ড. কামরুল হাসান

কুল কায়েনাতের প্রিয় সৃষ্টি, সত্যনিষ্ঠা ও মানবিকতার মূর্ত প্রতীক, সকল যুগের সেরা মানুষ ছিলেন মুহাম্মদ ((সা.))। বিনাতর্কেই তিনি সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ ও প্রিয়তর। রাসুল মুহাম্মদ (সা.) এমন একজন মানুষ যার জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে রয়েছে আদর্শিক নমুনা। ব্যাপকতা এবং সার্বজনীনতা ছিল তার জীবনচরিতের অন্যতম স্বাতন্ত্র্য। পৃথিবী সৃষ্টির বহু শতাব্দি অন্তে তিনি পৃথিবীতে আগমন করেছেন। অথচ তিনি কর্তৃক সম্পাদিত হয়েছে এমন সব কার্য যার শুভ অভিযাত্রা তার হাতেই। এটিকেই আমরা বলতে চাইছি পাইওনিয়ার। শব্দটি ইংরেজি ভাষা হতে আগত যার অর্থ পথিকৃৎ। অন্যভাবে দিকপাল অর্থেও শব্দটির ব্যবহার বাংলা ভাষায় লক্ষ্য করা যায়।

একটি মানবীক বিশ্ব বিনির্মাণে রাসুল মুহাম্মদ (সা.)-এর অবদান সর্বাধিক। তিনি বিশ্বকে সাজিয়েছিলেন আদর্শ মানবীকতার আদলে। এই মহান কর্মযজ্ঞ সম্পাদন করতে গিয়ে তিনি সম্পৃক্ত হয়েছেন সংগঠন প্রতিষ্ঠায়, আত্মশুদ্ধির কর্মসূচি গ্রহণে, এগিয়ে এসেছেন আক্রমণ প্রতিরোধে, বাধ্য হয়েছেন অভিযান পরিচালনায়। আত্মগঠন কিংবা আত্মশুদ্ধির কর্মসূচি প্রণয়নে, অভিযানের কৌশল নির্ধারণে, মানবের মানস চিন্তায় প্রভাব বিস্তারে তার মোহময় কর্মকৌশল বলে দেয় তিনি কেবল সমকালে নয় সর্বকালের জন্যই ছিলেন দ্য গ্রেটেস্ট লিডার। তার কর্মপদ্ধতির ধরন দেখলে মনে হয় তিনি ছিলেন মানবিক সমাজ গঠনের একজন সত্যিকার পাইওনিয়ার বা পথিকৃৎ। আমরা আমাদের অত্যন্ত পরিচিত ও ইতিহাস প্রসিদ্ধ কিছু ঘটনার পৃষ্ঠা উল্টালেই বুঝতে পারব রাসুল মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন একজন সত্যিকারের পাইওনিয়ার।

আমাদের অনেকের ধারণা বালক মুহাম্মদ নবী হবার পূর্বেই মক্কার সামাজিক অশান্তি বিদূরণে জনবান্ধব একটি সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন। যার নাম দেন হিলফুল ফুজুল বা সম্মানীয়দের প্রতিজ্ঞা সংঘ। ইতিহাসের পাঠ আমাদেরকে জানায়- প্রকৃতপক্ষে মুহাম্মদ ঐ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেন প্রস্তাবক।

হিলফুল ফুজুল প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট ছিল- কোনো এক বৎসর হজ¦ মওসুমে ইয়েমেনের এক ব্যবসায়ীর নিকট হতে তার সমুদয় ব্যবসায় পণ্য বাকিতে খরিদ করে আছ ইবনু ওয়ায়েল নামক মক্কার এক দুরন্ত মাস্তান। অনন্তর সে মাল-সামানার বকেয়া পরিশোধ করতে অস্বীকার করে। অতিথি ব্যবসায়ী পড়ে যায় মহা বিপদে। অনন্যোপায় হয়ে সে মক্কার অভিজাত নেতৃবৃন্দের স্মরণাপন্ন হয়। এর প্রতিকার চায়। নেতৃবৃন্দ শেষতক বৈঠকে মিলিত হবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

