দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে প্রবাসী জীবন কাটালেও আত্মিক টানটা সবসময় মাতৃভূমির মাটি ও মানুষের সাথেই আঁকড়ে থাকে। ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসের সেই উত্তাল দিনগুলোতে প্রবাসের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরের কোণে বসে মোবাইল আর কম্পিউটারের পর্দায় চোখ রেখে যে অপরিসীম উদ্বেগ, যন্ত্রণা আর অশ্রুপাত করেছি, তা আজীবন আমার বুকে এক গভীর ক্ষত হয়ে থাকবে। ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার বিপ্লব কেবল একটি শাসনের অবসান নয়, বরং দূর পরবাসে টিকে থাকা আমাদের মতো লাখো প্রবাসীর জাতীয় পরিচয় ও আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের এক অবিস্মরণীয় মাহেন্দ্রক্ষণ।
বিপ্লবের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও রক্তঝরা তাৎপর্য
কোনো বিপ্লবই একদিনে ঘটে না। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে চেপে বসা একদলীয় স্বৈরাচার, মানবাধিকার হরণ, ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া, অর্থনীতিকে পঙ্গু করে মেগা প্রজেক্টের নামে মেগা দুর্নীতি এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে বুটজুতো দিয়ে পিষে মারার যে ইতিহাস রচিত হয়েছিল জুলাইয়ের কোটা সংস্কার আন্দোলন ছিল তারই বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের দাবানল।
ছাত্রদের একটি অত্যন্ত যৌক্তিক ও ন্যায্য দাবিকে যখন অহংকার ও দাম্ভিকতার সাথে প্রত্যাখ্যান করা হলো, এবং রাজপথে নামিয়ে দেওয়া হলো রাষ্ট্রীয় ও দলীয় সন্ত্রাসী বাহিনীকে, তখনই সাধারণ ছাত্র-জনতা বুঝতে পেরেছিল যে এটি আর কেবল কোটা সংস্কারের যুদ্ধ নয়; এটি নাগরিক হিসেবে টিকে থাকার ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার যুদ্ধ। ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে যে রাষ্ট্র যখন সাধারণ মানুষের প্রতি অন্যায় ও অবিচারকে চরম মাত্রায় নিয়ে যায়, তখন তরুণ সমাজ জীবন বাজি রেখে রাজপথে নেমে ইতিহাস পুনঃলিখন করতে বাধ্য হয়।
দূর পরবাসে উৎকণ্ঠার প্রহর: হৃদয়ের গভীর হতে বেদনাদায়ক স্মৃতিচারণ
প্রবাসের নিশ্চুপ রাতে যখন দেশের ইন্টারনেট সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হলো, তখনকার সেই মুহূর্তগুলোর যন্ত্রণা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন কিংবা বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ করার কোনো উপায় ছিল না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রিলোড বাটনে টিপ দেওয়া, ইউটিউব ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে দেশের খবরের সন্ধানে চোখ রাখা ্এ যেন এক এক্টিভ টর্চার সেলে বন্দী থাকার মতো অনুভূতি।
“ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের সময় মনে হচ্ছিল আমার দেশের ওপর যেন এক ভয়াবহ অন্ধকার নেমে এসেছে।
প্রবাসে বসে যখন শুনছিলাম একের পর এক তরুণ, কিশোর এমনকি মায়ের কোলে থাকা নিষ্পাপ শিশু পর্যন্ত স্নাইপারের গুলীতে প্রাণ হারাচ্ছে, তখন বুকের ভেতরটা ফেটে যাচ্ছিল। আমরা প্রবাসীরা সেদিন কাজের টেবিলে, রাস্তায় কিংবা শোবার ঘরে অকাতরে অশ্রু বিসর্জন দিয়েছি।”
আবু সাঈদের দুই হাত প্রসারিত করে বুক পেতে দেওয়ার দৃশ্য, কিংবা মুগ্ধর “পানি লাগবে কারো, পানি?” আকুল আহ্বান এগুলো কেবল ছবি বা ভিডিও ছিল না; এগুলো ছিল আমাদের হৃদয়ে তপ্ত তীরের মতো বিদ্ধ হওয়া এক একটি চিরন্তন শোক। প্রবাসে থেকে নিজেকে বড্ড অসহায় মনে হতো। মনে হতো, আমার দেশের ছোট ছোট ভাইবোনরা রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢালছে, আর আমি দূরদেশে বসে নিরাপদে শ্বাস নিচ্ছি। এই অপরাধবোধ ও আত্মগ্লানি আমাদের ঘুমাতে দেয়নি।
প্রবাসীদের প্রতিরোধ ও গ্লোবাল সংহতি
