেশের অন্যতম শক্তি। ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গঠনে রাষ্ট্র, নাগরিক সমাজ এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে আরও সুদৃঢ় সহযোগিতা প্রতিষ্ঠিত হলে একটি অধিকতর গণতান্ত্রিক, মানবিক ও বিশ্বসংযুক্ত বাংলাদেশ নির্মাণের পথ আরও সুগম হবে।

ইতিহাস একদিন জুলাই ২০২৪-এর ঘটনাবলিকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করবে। কিন্তু বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা কোটি প্রবাসী বাংলাদেশির ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠস্বর সেই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে। কারণ তারা প্রমাণ করেছেনÍদেশের প্রতি ভালোবাসা সীমান্ত মানে না; দায়িত্ববোধও পাসপোর্ট দেখে নির্ধারিত হয় না। বাংলাদেশের যে কোনো সংকটে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই প্রবাসী সমাজ ভবিষ্যতেও জাতির আশা, আস্থা এবং সম্ভাবনার এক অনন্য শক্তি হয়ে থাকবে।