নির্ধারিত দিনে বৈঠক শুরু হয়। নেতৃবৃন্দ বৈঠকে যোগদান করেন। মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন ঐ বৈঠকের আমন্ত্রিত সভ্য। সবাই সমস্যার সুরাহায় অস্থায়ী সমাধান দেয়। কারোটি কারো নিকটে পছন্দ হয় না। সভাপতি মহোদয় মুহাম্মদকে জিজ্ঞেস করে- মুহাম্মদ তোমার অভিমত কী? বিনীত কণ্ঠে মুহাম্মদ জবাব দেন- আপনাদের অভিমত অত্যন্ত সুন্দর। কিন্তু কোনোটিই এইসব অন্যায্য কর্মের উৎপাটনে স্থায়ী কোনো সমাধান নয়। বরং আমাদের এমন পরিকল্পনা নেয়া উচিৎ- যাতে আরব অঞ্চলে পরবর্তিতে এমন ঘটনার সূত্রপাত আর না হয়। অন্যায়ের প্রতিরোধ আর ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায় ঐক্যমত পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিৎ। বালক মুহাম্মদের কথা তাদের মন কাড়ে। তার বক্তব্য ও নির্দেশনা মোতাবেক তারা একটি সংগঠনের বুনিয়াদ স্থাপন করেন। যার নাম দেন হিলফুল ফুজুল। হিলফুল ফুজুল নামক স্বেচ্ছাসেবি সংগঠনের প্রস্তাবক, নির্দেশক, নেপথ্য কারিগর ছিলেন মুহাম্মদ (সা.)।

কষ্ট, সহিষ্ণুতা আর সহনশীলতার পরম পরাকাষ্ঠার মধ্য দিয়ে মুহাম্মদের জীবন পরিক্রমা অগ্রসর হতে থাকে। তার হায়াতে জিন্দেগির চল্লিশতম বর্ষের এক শুভক্ষণে স্বর্গীয় বার্তাবাহক জিবরিল আমিন তার সাথে সাক্ষাৎ করেন। নবুওতের দীক্ষা প্রদান করেন। মুহাম্মদ এবার নবী মুহাম্মদ হিসেবে পরিচিতি পান। মুহাম্মদের নতুন জীবনের সূত্রপাত হয়। ইসলামী দাওয়াহ‘র কাজে নিজেকে সমর্পণ করেন। হাতে গোণা কয়েকজনের বাইরে কেউ তাকে সমর্থন করে না। তার বিদ্রোহে সবাই মেতে উঠে। নবী মুহাম্মদের সকল শ্রম পণ্ড হতে থাকে। আশায় যেন গুড়ে বালি। নিজ কবিলা থেকে তিনি এবার দৃষ্টি ফেরান দূরে কোথাও।

প্রিয়নবী ইসলামী দাওয়াহ‘র সম্প্রসারণে দৃষ্টি দেন তায়েফের দিকে। বড় আশা নিয়ে তিনি গমন করেন তায়েফে। সেখানে আমরা কী দেখেছিলাম? ইতিহাসের বর্ণনা আমাদেরকে এ তথ্য দিয়ে নিশ্চিত করে- মুহাম্মদ (সা.) নবী হবার পর মক্কায় পরিচিত স্বজন, সজ্জন ও ঘনিষ্ঠজনদের মাঝে দাওয়াতি কর্মকাণ্ড পরিচালনার ফলাফল বেশি আশাবাদী হয়নি। ইতোমধ্যে নবুওতের প্রায় দশ বৎসর অতিক্রান্ত হয়েছে।

৬১৯ খ্রিস্টাব্দ চলমান। রাসুল (সা.)কে বিশেষ সহায়তাকারী পিতৃব্য চাচা আবু তালিব ও প্রিয় সহধর্মিনি বিবি খাদিজা রাদি. পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। রাসুলের এ অসহায়ত্বে মক্কার কাফিরগোষ্ঠীর অত্যাচার আরো বেড়ে যায়। এমতাবস্থায় তিনি মক্কার নাতিশীতোষ্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত তায়েফে তিনি তার দাওয়াতি মিশন পরিচালনার উদ্দেশ্যে গমন করেন। বড় আশা নিয়ে তায়েফ যান।

এ সময় তার সাথী ছিলেন বিশ্বস্ত অনুচর জায়েদ ইবনু হারিসা রাদি.। তায়েফের বানু সাকিফা গোত্রে তিনি ইসলামের মহান বাণী প্রচার শুরু করেন। তায়েফের নেতৃবৃন্দ তার দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করেন। নবীর উপর ক্ষুব্ধ হন। তির্যক গালমন্দ ও ভর্ৎসনা ছুড়ে মারেন। বখাটে আর দুষ্টু পোলাপানকে তার পিছনে লেলিয়ে দেন। দুষ্টু বালকরা নিরীহ এই দুইজনকে নির্বিচারে পাথর মারতে থাকে। তাকে রক্তাক্ত করে। শরীরের রক্ত গড়িয়ে পড়তে থাকে। উষ্ণ লহু শরীরকে ভিজিয়ে দেয়। পা এবং পাদুকা রক্তে সিক্ত হয়। রক্তাক্ত নবী মুহাম্মদ ও তার সাথীকে তারা শহর থেকে কেবর করে দেয়। তায়েফের নেতৃবৃন্দ নবীর সাথে ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও উপহাসমূলক আচরণ করে। পাথর বৃষ্টিতে রক্তাক্ত নবী পাশের আঙুর বাগানে আশ্রয় নেন। অত্যন্ত বিনীত কণ্ঠে রব সকাশে দোয়া করেন-

“ইয়া আল্লাহ! আমার দুর্বলতা, অসহায়ত্ব এবং মানুষের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের অভিযোগ আমি কেবল তোমার কাছেই করছি।”

এ সময় পাহাড়ের দায়িত্বে থাকা ফিরিস্তা ও জিবরিল আমিন নবীকে জানান- আপনি চাইলে পাহাড় বেষ্টিত তায়েফকে পাহাড় দিয়ে দুই পাশ থেকে চাপা দিয়ে তায়েফ শহরের অস্তিত্ব বিলীন করে দেই।

জবাবে নবী প্রতিশোধ স্পৃহাকে অগ্রাহ্য করেন। সহনশীলতার পরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেন। করুণা পরবশ হয়ে দোয়া করেন- না আমি ধ্বংস চাই না। বরং আমি আশা করি তাদের উত্তরসূরিদের মধ্যে এমন বান্দার আবির্ভাব হবে যারা আল্লাহর ইবাদাতে আগ্রহী হবে। সহনশীলতার এক অতুলনীয় ও বিমূর্ত প্রকাশ। এর দৃষ্টান্ত এই পৃথিবীতে এর আগে-পরে আমরা দেখিনি। এটি মানব সমাজের অনুপ্রেরণার প্রথম উৎস হতে পারে।

নবুওত লাভের পর কেটে গেছে আরো তেরো বছর। অবিরাম দাওয়াতি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন নবী মুহাম্মদ (সা.)। কাক্সিক্ষত ফল না পাওয়া, নির্যাতনের পরিধি বৃদ্ধি পাওয়া, সহিংসতার আশংকা সর্বোপরি আল্লাহর নির্দেশে তিনি মক্কা হতে মদিনায় হিজরত করেন। এবার কিছুটা আনুকুল্য পান। দাওয়াতি পরিবেশে বাধা বিপত্তি কমে আসে। মদিনাবাসী দ্বীনের নবীকে গ্রহণ করেন স্বানন্দে। মদিনাবাসীর দীর্ঘদিনের অনৈক্য ঐক্যে রূপ নেয়। নবী মুহাম্মদ (সা.)কে তারা লিডার হিসেবে মানতে সম্মত হয়। নবী (সা.) বিবদমান দুই গোষ্ঠীর ঐক্য প্রতিষ্ঠায় মনোযোগী হন। সফলতার সাক্ষাৎ পান। ইসলামী দাওয়াহ্ কার্যক্রম শনৈ শনৈ গতিতে এগিয়ে চলে। ইসলামী আদর্শে অনুপ্রাণিত হন অনেকেই। ইসলামী নৈতিকতার সুবাস ছড়িয়ে পড়ে চতুর্দিকে। এ সংবাদ পৌঁছে যায় মক্কার সর্বত্র। তারা উৎকণ্ঠিত হয়। গাঢ় মনস্তাপে জ্বলতে থাকে। এর সুরাহা তারা করতে চায়। ক্রম-অগ্রসরমান এ শক্তিকে দুনিয়া হতে মিইয়ে দিতে চান। তারা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকে। ছোট-খাট চোরাগোপ্তা হামলার ঘটনাও ঘটে। অনতিবিলম্বে এই দুই পক্ষ মদিনার দূরবর্তি স্থান বদরে তারা মুখোমুখি হয়। একদিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে সত্তর জন যোদ্ধার জীবননাশ ও অন্য সত্তর জন বন্দির নির্লজ্জ ঘটনাসমেত কাফিররা মুসলমানদের কাছে নির্মমভাবে পরাজিত ও লাঞ্ছিত হয়। কুরাইশদের ঔদ্ধত্যে চুনকালি পড়ে। অধিকতর অপমানকর ছিল সত্তর জনের বন্দি হওয়া। এবার আসে বন্দিমুক্তির প্রসঙ্গ। যুদ্ধবন্দিদের সাথে ইসলামী শক্তির আচরণের প্রসঙ্গ।

এ সময় মুসলিম শিবিরে দুটি ধারা লক্ষ্য করা যায়। এক পক্ষ কঠোরতার পক্ষে। অন্য পক্ষ কোমলতা ও নমনীয়তার পক্ষে। কারণ তাদের হতে প্রাপ্ত অর্থ মূল্য এই দুর্দিনে মুসলমানদের কাজে লাগবে। মুহাম্মদ (সা.)-এর অভিমত নমনীয়তার পক্ষে ছিল। রাসুল মুহাম্মদ (সা.) তার দ্বীনের শত্রু, ইসলামের চিরশত্রুদেরে সাথে অত্যন্ত সদয়, নমনীয় ও আত্মীয়সুলভ আচরণ করেছিলেন। সাহাবিদেরও এমন আচরণের নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সকল বন্দিকে তিনি তিন পর্যায়ে মুক্তি দেন। ক. ধনী বন্দিদের অর্থমূল্যের বিনিময়ে মুক্তি দেন। খ. দরিদ্র কিন্তু শিক্ষিতদের দশজন মদিনাবাসীকে লেখাপড়া শিখাবে এই শর্তে মুক্তি দেন। গ. যাদের অর্থ নেই আবার শিক্ষাও নেই এমন কিছু বন্দিকে বিনা পণে মুক্তি দেন। সত্যিই রাসুলের ঔদার্যের তুলনা মেলা ভার। ক্ষমা, সহিষ্ণুতা, সহনশীলতার এমন উপমা পৃথিবীতে পাওয়া যাবে না। এর আগেও না পরেও না।

