বিশেষ সাক্ষাৎকার: ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের

জাতির রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম রক্তস্নাত ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান। দীর্ঘ সাড়ে ১৬ বছরের দুঃশাসন, ভোটাধিকার হরণ, সর্বগ্রাসী দুর্নীতি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার অদম্য প্রতিরোধ ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছিল ফ্যাসিবাদের পতন। সেই ঐতিহাসিক জুলাই বিপ্লবের দুই বছর পূর্তির এই ক্ষণে দেশের সামগ্রিক রাজনীতি, রাষ্ট্র সংস্কার, বিচার প্রক্রিয়া এবং বৈষম্যহীন সমাজ কাঠামোর ‘জুলাই আকাক্সক্ষা’ বাস্তবায়নের চিত্র বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত জরুরি।

স্বৈরাচারী শাসন উৎখাতের এই চূড়ান্ত সংগ্রামে বিরোধী দলগুলোর ভূমিকা এবং গণঅভ্যুত্থান-উত্তর বাংলাদেশে একটি সুবিচারপূর্ণ রাষ্ট্র গঠনে দলগুলোর রাজনৈতিক রূপরেখা জানতে মুখোমুখি হয়েছি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের-এর।

বিপ্লবের উত্তাল দিনগুলোতে গুরুতর অসুস্থতা সত্ত্বেও তৎকালীন সরকারের অন্যায় গ্রেফতার ও কারানির্যাতনের অভিজ্ঞতার স্মৃতিচারণ থেকে শুরু করে শহীদ ও আহতদের পুনর্বাসন, ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন, ১১ দলীয় ঐক্যের রাজনীতি এবং আগামীর ‘জেন জি’ বা তরুণদের রাষ্ট্র পরিচালনায় যুক্ত করার বৈপ্লবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দৈনিক সংগ্রাম-এর মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন দৈনিক সংগ্রামের বার্তা সম্পাদক সামছুল আরেফীন।

বিপ্লবের প্রেক্ষাপট, ব্যক্তিগত ত্যাগ ও স্মৃতিচারণ

দৈনিক সংগ্রাম : ঐতিহাসিক জুলাই বিপ্লবের দুই বছর পূর্ণ হচ্ছে আগামী ৫ আগস্ট। দুই বছর পেছনে ফিরে তাকালে, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার সেই ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান এবং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের দিনগুলোকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের: জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল কেবল একটি সরকার পতনের আন্দোলন নয়; এটি ছিল সাড়ে ১৫ বছরের দুঃশাসন, ভোটাধিকার হরণ, চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অর্থনৈতিক লুটপাটের বিরুদ্ধে তিলে তিলে জমা হওয়া জনক্ষোভের বিস্ফোরণ। ছাত্র-জনতা বুকের রক্ত দিয়ে প্রমাণ করেছে যে, এ দেশের মানুষ অন্যায় ও স্বৈরাচারকে চিরদিন মেনে নেয় না। এটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গণজাগরণ, যা আমাদের নতুন করে গণতান্ত্রিক ধারায় ফেরার পথ তৈরি করে দিয়েছে।

দৈনিক সংগ্রাম : বিপ্লব চলাকালীন আপনি গুরুতর অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকার আপনাকে গ্রেফতার করেছিল। কারান্তরালে অসুস্থ অবস্থায় আন্দোলনের খবর পাওয়া এবং সেই সংকটময় মুহূর্তগুলো অতিক্রম করার স্মৃতি নিয়ে আপনার ব্যক্তিগত অনুভূতি কেমন ছিল?

ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের: চরম অসুস্থ অবস্থায় কারান্তরালে থাকা ছিল আমার জীবনের অন্যতম কঠিন পরীক্ষা। এক পাশে শারীরিক অসুস্থতা, অন্য পাশে রাজপথে তরুণদের ওপর নির্বিচার গুলীর খবরÑহৃদয়কে ভীষণ ভারাক্রান্ত করত। তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, যে আন্দোলন তরুণরা নিজেদের রক্ত দিয়ে সিঞ্চন করছে, তা কখনো ব্যর্থ হতে পারে না। কারাগারের চার দেয়াল আমাকে বন্দী রাখলেও জনগণের প্রতি আমার আস্থা ভেঙে ফেলতে পারেনি। অবশেষে বিজয়ের খবর শুনে একটাই অনুভূতি হয়েছিলÑআল্লাহ সত্য ও ইনসাফকে বিজয়ী করেছেন।

দৈনিক সংগ্রাম : রাজপথে যখন ছাত্র-জনতার ওপর বুলেটের বর্ষণ চলছিল, ঠিক সেই সময়ে বিরোধী দলের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর নির্যাতন চালিয়ে আন্দোলন দমনের শেষ চেষ্টা করেছিল বিদায়ী শাসনগোষ্ঠী। তাদের সেই অপকৌশল কীভাবে ব্যর্থ হলো বলে আপনি মনে করেন?

ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের: যেকোনো দেউলিয়া শাসনগোষ্ঠী পতনের মুখোমুখি হয়ে দমন-পীড়ন ও গ্রেফতারের পথ বেছে নেয়। বিদায়ী ফ্যাসিবাদের ভুল হিসাব ছিলÑতারা ভেবেছিল শীর্ষ নেতৃত্বকে জেলে পুরে রাখলে আন্দোলন থেমে যাবে। কিন্তু ততক্ষণে এই আন্দোলন আর কোনো নির্দিষ্ট দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা সর্বস্তরের মানুষের ‘জাতীয় আন্দোলনে’ পরিণত হয়েছিল। নেতৃত্বের শূন্যতা মেটাতে রাজপথের সাধারণ মানুষ ও তরুণরা নিজেরাই মূল দায়িত্ব তুলে নিয়েছিল।

বিপ্লবের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাব

দৈনিক সংগ্রাম : ইনসাফ, ন্যায়বিচার ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার যে মূল আকাক্সক্ষা নিয়ে ছাত্র-জনতা রক্ত দিয়েছিল, গত দুই বছরে সেই ‘জুলাই আকাক্সক্ষা’ কতটা পূরণ হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের: ইনসাফ ও বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থার মূল সুর অর্জনে আমাদের কিছু অগ্রগতি হলেও এখনো অনেকটা পথ চলা বাকি। ফ্যাসিবাদের পতন ঘটেছে এবং মানুষ কথা বলার স্বাধীনতা পেয়েছেÑএটি বড় অর্জন। তবে একটি টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক মুক্তির যে মূল ‘জুলাই আকাক্সক্ষা’ ছিল, তা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করতে এখনো বেশ কিছু আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জরুরি।

দৈনিক সংগ্রাম : জুলাই বিপ্লবে আত্মদানকারী শহীদ পরিবার এবং অঙ্গহানি ও পঙ্গুত্ববরণকারী আহত যোদ্ধাদের দ্রুততম সময়ে সঠিক পুনর্বাসন, উন্নত চিকিৎসা এবং সম্মানজনক রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদানে বর্তমান সরকারের ভূমিকা কি যথেষ্ট ছিল?

ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের: কিছু উদ্যোগ অবশ্যই নেওয়া হয়েছে, তবে শহীদদের পরিবারের পুনর্বাসন এবং গুরুতর আহতদের উন্নত চিকিৎসার বিষয়টি আরও দ্রুত ও অগ্রাধিকার পাওয়ার দাবি রাখে। অনেক আহত বীর এখনো উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে কষ্ট পাচ্ছেন, যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। রাষ্ট্রকে এ বিষয়ে আরও বেশি সহমর্মী ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

দৈনিক সংগ্রাম : বিগত দুই বছরে রাষ্ট্র সংস্কারের যে উদ্যোগগুলো নেওয়া হয়েছে, বর্তমান সরকার তার কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পেরেছে? আমজনতার প্রত্যাশা আর অর্জনের মধ্যে কোনো বড় ফাঁক রয়ে গেছে কি?

ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের: সংস্কার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। নীতিগত কিছু অগ্রগতি হলেও সাধারণ মানুষ যেভাবে দ্রুত ও আমূল পরিবর্তন দেখতে চেয়েছিল, বাস্তবতার সাথে তার কিছুটা ফারাক এখনো রয়ে গেছে। বিশেষ করে বাজারদর নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও আইনি ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের জায়গায় আমজনতার প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে দৃশ্যমান দূরত্ব রয়েছে।

বিচার প্রক্রিয়া ও আইনি আইডেন্টিটি

দৈনিক সংগ্রাম : জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত গণহত্যা, ছাত্র-জনতার ওপর নির্যাতন এবং বিগত ১৫ বছরের রাজনৈতিক নিপীড়নের বিচারে গঠিত ট্রাইব্যুনালের সার্বিক অগ্রগতি নিয়ে বিরোধীদলীয় উপনেতা হিসেবে আপনার মূল্যায়ন কী?

ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের: গণহত্যার মতো জঘন্য অপরাধের বিচার অবশ্যই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে এবং স্বচ্ছতার সাথে ত্বরান্বিত করতে হবে। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন হবে। ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম চালু হলেও মূল অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে বিচারিক সক্ষমতা ও তদন্ত প্রক্রিয়া আরও গতিশীল করা প্রয়োজন।

দৈনিক সংগ্রাম : ফ্যাসিবাদী আমলে হাজার হাজার বিরোধী নেতাকর্মীর ওপর দেওয়া মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলাগুলো পুরোপুরি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে অগ্রগতি কেমন দেখছেন?

ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের: বিগত ১৫ বছরে বিরোধী দলের অগণিত নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে হাজার হাজার মিথ্যা ও গায়েবি মামলা দেওয়া হয়েছিল। এসব রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দ্রুত ও একযোগে প্রত্যাহার করার যে দাবি ছিল, সেখানে কিছুটা ধীরগতি লক্ষ করা যাচ্ছে। ভুক্তভোগীদের সম্পূর্ণ আইনি মুক্তি নিশ্চিত করা জরুরি।

বিরোধীদলীয় উপনেতা হিসেবে ভূমিকা ও জাতীয় রাজনীতি

দৈনিক সংগ্রাম : জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা হিসেবে বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, সংসদীয় গণতন্ত্র চর্চা ও জনস্বার্থ রক্ষায় জামায়াতে ইসলামী কী ধরনের গঠনমূলক ভূমিকা পালন করছে?

ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের: সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আমরা কেবল সমালোচনার খাতিরে সমালোচনা করছি না; বরং গঠনমূলক দিকনির্দেশনা দিচ্ছি। দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, রেমিট্যান্স বাড়াতে কার্যকর নীতি তৈরি, বাজেট বরাদ্দ সুষম করা এবং সংসদীয় গণতন্ত্রকে সচল রাখার ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামী একটি দায়িত্বশীল ভূমিকার পরিচয় দিয়ে আসছে।

দৈনিক সংগ্রাম : ফ্যাসিবাদের চিরতরে বিলোপ ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনর্গঠনে ঘোষিত জুলাই সনদ শতভাগ বাস্তবায়নে রাজপথ ও সংসদে ১১ দলীয় ঐক্যের ভূমিকা কতটা কার্যকর হচ্ছে? সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বিলম্ব করছে বলে আপনি মনে করেন কি?

ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের: জুলাই সনদ কোনো একক দলের বিষয় নয়, এটি ছিল ফ্যাসিবাদবিরোধী সকল শক্তির একটি জাতীয় অঙ্গীকার। এটি বাস্তবায়নে সরকার কিংবা যেকোনো পক্ষেরই গড়িমসি করার কোনো সুযোগ নেই। নীতিগত সংস্কার বাস্তবায়নে বিলম্বে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়ে। ১১ দলীয় ঐক্যের মূল দাবিই হলোÑজুলাই সনদের প্রতিটি রূপরেখা সংবিধানে ও রাষ্ট্র পরিচালনায় অক্ষরে অক্ষরে প্রতিফলিত করা।

তরুণ প্রজন্ম ও ভবিষ্যতের রূপরেখা

দৈনিক সংগ্রাম : জুলাই বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি ছিল দেশের তরুণ সমাজ ও 'জেন জি' ( Gen Z )। জাতীয় নেতৃত্ব ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে তরুণদের এই অমিত সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে আপনাদের দলের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা কী?

ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের: আমাদের দল বিশ্বাস করে যে ‘জেন জি’ বা তরুণদের কেবল ভোটের রাজনীতি বা আন্দোলনের হাতিয়ার হিসেবে নয়, বরং মূল নীতি-নির্ধারণী জায়গায় স্থান দেওয়া উচিত। তরুণদের আইটি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিশ্বমানের শিক্ষা এবং উদ্যোক্তা হওয়ার উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে আমাদের সুনির্দিষ্ট ভিশন রয়েছে। একটি মেধাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়াই আমাদের মূল লক্ষ্য।

দৈনিক সংগ্রাম : বিপ্লবের দুই বছর পূর্তির এই ঐতিহাসিক ক্ষণে দেশবাসী, শহীদ পরিবার এবং বিপ্লবের আহত বীরদের উদ্দেশ্যে আপনার বিশেষ বার্তা কী?

ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের: এই ঐতিহাসিক দুই বছর পূর্তিতে আমি গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি সকল শহীদদের এবং সালাম জানাই আহত বীরদের। দেশবাসীর প্রতি আহ্বানÑআমরা রক্ত দিয়ে যে সুযোগ পেয়েছি, তা যেন দলীয় বা সংকীর্ণ স্বার্থে নষ্ট না হয়। আসুন, সব বিভেদ ভুলে একটি ইনসাফভিত্তিক, সমৃদ্ধ ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ গড়ায় আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকি।