সরকারের অনাগ্রহে মুখ থুবড়ে পড়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মহৎ উদ্যোগ সংস্কারগুলো। বলতে গেলে এখন আর সংস্কারের কথা আলোচনার টেবিলেই নেই। কেবলমাত্র বিরোধীদলের নেতাদের মুখে মাঝেমধ্যে উচ্চারিত হয়। কিন্তু সরকারের কর্তা ব্যক্তিদের এ ব্যাপারে সদিচ্ছা এবং আগ্রহ না থাকায় মূলত আলোচনার টেবিলেই আসছে না বিষয়গুলো। সবার মধ্যে ধারণা ছিল সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন হলে দেশে ন্যায্যতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা পাবে। ত্রয়োদশ নির্বাচনের আগে বিষয়গুলো নিয়ে তোড়জোড় থাকলেও নির্বাচনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়ার পর গতিহীন হয়ে পরে সংস্কার নিয়ে আলোচনা। এমনকি অবস্থাদৃষ্টে কোন অগ্রগতির লক্ষণও আপাতত দেখা যাচ্ছে না।

ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী অবরোধে ২০২৪ সালের ৫্ই আগস্ট ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পলায়নের পর সুশাসনের প্রয়োজনে সংস্কার আইডিয়াগুলো নিয়ে জাতির সামনে হাজির হন নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। আন্তর্জাতিক মান মাথায় রেখে প্রস্তাবগুলো আনায় বাংলাদেশের এই সংস্কার প্রক্রিয়াকে পুরো জাতি স্বাগত জানিয়েছিল। পুরো বিশ্ব এই উদ্যোগকে সাধুবাদ দেয়। এতে আশাবাদী হয়ে ওঠে দেশের ১৮ কোটি মানুষ। দেশজুড়ে বইতে শুরু করে সুশাসনের হাওয়া। দেশের মানুষ এই বিষয়গুলোকে সাদরে গ্রহণের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় ছিল ১৮টি মাস। এই দেড় বছর দীর্ঘ চেষ্টার পর সংস্কার প্রক্রিয়াগুলো দলমত নির্বিশেষে সবার ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটা পর্যায়ে নিয়ে আসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। গ্রামে, গঞ্জে, শহরে-বন্দরে এমনকি টং দোকানের চায়ের আড্ডায় সংস্কার নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ছিল। সচেতন মহলে ছিলো চুলচেরা বিশ্লেষণ। আরেকটু স্পষ্ট করে বললে অন্তর্বর্তীকালীন ১৮ মাস সময়ে সংস্কার শব্দটি সর্বাধিক আলোচনার বিষয় ছিল। বিষয়গুলো নিয়ে প্রায় সবগুলো রাজনৈতিক দল এক টেবিলে বসার কারণে আশাবাদী হয়ে ওঠে মানুষ। কে কতটুকু সংস্কার চায়; আবার কার কোথায় আপত্তি আছে এসব নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যুক্তিতর্ক করতে দেখা যায় ওই সময়টাতে। জাতিসংঘ থেকে শুরু করে সমস্ত বিশ্ব নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূসের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানায়। সুশাসনের তলানীতে থাকা বাংলাদেশ বুঝি এবার সভ্যতার কাতারে আসবে সংস্কারের মাধ্যমে।

কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো নির্বাচনের ডামাঢোল বাজার সাথে সাথে সংস্কার শব্দটি গৌণ হয়ে গেলো রাজনীতিবিদদের একটি অংশের কাছে। আর নির্বাচনের পর গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর সংস্কার হয়ে পড়লো অর্থহীন একটা বিষয়। যেন অনেকটা মূল্যহীন হয়ে গেল। ভাবখানা দেখলে কিংবা কথা বলার ঢং দেখলে কিংবা সংস্কার প্রশ্নে কথা বলতে গেলে কেউ কেউ বিরক্ত হন বলে মনে হয়। অবশ্য বিরোধী দলগুলো এখনো সংস্কারের দাবিতে কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছে। তাতে কোথাও কোথাও বাধার সম্মুখীন হচ্ছে।