অনৈক্য ও ভেদাভেদ দূর করে, কুসংস্কার ও অপসংস্কৃতি বিদূরীত করে, মিথ্যার অপসৃতি নিশ্চিত করে, নৈতিকতার প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে তিনি একটি শিশু ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। যা পৃথিবীর ইতিহাসে এখনও একমাত্র। এর আগেও পৃথিবীতে ইসলামী রাষ্ট্র ছিল। আদম আ. প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র ছিল তার সন্তানদের নিয়ে, নুহ আ. প্রতিষ্ঠা করেছিলেন প্লাবন পরবর্তিতে একটি কল্যাণ রাস্ট্র, সুলাইমান আ. বিশ্বব্যাপী বিশাল ইসলামী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। রাসুল (সা.) প্রতিষ্ঠিত মদিনার ইসলামী রাষ্ট্রের সাথে যার তুলনা করা যায় না। মদিনায় বিবদমান শত্রু ভাবাপন্ন গোত্রসমূহের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা, নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া এটি সহজ কোনো বিষয় নয়। মদিনার গোত্রসমূহের মধ্যে ঐক্যের বন্ধন স্থায়ী করতে তিনি হিজরতের পর প্রথম কাজ হিসেবে যে সনদ প্রণয়ন করেন তা আজও বিশ্বের সর্বপ্রথম লিখিত সনদ হিসেবে সুবিদিত। এ সনদ একইসাথে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবেও স্বীকৃত। মানবতার নবী, মানবতার বন্ধু হিসেবে তার এ সকল কর্মকাণ্ড বিশ্বকে অবাক করে দেয়। একজন নিরক্ষর মানুষের জন্য এটি সম্ভব হয় কী করে? সমাজের ঐক্য প্রতিষ্ঠা ও ইসলামী রাষ্ট্রের গোড়াপত্তনে তার এ উদ্যোগদ্বয় জগদ্বাসীর জন্য ছিল পথিকৃৎ।

অসত্যের মূলোৎপাটনে ও সত্যের প্রতিস্থাপনের অবিরাম সংগ্রামে এতটুকু বিরতি নেই মহানবীর। ইতোমধ্যে হিজরতের মতো দুঃসাহসি সিদ্ধান্ত নিয়ে হিজরত করেছেন। হিজরত করেই আওস ও খাজরাজ গোত্রের মাঝে মৈত্রী সম্পর্কের বন্ধন তৈরী করেছেন। সম্মিলিত জাতিসত্তা গঠনের প্রয়াসে মদিনা সনদ প্রণয়ন করেছেন। ইসলামবিরোধী শিবিরের আক্রমণ মুকাবিলায় বদরের প্রান্তরে শত্রুসেনার মুখোমুখি হয়েছেন। মুসলিম বাহিনীর প্রদর্শিত সাহস ও আল্লাহ নির্ভরতায় এক মহান বিজয়ের দেখাও পেয়েছেন। এ সকল কর্মকাণ্ডে তিনি পথিকৃতের নজরানাও পেশ করেছেন। তবুও বিরোধীদের শত্রুতা শেষ হয় না। তারা বদরের প্রতিশোধ নিতে উম্মুখ। তারা বদরের পরাজয়ের লজ্জা কোনোভাবেই বিস্মৃত হতে পারে না। এক বৎসর পেরুতে না পেরুতেই প্রতিশোধের নেশায় উম্মাদ প্রায় কোরাইশ গোষ্ঠী আবারও ইসলামী শক্তির মুকাবিলার জন্য উহুদের পাদদেশে একত্রিত হয়। পাহাড় বেষ্টিত অঞ্চল হবার কারণেই নবী (সা.) প্রথমেই যুদ্ধের স্ট্রাটেজি নির্ধারণ করে সাহাবিদের সতর্ক করেন- মদিনার নিকটেই আমাদের অবস্থান। তারা আগত শত্রু। আমাদের মনে রাখতে হবে- পথ-ঘাট আমাদের বেশি চেনা। সৈন্য সংখ্যার প্রস্তুতিতেও আকস্মিক আমাদের তিনশত সৈন্য কমে গেছে। তবুও ভীতির কিছু নেই। কেবল এই সংক্ষিপ্ত গিরিপথের প্রতি আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে। শত্রুপক্ষ যেন কোনোভাবেই ঐ পথ দিয়ে আমাদের সেনা ছাউনিতে প্রবেশ করতে না পারে। আমি এই পঞ্চাশ জনকে দায়িত্ব দিচ্ছি জয়-পরাজয় কোনো অবস্থাতেই তারা তাদের স্থান ত্যাগ করবে না।

