অধ্যাপক মাযহারুল ইসলাম
ইংরেজিতে একটি কথা আছে- If money is lost, nothing is lost. If health is lost, something is lost. If character is lost, everything is lost. অর্থাৎ যদি টাকা-পয়সা হারায়, তাহলে কোনো ক্ষতি হয় না। যদি স্বাস্থ্য হারায়, তাহলে সামান্য ক্ষতি হয়। আর যদি চরিত্র নষ্ট হয়, তাহলে সবকিছুই বিনষ্ট হয় অর্থাৎ সবকিছু শেষ হয়ে যায়। কিছু আর বাকি থাকে না।
“চরিত্র মানুষের জীবনে যে কত বড় সম্পদ, তা একটু গভীরে গিয়ে চিন্তা করলেই বোঝা যায়। সমাজের ও আমার-আপনার চারপাশে তাকালেই তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।” ‘চরিত্র’ একটি ব্যাপক শব্দ। মানুষের জীবনের সব দিকই এর অন্তর্ভুক্ত। মানুষ তার দেহটাকে কীভাবে ব্যবহার করলো, তার হাত দুটি, চোখ দুটি, পা দুটি, তার মুখ, তার জিহ্বা, তার নাক-কান, তার মন-মানসিকতা, তার ইচ্ছাশক্তি অর্থাৎ একজন মানুষ তার সকল কাজকর্ম কীভাবে এবং কোন নিয়মে সম্পন্ন বা সম্পাদন করে, সবটাই তার চরিত্রের প্রকাশ ঘটায়। আমরা গ্রামগঞ্জে, শহরে-বন্দরে যে কোনো নির্বাচনের সময় স্লোগানে স্লোগানে শুনতে পাইÑ অমুক ভাইয়ের চরিত্র ফুলের মতো পবিত্র। কিন্তু চরিত্র কীরূপ, তা একমাত্র তার বাস্তব কাজকর্মেই বোঝা যায়। কথায় আছে “বৃক্ষের পরিচয় ফলে।”
একেবারে শিশুকালে যখন বাল্যশিক্ষা বা শিশুশিক্ষা আমরা হাতে নিয়েছি, তখন কি পড়েছি? আমরা পড়েছিÑ “সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি।’ ‘সদা সত্য কথা বলিবে, কখনো মিথ্যা বলিবে না। গুরুজনকে শ্রদ্ধা করিবে। পরের সম্পদ অপরহণ করিও না।’ ‘আদেশ করেন যাহা মোর গুরুজনে, আমি যেন সেই কাজ করি ভালো মনে।’ ‘ওগো দয়াময় তুমি থাকো সাথে সাথে, আলো করি আমার জীবন, সুদিন দূর্দিন, কিংবা অন্ধকার রাতে থাকো অনুক্ষণ।’ ‘যেথায় যখন রবো, সে স্থান নিয়ত চরিত্র করিব উজ্জ্বল।’ আরো কত শতসহস্র সুন্দর, সুন্দর কথা, বাক্য ও কবিতা মুখস্থ করেছি, যার সবকিছুই নির্মল ও পবিত্র চরিত্র গঠনের উপায়-উপাদান ও পাথেয়। আজ আমরা যারা বাবা-মা সমাজের সর্বস্তরের অভিভাবক, তাদের সকলেই জীবনের সেই বাল্যকালের প্রথম পাঠগুলো স্মরণ করা এবং বর্তমান ব্যবহারিক ও কর্মময় জীবনের সাথে মেলানোর প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
আজ ৬০-৭০ বছর পর আমরা কি দেখি। সবকিছুরই পরিবর্তন হয়েছে, অনেক অনেক উন্নতি হয়েছে। খাদ্য, অন্ন-বস্ত্র, বাসস্থান, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা সবকিছুই আশাতীত বেড়ে গেছে। সভ্যতা-ভব্যতার পরিবর্তন ঘটেছে।
কিন্তু আমরা যারা সেকেলে মানুষ তাদের মনে বড় দুঃখ লাগেÑ যখন কথাবার্তা, চালচলনে অসভ্যতা এবং অশ্লীলতার গন্ধ পাই। যখন কিশোর গ্যাংয়ের কথা শুনি এবং দেখি। কোনো কোনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এবং নানাবিধও কমেন্টে যেসব অশ্রাব্য শব্দ ব্যবহৃত হতে দেখি তা নিয়ে কিছু বলার কোনো ভাষা খুঁজে পাই না। সভ্যতার লেবাসের অন্তরালে অসভ্যতা, খুনোখুনি, মারামারি, ঝগড়াঝাটি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং কর্মীদের কোনো কোনো কথাবার্তা, মন্তব্য কোনো রূঢ় বা বেফাস হলে তাকে পলিটেকেল