২০২৪ সালে ছাত্রজনতার আন্দোলনের চাপে ফ্যাসিস্ট হাসিনা পার্শ্ববর্তী দেশে পালিয়ে যাওয়ার পর দেশে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত আনায়নের ক্ষেত্রে আলোচনায় আসে সংস্কার। নোবেল বিজয়ী প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস সংস্কারের কাজে হাত দেন। তাতে যুক্ত করেন পেশাদার, সজ্জন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বরেণ্য ব্যক্তিদের; যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি কিংবা কলঙ্কের দাগ নেই। সর্বক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে বেশ কিছু সংস্কার কমিশন তৈরি করেন। এরমধ্যে উল্লেখ যোগ্য হলো — সংবিধান সংস্কার কমিশন, নির্বাচন সংস্কার কমিশন, বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন, পুলিশ সংস্কার কমিশন, দুদক সংস্কার কমিশন, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন, নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন, শ্রম সংস্কার কমিশন, স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন, স্বাস্থ্যখাত সংস্কার কমিশন, গুম সংক্রান্ত কমিশন, পরবর্তীতে সবার ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ইং তৈরি করা হয় ; যা জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ নামে পরিচিত। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রতিবেদন তৈরি করা হয় সর্বসম্মতিক্রমেই। বলা হচ্ছিল এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন হলে দেশে সুশাসন ফিরবে। সংবিধান সংস্কার হলে দেশ থেকে বিদায় নেওয়া ফ্যাসিজম আর ফিরবে না। সংস্কার কার্যকর হলে প্রধানমন্ত্রী আর রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হবে। তাতে চাইলেও আর কেউ একক ক্ষমতাকে ব্যবহার করে কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠতে পারবে না। রাজনীতিবিদদের রাজনীতিতে আসবে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা। রাষ্ট্র থেকে দূর হবে পচা আবর্জনার রাজনীতির বদলে ফিরবে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত। প্রতিষ্ঠিত হবে ভারসাম্যের রাজনীতি।

নির্বাচন কমিশন সংস্কার হলে জনগণের নাগরিক অধিকার ভোট নিয়ে কেউ আর ছিনিমিনি খেলতে পারবে না। দিনের ভোট রাতে কিংবা আগেরদিন দিয়ে রাখতে পারবে না। একজনের ভোট দিতে পারবে না আরেকজন। নির্বাচন নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং বন্ধ হবে। কর্তত্ববাদী হয়ে উঠবে না কমিশনের কর্তা ব্যক্তিরা। আর যদি করার চেষ্টা করে তাহলে ভয়াবহ শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। তাতে নাগরিকের ভোটের অধিকার থাকবে সমুন্নত। ফ্যাসিবাদী হাসিনা সবচেয়ে বেশি অনাচার করেছিল আদালতের ওপর বন্দুক রেখে। বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে অনাচারের স্বর্গরাজ্য করে তুলেছিল পুরোদেশকে। সেখানকার বিচারকরাও ফ্যাসিজমের দোসরের মতো আচরণ করছিলেন কেউ কেউ। বিচারকদের দুএকজন বলেই ফেলেছিলেন আমরা শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ। সংশ্লিষ্টরা বলছিলেন, বিচার বিভাগ সংস্কার হলে দেশের মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে। বিচারের বাণি আর নিভৃতে কাঁদবে না। বিচারকরা বিচারকসুলভ আচরণ করবে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্যোগ হচ্ছে বিচার বিভাগের আলাদা সচিবালয় তৈরি করা। যাতে বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। নিঃসঙ্কোচে দিতে পারবেন রায়।

হাসিনার ফ্যাসিজম কায়েমের প্রধান হাতিয়ার ছিল পুলিশ। পুলিশকে ব্যবহার করে হাসিনা একটি পুলিশী রাষ্ট্র কায়েম করা হয়। গুম খুন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় যতরকম অনাচার আছে সবকিছুই পুলিশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতো স্বৈরাচার হাসিনা। পুলিশের কাছে নাগরিক অধিকার ঠুনকো বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। আর বিরোধী রাজনীতিকরা ছিল পুলিশের হাতের ক্রীড়নক। যে কোন মানুষকে গ্রেফতার করে কিংবা গুলি করে হত্যা করে পার পেয়ে যেত পুলিশ। এসব থেকে নাগরিকদের মুক্ত করতে তৈরি করা হয় পুলিশ সংস্কার কমিশন। অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে পুলিশ তার সীমা রেখায় থাকলেও দলীয় সরকার ক্ষমতায় আসার পর আবারো পুরানো রূপে দেখা যাচ্ছে অনেক পুলিশ কর্তাকে।

দুর্নীতির মাধ্যমে লাখ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছিল ফ্যাসিবাদী রাজনীতিকরা এক্ষেত্রে দুদক ঠুটো জগন্নাথের ভূমিকায় ছিল। সেখান থেকে বের করে কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে এবং দুর্নীতি দমন কমিশন যাতে স্বাধীনভাবে দুর্নীতিবাজদের পাকরাউ করতে পারে সেজন্য গঠন করা হয় দুদক সংস্কার কমিশন। একইভাবে স্বাস্থ্যখাতের দুর্নীতি বন্ধ করে মৌলিক অধিকার স্বাস্থ্যসেবা যাতে জনগণের দোরগোড়ায় পৌছানো যায় সে লক্ষ্যে গঠন করা হয় স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন। বলা হয়েছিল, এই খাতের সংস্কার হলে চিকিৎসা ব্যবস্থায় ফিরে আসবে শৃঙ্খলা। নাগরিকরা পাবে তার ন্যায্য স্বাস্থ্য অধিকার।