উহুদের ময়দান উত্তপ্ত হয়ে উঠে। মুহূর্মুহূ তীর নিক্ষেপ, পাথর বর্ষণ, মল্লযুদ্ধে তরবারীর ঝনঝনানি, রক্তের নহর, আক্রমণ পাল্টা-আক্রমণ সবই মুসলিমদের পক্ষে বলে অনুমিত হয়। আকস্মিক যুদ্ধের হৈ-চৈ পাল্টে যায়। মুসলিম শিবিরে অস্থিরতা ও ছোটাছুটি লক্ষ্য করা যায়। ময়দানের পরিস্থিতি যেন বদলে যায়। সেই সংক্ষিপ্ত গিরিপথের অধিকাংশ জায়গা ছেড়ে দিয়েছে মুসলিমরা। রাসুল (সা.) মারা গেছেন বলে গুজব ছড়িয়েছে কাফিরবাহিনি। মুসলিম সৈন্যদের হতাশা ঘিরে ধরে। কৌশলী যোদ্ধা খালিদ বিন ওয়ালিদ সুযোগ পেয়ে গিরিপথ দিয়ে মুসলিম সৈন্যদের ঐক্যব্যুহ ভেঙে দিতে সক্ষম হন। যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে কোনো বিতর্ক বা বক্তব্য নয়। বক্তব্য রাসুলের দূরদর্শিতা নিয়ে। নেতার নির্দেশ ভুলে গিয়ে কিংবা অগ্রাহ্য করে কিংবা ভুল ব্যাখ্যার জন্যই এই অপরিণামদর্শি ফলাফল। অর্জিত বিজয় হারানোর পথে। রাসুল মুহাম্মদ (সা.)-এর কী দূরদর্শিতা, কী পরিণামদর্শিতা! বারবার ভাবি আর বিস্মিত হই। স্বগতঃ বলি- মুহাম্মদ (সা.) : দ্য পাইওনিয়ার।

দুটি ঘটনা একীভূত করে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করছি। আমরা দুটি ঘটনাই কমবেশি জানি। হোদায়বিয়ার সন্ধি এবং মক্কা বিজয়। দুটোর একত্র আলোচনার কারণ হলো- একটি আরেকটির সাথে সম্পৃক্ত। হোদায়বিয়ার সন্ধির প্রেক্ষাপট যাই হোক না কেন সন্ধি চুক্তি সম্পাদিত হচ্ছিল এক ভয়াবহ যুদ্ধ এড়ানোর মানসিকতায়। কিন্তু দৃশ্যত সন্ধির শর্তাবলী ছিল মুসলমানদের ঘোর বিপক্ষে এবং মর্যাদাহানিকর। প্রায় সকল সাহাবির অসম্মতি সত্ত্বেও রাসুল মুহাম্মদ (সা.) সন্ধিচুক্তি সম্পাদনে আগ্রহী ছিলেন। মানবতার নবী রক্তপাত চাননি এবং তার দিব্যদৃষ্টি বলে দিয়েছিল এত রয়েছে মানবতার বৃঘত্তর কল্যাণ সর্বোপরি সুবিপুল বিজয়ের সুক্ষè নির্দেশনা।

দুই বৎসর অন্তে আমরা সুক্ষèদর্শিতার প্রতিফলন দেখেছি। হোদায়বিয়ার সন্ধিতে সাহাবির উপস্থিতি ছিল দেড় হাজারের কম। আর মক্কা বিজয়ে সেই সংখ্যা এসে দাঁড়ায় দশ হাজারে। রক্তপাত এড়িয়ে হোদায়বিয়ার সন্ধি এনে দেয় রক্তপাতহীন মক্কা বিজয়ের সুবর্ণ সুযোগ। নেতৃত্বের এমন যোগ্যতা, রাজনৈতিক এমন দূরদর্শিতা আমরা আর কোথায় দেখেছি? দেখিনি কোথাও। তাই আমাদের অকৃত্রিম স্বীকারোক্তি- মুহাম্মদ (সা.) : দ্য পাইওনিয়ার।