রেটরিক বলে চালিয়ে দেয়া। এছাড়া আরো কত কি? সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও মাদক গ্রহণে সয়লাব ইত্যাদি। কোনো উচ্চশিক্ষিত বড় বড় চাকরিজীবীদের মা-বাবাদের সাথে তথা মুরুব্বীদের সাথে তাদের ব্যবহার ও সম্পর্ক, বৃদ্ধাশ্রমে অবস্থান এবং একাকিত্বের আর্তনাদ, এমনকী শিক্ষার্থীদের মিছিলের স্লোগানে যেসব অশ্লীল-অশ্রাব্য শব্দ উচ্চারিত হতে দেখি তা আমাদের হতভম্ব ও বাকরুদ্ধ করে তোলে। অথচ তারাই তো আমাদের কলিজার টুকরো, ভবিষ্যতের কর্ণধার, তারাই তো দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ। তাই আজ কঠিনভাবে আত্মসমালোচনা করতে হবে এবং দেশ, জাতি ও মানবতার স্বার্থে নিজেকে, পরিবারকে, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সংশোধন করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ও পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
পৃথিবীতে যত ধর্ম আছে, সকল ধর্মই মানুষকে চরিত্রবান হতে শিক্ষা দেয়। মহাগ্রন্থ আলকুরআন এক সার্বজনীন চিরন্তন কল্যাণকর জীবনব্যবস্থা। মহানবী (সা.) তার জীবনের প্রতিটি কাজ, আচার-ব্যবহার, চাল-চলনের মাধ্যমে নির্মল ও সর্বোত্তম চারিত্রিক গুণাবলী এবং বৈশিষ্ট্য ধারণ করে মানবজাতিকে চলার দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন। আজ জাতি-ধর্ম-দল-মত নির্বিশেষে নিজ নিজ চরিত্রকে পর্যালোচনা করা জরুরি এবং অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়েছে।
আল্লাহ বলেন, ‘অবশ্যই তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মধ্যে রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ।’ (সূরা আহযাব : ২১)।
আল্লাহ আরো বলেন, ‘অবশ্য তুমি এক মহান চরিত্রে অধিষ্ঠিত।’ (সূরা কালাম : ৪)।
আমরা আজ যে পর্যায়ে আছিÑ যদি নিজেদের দিকে তাকাই, তাহলে অবশ্যই আমরা আদর্শ চরিত্র এবং নৈতিকতার সাথে কোনো মিল খোঁজে কি পাবো? যদি আমরা আদর্শ চরিত্র এবং নৈতিকতার সাথে আমাদের জীবন সামঞ্জস্যশীল পাই, তাহলে তো খুবই খুশির কথা। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আদর্শ চরিত্র, নৈতিকতা, সত্যবাদিতা, শিষ্টাচার, ন্যায়নিষ্ঠা ইত্যাদির সাথে যদি আমরা আমাদের জীবনকে মেলাতে যাই, তাহলে সাদৃশ্যের চেয়ে বৈসাদৃশ্যই বেশি করে ভেসে ওঠে।
আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে বণিত। তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ (সা.) কোনো অশালীন কথাবার্তা মুখে আনতেন না। অশালীন কোনো কাজও করতেন না এবং অপর কোনো লোকের সাথে অসদাচরণ করতেন না। তিনি বলতেন, তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই উত্তম, যে ব্যক্তি চরিত্রের দিকে উত্তম।” (বুখারী ও মুসলিম)।
উত্তম চরিত্রের ব্যাখ্যায় আব্দুল্লাহ ইবনে মোবারক (রহ.) বলেন, “উত্তম চরিত্র হলো হাসিমাখা চেহারা। আল্লাহর পথে ধন-সম্পদ খরচ করা এবং কাউকে কষ্ট না দেয়া।”
উত্তম চরিত্রের সীমা যে কত বিস্তৃত, তা এ ব্যাখ্যা থেকে পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। আর অসচ্চরিত্রের কোনো সীমারেখা নেই, তা যে কত অধঃপতন, কত নিম্নে নিয়ে যেতে পারে তার কোনো সীমারেখা নেই।
হজরত মুয়ায ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাকে ইয়েমেনে পাঠাবার সময় ঘোড়ার জিনে পা রাখার মুহূর্তে যে উপদেশ দিয়েছিলেন তা ছিলÑ “হে মুয়ায! মানুষের সাথে উত্তম ব্যবহার করো।” (মুয়াত্তা ইমাম মালেক)।
আবু উসামা (রা.) থেকে বর্ণিত। ‘রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, নিঃসন্দেহে সরল ও অনাড়ম্বর জীবন ঈমানের অঙ্গ।’ (আবু দাউদ)।
যারা মুমিন, তারা দুনিয়ায় সরল এবং সাদাসিদে জীবনযাপন করে। তারা পরকালের চিন্তায় মশগুল থাকে। এই দুনিয়ার জীবনে সুখ-স্বাচ্ছন্দের মোহে তারা ব্যস্ত থাকে না। পরের সম্পদ লুণ্ঠন করে না। ঘুষ, দুর্নীতি করে সম্পদশালী হওয়া তো দূরের কথা, বরং নিজের গায়ের ঘাম ফেলে যা আয়-উপার্জন করে, তা থেকেও গরিবের এবং দুস্থ মানবতার কল্যাণে ব্যয় করে। চারিত্রিক গুণাবলী, আদর্শ এবং নৈতিকতার কাছে ধন-সম্পদ অতি তুচ্ছ। একেবারেই মূল্যহীন।
সাহল ইবনে সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিজের জিহ্বা এবং লজ্জাস্থানের হেফাজতের জামিন হবে, আমি তার জান্নাতের জামিন হবো।’ (বুখারী, শরিফ)।
মানুষের এ দুটি অঙ্গ খুবই বিপজ্জনক। এ দুটি অঙ্গ দ্বারা সর্বাধিক পাপ কাজ সংঘটিত হয়ে থাকে। যদি কোনো ব্যক্তি এই দুটি অঙ্গ হেফাজত করে, তাহলে হাজারো পাপ থেকে সে বাঁচতে পারে এবং জান্নাত লাভ করতে পারবে, ইনশাআল্লাহ।
আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “নিঃসন্দেহে তার মুখ দিয়ে এমন কথা প্রকাশ করে, যা আল্লাহর সন্তুষ্টির কারণ হয়ে থাকে। কিন্তু সে তার প্রতি গুরুত্বারোপ করে না। অথচ উক্ত কথার কারণে আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। এভাবে মানুষ আল্লাহর অসন্তোষজনক কথাও বেপরোয়াভাবে মুখ থেকে বের করে বসে, যা তাকে জাহান্নামের দিকে ঠেলে দেয়।” (বুখারীশরীফ)।
এ হাদীস থেকে এই শিক্ষা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, মানুষ যেন তার জিহ্বা লাগামহীনভাবে ব্যবহার না করে। এমন কথা মুখ দিয়ে যেন না বলে, যা তাকে জাহান্নামের দিকে ঠেলে দেয়। অথচ আমরা বর্তমান সমাজে ঘুষ, দুর্নীতি, খুন-খারাবি, অনৈতিক কার্যকলাপ, অনাচার, অত্যাচার দেখতে পাই। এই মুখের অর্থাৎ জিহ্বার দ্বারা কত অনৈতিক কাজ সংঘটিত হচ্ছে। আপনি একবার ভেবে দেখুন তো, ঘুষ খাবেন, দুর্নীতি করবেন, অশ্লীল কাজ করবেন, যত অন্যায়-অপকর্ম তার জন্ম হয় কথা থেকেÑ অর্থাৎ জিহ্বা বা মুখ থেকে।
আদালতে আখিরাতে আল্লাহ তা’য়ালা শেষ বিচারের দিন প্রত্যেক ব্যক্তির আমলনামা দেখবেন। মুখ দিয়ে সেদিন অসত্য কথা বললেও ব্যক্তির, হাত-পা, কান-চোখ, তার দেহের প্রত্যেকটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আল্লাহর নির্দেশে কথা বলবে। আমি আজ তাদের মুখ সীলমোহর করে দিব এবং আমাদের সাথে কথা বলবে তাদেরহ হাত, আর সাক্ষ্য দেবে তাদের পা সে সম্পর্কে যা তারা কামাই করেছিল। (সূরা ইয়াসিন : ৬৫)। সেদিন দুনিয়ায় যে যাই করে থাকুন, তাদের ভালো ও মন্দ সব কর্মের প্রকাশ করে দেবে। সেখান থেকে পালাবার পথ নেই। আজ যেভাবে নারী নির্যাতন, শিশু নির্যাতন, অশ্লীলতা-বেহায়াপনা চলছে, তা ভাবতে গেলে শরীর-মন শিউরে ওঠে। অথচ মুখ দিয়ে কী কথা বলেছে, কান দিয়ে কী কথা শুনেছে, হাত দিয়ে কী কাজ করেছে, চোখ দিয়ে কী দেখেছে, পা দিয়ে কোথায় কোথায় গেছে, লজ্জাস্থান হেফাজত করেছে কিনা, সবকিছুই অকপটে প্রকাশ করবে। দুনিয়ায় যারা সচ্চরিত্রবান ও আদর্শ জীবনযাপন করেছে, তারা হবে জান্নাতবাসী, আর যারা অসচ্চরিত্র এবং অসৎ ও অপকর্ম করেছে, তারা হবে জাহান্নামবাসী। দুনিয়ায় ব্যক্তির আমলই সেদিন তার গন্তব্যস্থল ও নিবাস নির্ধারণ করে দেবে।
নবী করীম (সা.)-এর জীবন, আদর্শ এবং তার পবিত্র চরিত্রই আমাদের চলার একমাত্র মানদণ্ড। আজ আমরা আমাদের চারপাশে যা দেখতে পাচ্ছি, শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত নর-নারী যেসব ঘটনাবলী আমাদের সামনে বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে দেখতে পাই, তাতে বিবেকের দংশনে আমরা নিষ্পেষিত, বিবেকের কষাঘাতে জর্জরিত। তাই আজ সর্বস্তরের অভিভাবক আমাদের সকলকে এ টু জেড আত্মবিশ্লেষণ করতে হবে। একটি সুন্দর সমাজ বিনির্মাণের জন্য শিশু-কিশোর, যুবক-যুবতী, সকলের দিকে নজর দিতে হবে। নৈতিক শিক্ষায় এবং আদর্শে তাদের গড়ে তুলতে হবে। কারণ তারাই তো দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ। আমরা যারা সর্বপর্যায়ের অভিভাবক, তাদের স্ব স্ব জীবনের কর্মকাণ্ড নিয়ে আত্মবিশ্লেষণ করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত। “এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিল, ইসলামের কোন কাজটি উত্তম? রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, গরিব-মিসকিনদের খাবার দেয়া। সকল মুসলমানকে সালাম দেয়া। তোমার সাথে তার পরিচয় থাকুক আর না থাকুক। অর্থাৎ পূর্ব থেকে বন্ধুত্ব ও সম্পর্ক থাকুক বা না থাকুক।”
আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা মুমিন হবে। আর তোমরা মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা একে অপরকে ভালো না বাসবে। আমি কি তোমাদের এমনি এক কাজের কথা বলবো, যা করলে তোমরা একে অপরকে ভালোবাসবে? তোমরা পরস্পর ব্যাপকভাবে সালাম বিনিময় করো।” (মুসলিম)।
সত্যবাদিতা, নীতি-নৈতিকতা, আদর্শ এবং সচ্চরিত্র ও সামাজিকতার যাবতীয় কল্যাণ ও সর্বদিক থেকে ভালো এবং সর্বোত্তম তার একমাত্র মানদণ্ড হলো নবী করীম (সা.)-এর জীবনাদর্শ। তাই সার্বিকভাবে মহানবীর (সা.) অনুসরণ করার জন্য আমাদের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে এবং বাস্তব জীবনে তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। সর্বোপরি মনে জাগরুক রাখতে হবেÑ পৃথিবীতে ধন-সম্পদ নয়, ভোগবিলাস-ঐশ্বর্য ও প্রতিপত্তি এবং ক্ষমতা নয়; বরং এই নশ্বর পৃথিবীতে এবং অবিনশ্বর পরপারে সুখ-শান্তি, কল্যাণ ও মুক্তিলাভের একমাত্র উপায় এবং ভিত্তি হলো সচ্চরিত্র, নৈতিকতা, মানবিকতা এবং আল্লাহকে স্মরণ ও ভয় করা।
নবী করীম (সা.) বলেন, ‘চারিত্রিক সৌন্দর্য ও গুণাবলীর বিকাশ সাধনের জন্যই আমি প্রেরিত হয়েছি।’ (মুয়াত্তা ইমাম মালেক)।