নাগরিককে অন্যায়ভাবে গুম খুনের বিচার নিশ্চিত করতে গঠন করা হয় গুম খুন কমিশন। সবকিছু মিলিয়ে দেশের সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার জন্য ঐকমত্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয় জুলাই সনদ। একইভাবে গঠন করা হয় নারী বিষয়ক কমিশন এবং গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন। রাষ্ট্রের সুদূর প্রসারি উন্নয়নের লক্ষ্যে এই কমিশনগুলো গঠন করা হয়।

দেশের মানুষ অনেকটাই আশাবাদী হয়ে উঠেছিল যে, এসব সংস্কারগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। আর সামাজিক অনাচার এবং বৈষম্যগুলো দূরীভূত হবে। সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলে সমাজের সকল অন্যায্যতা দূর হবে। যেজন্য ছাত্র-জনতার রক্তে রঞ্জিত হয়েছে রাজপথ। দেড় হাজারের বেশি জীবন রাস্তায় লুটিয়ে পড়েছে। পঙ্গুত্ববরণ করেছে অগণিত তরুণ, যুবক, নারী-শিশু।

বলা বাহুল্য, ত্রয়োদশ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতার মসনদে আরোহণের পর একটা উল্টো চেহারা দেখা গেল কতিপয় রাজনীতিকের মধ্যে। সংস্কারের বিষয়গুলো মুখ্যতার জায়গা থেকে হারিয়ে গেলো তাদের কাছে। এর ন্যায্যতাটাকে এমনভাবে অবহেলিত করা হলো যে, কোন কোন ক্ষেত্রে গৌণতাও হারিয়েছে। মাত্র কয়েক মাসের মাথায় শুরু হয়ে গেলো সেই পুরানো স্টাইল। এ্ই স্টাইলের শুরু দলীয়করণের মাধ্যমে। প্রশাসনের সর্বস্তর থেকে মেধাবীদের বিদায় করে দিয়ে দলীয় লোক বসিয়ে দেওয়া হলো। ফলে আবারো সমাজের মধ্যে দেখা দিচ্ছে অস্থিরতা। বিচারহীনতা। অপশাসন আর দুর্নীতি লুটপাট চাঁদাবাজি।

বলা যায়, এতো দিনের আশা আকাক্সক্ষাকে তুরি মেলে আবারো সমাজে ফিরলো অপশাসনের কালো থাবা। অথচ সংস্কারগুলো কার্যকর করা হলে ভিন্নরকম সমাজ পাওয়ার কথা ছিল নাগরিকদের। গণতান্ত্রিক শাসনের ৫ মাস পর রাষ্ট্রের অবস্থা বিবেচনায় নিলে দেখা যাবে কোনভাবেই সংস্কারগুলোতে নজর নেই গণতান্ত্রিক সরকারের। ক্ষমতার জোরে দখলবাজি চলছে সবখানে। নাগরিকদের ন্যায্যতার কোন মূল্য নাই ক্ষমতার কাছে। একই কারণে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আগের মতোই দুর্নীতি প্রবেশ করেছে; তেমনি সবখাতে চলছে অনাচার অরাজকতা। ফলে ২০২৪ইং সালের ছাত্রজনতার রক্তের বিনিময়ে বিদায় করা ফ্যাসিজম আবারো ফিরছে শাসন ক্ষমতায়। ব্যাহত হচ্ছে জুলাইয়ের আকাক্সক্ষা। স্বৈরাচারের ভূত আবারো ভর করছে সবর্ত্র। আগের মতোই আমলাতন্ত্রের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে মানবতা। অবৈধ অন্যায্য প্রাপ্তির প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে প্রতিটি ক্ষেত্রে। ব্যাহত হচ্ছে সামাজিক বিশৃঙ্খলা। আশঙ্কা করা হচ্ছে সংস্কারগুলো যদি যথাযথভাবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ না নেওয়া হয় তাহলে ক্ষমতার হাত বদল হলেও জনগণের ভাগ্যবদল হবে না। দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার হবে আগের মতোই। আধিপত্যবাদ ফিরবে পুরানো স্টাইলেই। দেশের স্বাধীনতা হবে বিপন্্ন। অপূর্ণই থেকে যাবে এই দেশের প্রকৃত আজাদী প্রাপ্তির স্বপ্ন।

(ইবরাহীম খলিল, সিনিয়র রিপোর্টার দৈনিক সংগ্রাম)