ইসলামের স্তম্ভ পাঁচটি। সবকটির বাস্তবায়ন রাসুলের জীবনে হয়েছে। হজ¦ সম্পাদন নানাবিধ ব্যস্ততার কারণে হয়ে উঠেনি। নবুওতের শেষবর্ষের অল্পদিন আগে তিনি হজ¦ পালনের নিমিত্তে মক্কা অভিমুখে গমন করেন। হজ¦ সম্পাদন সম্পন্ন করেন। হজে¦র আনুষ্ঠানিকতার শেষাংশে তিনি সমবেত হাজীদের উদ্দেশ্যে এক যুগান্তকারী ভাষণ প্রদান করেন। ইতিহাসে যা বিদায় হজে¦র ভাষণ নামে সুবিদিত। তার এ ভাষণ ছিল সমগ্র মানবতার জন্য এক অমূল্য দীপ্তবাক। এই ভাষণে তিনি সমাজ, সংসার, রাষ্ট্র, রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্মীয় চেতনা, সংস্কৃতির দৃষ্টিভংগি, শিক্ষার প্রণোদনাসহ মানব জীবনের প্রয়োজনীয় সকল অনুষঙ্গের উল্লেখ করে প্রয়োজনীয় ও বাস্তবানুগ দিক নির্দেশনা প্রদান করেন। কিছু চালাক ঐতিহাসিক এটিকে ম্যাগনা কার্টার সাথে তুলনা করতে চান। আমরা তাতে অসম্মানিত বোধ করি। অপ্রস্তুত হই। কারণ বিদায় হজে¦র ভাষণের অনবদ্যতার তুলনা পরবর্তী কোনো ভাষণের সাথে হতে পারে না। বরং ম্যাগনা কার্টা হতে পারে বিদায় হজে¦র ভাষণের অনুকরণ বা অনুসরণ। মানবতার জন্য এমন স্বচ্ছ ভাষণ এবং মানবীকতার এমন পরিচ্ছন্ন অভিব্যক্তি কেবল মুহাম্মদের ভাষণেই পাওয়া যায়।

এ প্রবন্ধে আমরা হয়তো আধা ডজন বা তার দু-একটি বেশি জায়গা চিহ্ণিত করে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছি প্রফেট মুহাম্মদ (সা.) : দ্য পাইওনিয়ার। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো- এমন ডজন ডজন, শত-সহস্র কিংবা অযুত-নিযুত ঘটনার উল্লেখ সম্ভব হবে যাতে প্রমাণিত হবে- প্রফেট মুহাম্মদ (সা.) : দ্য পাইওনিয়ার। সুপরিসর সময় না পাওয়া, জ্ঞানের স্বল্পতা, কলেবরের সংকীর্ণতা, আবিস্কৃতির অযোগ্যতা ইত্যাদি কারণে আমরা ততবেশি ঘটনার উল্লেখ করতে পারিনি। সেদিন হয়তো বেশি দূরে নয় যেদিন আরো বিস্তৃত পরিসরে এ নিয়ে সমৃদ্ধ আলোচনা ও লিখার সুযোগ সৃষ্টি হবে। আমাদের সম্মানিত পাঠক সমাজের প্রতিও আবেদন রাখি- তারাও এ কাজে সোৎসাহে এগিয়ে আসবেন। রাসুল (সা.)কে নিয়ে এমন ভাবনা, ভাবনার অভিনবত্ব, নিত্য গবেষণা নিঃসন্দেহে রাসুল চরিতের অনন্য মুজিযাও বটে। রাসুল (সা.)কে নিয়ে এ গবেষণার পথ কোনোদিন রূদ্ধ হবে না। সে কারণেই বিনীত কণ্ঠে বলতে চাই- প্রফেট মুহাম্মদ (সা.) : দ্য পাইওনিয়ার। মহান রাসুলের জন্মের এই মাসে অন্তর থেকে নিংড়ানো ভক্তি নিঃসৃত করে কোরাস কণ্ঠে বলতে চাই- প্রিয় রাসুল! আপনার প্রতি বর্ষিত হোক আল্লাহর পক্ষ হতে অজস্র শান্তিরাশি। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

লেখক:

গবেষক ও কথাসাহিত্যিক। অধ্যাপক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া