উল্লেখ্য, একদিন এক সাহাবী (রা.) উম্মুল মুমিনীনী মা আয়েশা (রা.)-এর কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, নবী করিম (সা.) কেমন ছিলেন? মা আয়েশা (রা.) উত্তরে বললেন, তুমি কি কুরআন পড়নি? মা আয়েশা (রা.) পবিত্র মুখ থেকে উচ্চারিত একটি মাত্র বাক্যই রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মহান ও পবিত্র চরিত্রের পরিপূর্ণ প্রকাশ ও বিকাশ ঘটিয়েছে। আকাশ-পাতাল, আলো-বাতাস তথা বিশ্বজাহানের প্রতিটি ইঞ্চিতে চিরন্তন-ভাস্বর, প্রজ্জ্বলিত করে রেখেছে।
তাই আল্লাহ তথা পরকালের ভয় স্মরণে রেখে আমরা নিজে সৎকর্ম করি, অপরকে সৎকর্ম করার জন্য উদ্বুদ্ধ করি। নিজে ভালো হই এবং নিজ পরিবার, সমাজ তথা সকলকে আগামী দিনের আমাদের প্রিয়তম বংশধরদের সচ্চরিত্রবান ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলি। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন এবং হিদায়াত নসিব করুন। সহজ-সরল ও সোজা পথে পরিচালিত করুন।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে লক্ষ্য করে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন, ‘আল্লাহর দয়ায় তুমি তাদের প্রতি কোমল হৃদয় হয়েছিলে, যদি তুমি রূঢ় এবং কঠোরচিত্ত হতে, তবে তারা তোমার আশপাশ থেকে সরে পড়তো। সুতরাং তুমি তাদের ক্ষমা করো এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং কাজকর্মে তাদের সাথে পরামর্শ করো। অতঃপর তুমি কোনো সংকল্প করলে আল্লাহর ওপর নির্ভর করবে, যারা নির্ভর করে আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন।’ (আলে ইমরান : ১৫৯)।
আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর প্রতিটি নির্দেশ, কাজকর্ম, কথাবার্তা ইঙ্গিত-ইশারা তার সমগ্র জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ আমাদের জন্য অনুসরণীয় ও অনুকরণীয়। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) যে বিনম্র আচরণ করেছেন এবং আল্লাহ তায়ালা তাকে বিনম্র আচরণ করতে বলেছেন, তা আমাদের জন্য আলোকবর্তিকা এবং শিষ্টাচারের চালিকাশক্তি। আল কুরআনে যে সমস্ত শিক্ষা, সদাচরণ বা শিষ্টাচার সম্পর্কে আলোচনা আছে, তার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ অনেক হাদীসেও সুনির্দিষ্টভাবে তার উল্লেখ আছে।
ইয়াদ ইবনে হিমার (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ আমার নিকট ওহি পাঠিয়েছেন, তোমরা পরস্পর পরস্পরের সাথে বিনয় ও নম্রতার আচরণ করো। যাতে কেউ কারো ওপর ফখর ও গৌরব না করে এবং একজন আরেকজনের ওপর বাড়াবাড়ি না করে।’ (মুসলিম)।
নবী করিম (সা.) শিশুদের সাথে সুন্দর-কোমল আচরণ করেছেন এবং তাদের আদর করেছেন, কোলে নিয়েছেন, সালাম দিয়েছেন। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি কিছুসংখ্যক বালকের নিকট দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের সালাম দিলেন। তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) এমন করতেন। (বুখারি ও মুসলিম)।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘ভূপৃষ্ঠে দম্ভভরে বিচরণ করো না, তুমি তো কখনোই পদভরে ভূপৃষ্ঠ বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় তুমি কখনোই পর্বতপ্রমাণ হতে পারবে না।’ (সূরা বনী ইসরাঈল : ৩৭)।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘লোকদের থেকে মুখ ফিরিয়ে কথা বলো না আর জমিনের ওপর অহঙ্কার করে চলাফেরা করো না। নিশ্চয় আল্লাহ কোনো আত্মাহঙ্কারী দাম্ভিক ব্যক্তিকে পছন্দ করেন না।’ (সূরা লুকমান : ১৮)।