কিন্তু প্রবাসীরা সেদিন কেবল কেঁদে হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি। মধ্যপ্রাচ্যের চরম কঠোর আইনের ঝুঁকি নিয়ে, ইউরোপ-আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়ার তীব্র শীত ও ব্যস্ত সূচি উপেক্ষা করে লাখ লাখ প্রবাসী রাজপথে নেমে এসেছিল। বিভিন্ন দেশে দূতাবাসের সামনে প্রতিবাদ, রেমিটেন্স শাটডাউন বা ‘মার্চ ফর জাস্টিস’-এর ডাক দিয়ে স্বৈরাচারের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। রাজপথের লড়াই যদি দেশের ভেতরের তরুণরা করে থাকে, তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ফ্যাসিবাদের মুখোশ উন্মোচন ও জনমত তৈরির লড়াইটা করেছিল প্রবাসী সমাজ।
৫ আগস্ট দুপুরে যখন খবরের পর্দায় ভেসে উঠল গণভবনের অভিমুখে লাখো জনতার জোয়ার এবং স্বৈরাচারের পতন তখন দূর পরবাসেও আনন্দের বন্যা বয়ে গিয়েছিল।
প্রবাসের রাস্তায় একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেছিল অচেনা-অপরিচিত বাংলাদেশীরা। এটি ছিল দীর্ঘদিনের বন্দীদশা থেকে মুক্তির আনন্দ, হাজারো শহীদের রক্তের বিনিময়ে কেনা এক নতুন ভোরের সূচনা।
গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা
৫ আগস্টের পর এখন আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো যে রক্তক্ষরণের মধ্য দিয়ে এই স্বাধীনতা এসেছে, তার মর্যাদা রক্ষা করা। বিপ্লবের আবেগ শান্ত হওয়ার পর এখন সময় এসেছে রাষ্ট্রকে কাঠামোগতভাবে পুনর্গঠন করার। প্রবাসীদের দৃষ্টিতে নতুন বাংলাদেশের জন্য নিম্নে উল্লিখিত ক্ষেত্রগুলোতে জরুরি সংস্কার প্রয়োজন:
গণতন্ত্র ও নির্বাচনী ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন: নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনিক সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে যেন ভবিষ্যতে আর কোনো সরকার জনগণের ভোটাধিকার হরণ করে স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে না পারে।
আইনের শাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা: বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করতে হবে। বিগত ১৫ বছরের গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং জুলাই গণহত্যায় জড়িত প্রত্যেকটি অপরাধীকে আন্তর্জাতিক মানের স্বচ্ছ বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা: পুলিশ, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পেটুয়া বাহিনীতে পরিণত করার ঘৃণ্য সংস্কৃতির চিরতরে অবসান ঘটাতে হবে।
অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা ও প্রবাসীদের মূল্যায়ন: মেগা প্রজেক্টের নামে অর্থ পাচার রোধ, ব্যাংক খাতের সংস্কার এবং রেমিটেন্স যোদ্ধাদের জাতীয় জীবনে যোগ্য সম্মান ও ভোটাধিকার প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।
প্রত্যাশা ও ভবিষ্যৎ ভাবনা: কেমন বাংলাদেশ চাই?
আমরা এমন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি যেখানে কোনো নাগরিককে তার রাজনৈতিক মতাদর্শের জন্য গুম হতে হবে না, যেখানে রাজপথে অধিকারের কথা বললে বুলেটের মুখোমুখি হতে হবে না। আমাদের তরুণ প্রজন্ম দেখিয়ে দিয়েছে তারা দেশের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত। এখন জ্যেষ্ঠ ও দায়িত্বশীলদের দায়িত্ব তরুণদের এই স্বপ্নকে সত্যে রূপান্তর করা।
প্রবাসে আমরা যখন বিভিন্ন উন্নত দেশের নিয়ম-কানুন, বিচার ব্যবস্থার গতিশীলতা এবং মানবাধিকারের চর্চা দেখি, তখন মনে মনে ভাতি আমার জন্মভূমিও কেন এমন হবে না? বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত, মানবিক ও সর্বজনীন সামাজিক ন্যায়বিচারের বাংলাদেশই হচ্ছে ৫ আগস্টের বিপ্লবের আসল স্পিরিট।
৫ আগস্ট কেবল একটি দিনের নাম নয়; এটি আমাদের জাতীয় জীবনের এক পুনর্জন্ম। যে শহীদেরা তাদের রক্ত দিয়ে আমাদের এই দ্বিতীয় স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন, তাদের রক্তের সাথে যেন বিশ্বাসঘাতকতা না হয়। প্রবাসে থেকেও আমরা প্রতিজ্ঞা করছি রাষ্ট্র পুনর্গঠন, সংস্কার ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার এই যুদ্ধে আমরা সব সময় দেশের পাশে থাকব। ৫ আগস্টের বিপ্লব চিরকাল আমাদের হৃদয়ে এক দীপ্ত প্রদীপ হয়ে জ্বলবে এবং এক বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের পথ দেখাবে।