আল্লাহ বলেন, “যারা স্বচ্ছল ও অস্বচ্ছল অবস্থায় ব্যয় (দান করে), যারা ক্রোধকে হজম করে থাকে এবং লোকদের প্রতি ক্ষমার নীতি অবলম্বন করে চলে, আল্লাহ এ ধরনের মুহসিন এবং সৎকর্মশীলদের পছন্দ করেন।’ (সূরা আলে ইমরান : ১৩৪)।
হজরত আব্দুল্লাহ আমর ইবনে আস (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রকৃতিগতভাবে অশ্লীলতা পছন্দ করতেন না এবং তিনি অশ্লীলভাষীও ছিলেন না। তিনি বলতেন, তোমাদের মধ্যে উৎকৃষ্ট লোক তারাই, যাদের চরিত্র সর্বোৎকৃষ্ট। (বুখারি ও মুসলিম)।
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী করিম (সা.) থেকে আমি শুনেছি। তিনি বলতেন, ‘মুমিন তার সুন্দর স্বভাব ও সচ্চরিত্র দ্বারা দিনে রোজা পালনকারী ও রাত জেগে ইবাদতকারীর মর্যাদা হাসিল করতে পারে। (আবু দাউদ)।
বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সার্বিক জীবনের শিক্ষাগুলো যদি মানবসমাজ তাদের জীবনে আমল করে, বাস্তবায়ন করে, তাহলে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ সুফল লাভ অবশ্যম্ভাবী। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন, হে নবী! ‘ভালো ও মন্দ সমান নয়, মন্দকে দূরীভূত করো সর্বোত্তম (আচরণ) দিয়ে। তাহলে তোমার সঙ্গে যার শত্রুতা আছে সে হয়ে যাবে অন্তরঙ্গ বন্ধুর মতো’। (সূরা হা-মীম আসসাজদা : ৩৪)।
‘আর এহেন সুফল তারই ভাগ্যে জোটে, যারা বিশেষ ধৈর্য ও সহনশীল চরিত্রের অধিকারী এবং তারা অতীব ভাগ্যবান।’ (সূরা হা-মীম আসসাজদা : ৩৫)।
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ নিজে কোমল ও সহানুভূতিশীল। তিনি কোমলতা ও সহানুভূতিশীলতাকে ভালোবাসেন। তিনি কোমলতার দ্বারা ঐ জিনিস দান করেন, যা কঠোরতার দ্বারাই তিনি তা দেন না।’ তথা কোমলতা ছাড়া অন্য কোনো কিছুর দ্বারাই তিনি তা দেন না।’ (মুসলিম)।
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে জিনিসে কোমলতা থাকে, কোমলতা সেটিকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে দেয়। আর যে জিনিস থেকে কোমলতা ছিনিয়ে নেয়া হয়, সেটাই দোষ ও ত্রুটিযুক্ত হয়ে যায়।’ (মুসলিম)।
আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, “আমাকে কিছু উপদেশ দিন। তিনি বললেন, ‘রাগ করো না’। (লোকটি এটাকেই যথেষ্ট মনে না করে) কথাটিকে কয়েকবার আওড়াল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বার বার বললেন, ‘রাগ করো না’।” (বুখারি)।
ক্রোধ অর্থাৎ রাগ যে কত খারাপ একটি বিষয়, তা আমরা যারা সামান্যতম বুদ্ধি-জ্ঞান রাখি, সামান্যতমও বুঝি, তারা যদি একটু নিজের দিকে লক্ষ করি, তাহলে এর কুফলটি কী, তা ভেসে ওঠে। পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে এমনকি ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে এই রাগের কারণে কত দুর্ঘটনা ঘটে, অনাসৃষ্টির উদ্ভব হয়, মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়, পারিবারিক, সামাজিক শৃঙ্খলা বিনষ্ট হয়, তা আমাদের সামনে দিবালোকের মতোই স্পষ্ট। সবচেয়ে বড় কথা, যত বড় জ্ঞানীগুণী, বিদ্বান, পণ্ডিত, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ, রাষ্ট্রের কর্ণধার বা প্রশাসনের কর্মকর্তা যেই হোন না কেন, যদি তিনি রাগত অবস্থায় থাকেন, তার মন-মানসিকতা যদি বিন্দুমাত্র ক্রোধান্বিত অবস্থায় থাকে, তার পক্ষে সুস্থ-স্বাভাবিক সরল-সহজ এবং বস্তুনিষ্ঠ ও সঠিক কোনো সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। এই বিষয়টি ব্যক্তি থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমি কি জানাব না কোন লোক দোজখের আগুনের জন্য হারাম? (তাহলে শোন) ‘দোজখের আগুন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য হারাম যে লোকদের নিকট বা তাদের সাথে মিলেমিশে থাকে। যে কোমলমতি, নরম মেজাজ ও বিনম্র স্বভাব বিশিষ্ট। (তিরমিযী এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। আর বলেছেন, এটি হাসান হাদীস।)
বিশ্বজাহানের মালিক আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের সূরা ত্বীনে জয়তুন, সিনাই পর্বত এবং মক্কা নগরীর শপথ করে বলেছেন, নিশ্চয়ই আমরা মানুষকে সুন্দরতম গঠন আকৃতিতে সৃষ্টি করেছি...। তারপর আমরা পৌঁছে দেই নিচুদের চাইতেও নিচুতে। ১ নং থেকে ৮ নং আয়াতে তা হলোÑ মানুষকে সর্বোত্তম আকৃতিতে সৃষ্টি করা হয়েছে। তার কর্মফলে সে হয়ে যায়Ñ সর্বনিকৃষ্ট। তবে যারা ইমান আনে এবং সৎ কাজ করে তারা নয়।
ইসলাম শান্তির ধর্ম। কল্যাণকর জীবনব্যবস্থা। মানব জীবনের সার্বিক বিভাগ ও দিক নিয়ে এই চিরন্তন শাশ্বত কল্যাণকর জীবনব্যবস্থা এই পৃথিবীতে মানুষের জীবন-যাপন পদ্ধতি ও বিধান নিয়ে আলোচনা করেছে। শিষ্টাচার তথা আদব-কায়দাসহ পরিশীলিত ও পরিমার্জিত জীবন পরিচালনার পথ পরিক্রমা নির্ধারণ করে দিয়েছে এবং সে পথে উদ্ভব যেকোনো সমস্যার সমাধানও দিয়েছে। একটু হাসিমাখা মুখে, একটু নরম ভাষায় কোমলতার পরশে যে কোনো মানুষের মন জয় করা সহজ এবং সম্ভব হয়। এর মাধ্যমে পরিবারে, সমাজে তথা দেশে দলমত, ধর্মসহ সকল শ্রেণির লোকের মাঝে মহাশান্তির সুশীতল ছায়া নেমে আসে। শান্তির সুবাতাস বিশ্বের চারদিকে ছড়িয়ে দেয়া যায়। তথা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানও সম্ভব হয়ে ওঠে। বিশ্বমানবতার মাঝে ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি হয়, মানবতার জয়ধ্বনি হয় আকাশে বাতাসে। মহাগ্রন্থ আল কুরআন এবং হাদীসের আলোকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পুত-পবিত্র জীবন, ও কর্ম, আদর্শ, পরিপূর্ণভাবে ধারণ করে আমাদের জীবন গড়ে তুলি, প্রত্যেকটি শিক্ষা আমাদের জীবনে আমল করি। আমাদের সততা, বিনম্র ও পরিশীলিত, পরিমার্জিত ভাষা ও ব্যবহারের মাধ্যমে সকল দলের, মতের, ধর্মের ও শ্রেণির মানুষের মন জয় করি। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও শান্তিময় কল্যাণকর সুন্দর সমাজ ও পরিবেশ গড়ে তুলি। একটি সুন্দর ও আদর্শ সমাজ বিনির্মাণ এবং কল্যাণকর রাষ্ট্র গঠনে নিরলসভাবে কাজ করে যাই। বিশ্ব জাহানের মালিক ও স্রষ্টা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সহায় হোন। আমিন।
লেখক:
ইসলামী চিন্তাবিদ ও গ্রন্থকার