নাছির উদ্দিন শোয়েব
সভ্যতার বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের লেনদেনের ধরনও বদলেছে। মানুষের প্রয়োজনে সমাজে লেনদেন ব্যবস্থার প্রবর্তন হয়েছে। কালের পরিক্রমায় মুদ্রা এবং কাগজের টাকার যুগ পেরিয়ে আজ প্লাস্টিক কার্ড ও ডিজিটাল পেমেন্টে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তির এই জয়যাত্রায় বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ডিজিটালাইজ করার যাত্রায় ‘বাংলা কিউআর’ (Bangla QR) এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। একটি মাত্র সর্বজনীন কিউআর কোড ব্যবহার করে যেকোনো ব্যাংক বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাপ থেকে মুহূর্তেই পেমেন্ট করার এই সুবিধা চালু হয়। বিশেষ করে ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভাসমান ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল অর্থপ্রদানের আওতায় এনে ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ’ গড়ে তোলাই বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান লক্ষ্য।
তবে চালুর পর থেকে বেশ কিছুটা সময় পার হয়ে গেলেও কাঙ্ক্ষিত গতি পায়নি এই উদ্যোগ। শহর থেকে গ্রাম—সর্বত্র ক্যাশলেস লেনদেনের পরিধি সম্প্রসারণের পথেই যেন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বাড়তি করের ভয়, প্রান্তিক পর্যায়ে দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগ এবং প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া প্রযুক্তিগত বিভ্রাট। বাংলা কিউআর বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক ও আইনি বাধা এসেছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের রাজস্বসংক্রান্ত ভয় থেকে। বাংলা কিউআর ব্যবহার করতে হলে ছোট দোকানদার বা হকারদের একটি ডিজিটাল মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়। প্রথাগতভাবে দেশের সিংহভাগ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ক্যাশ লেনদেনে অভ্যস্ত এবং তাদের একটি বড় অংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের অন্তর্ভুক্ত। কিউআর পেমেন্ট গ্রহণ করলে প্রতিটি লেনদেনের রেকর্ড ব্যাংকিং সিস্টেমে সংরক্ষিত থাকে। ফলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে ভ্যাট বা আয়করের নোটিশ আসতে পারে—এই ভয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। অনেক ছোট ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, ব্যাংকে মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট খুলতে গেলেই এনবিআরের ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন (ঞওঘ) বা অতিরিক্ত নথিপত্র চাওয়া হয়। যেখানে চা-দোকানি বা সবজি বিক্রেতার ট্রেড লাইসেন্স বা টিআইএন থাকা বাস্তবসম্মত নয়। ফলে এনবিআরের অডিটের আওতায় পড়া বা ভবিষ্যতে বাড়তি ট্যাক্স পরিশোধের আশঙ্কায় তারা কিউআর কোড প্রদর্শন করতে অনাগ্রহ দেখান।
উৎসে কর বা চার্জ ভীতি: ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে যে চার্জ প্রযোজ্য, বাংলা কিউআরে ক্ষুদ্র মার্চেন্টদের জন্য তা নামমাত্র বা শূন্য করা হলেও অনেক জায়গায় এখনও অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। ব্যবসায়ীরা মনে করেন, নগদ টাকায় লেনদেন করলে যে পুরো টাকাটা সরাসরি তাদের হাতে থাকে, ডিজিটাল লেনদেনে তার ওপর কোনো অদৃশ্য ফি বা রাজস্ব বিভাগের চোখ পড়বে। এছাড়া, পেমেন্ট টেকনোলজির মূল ভিত্তি হলো নিরবচ্ছিন্ন ও দ্রুতগতির কানেক্টিভিটি। বাংলা কিউআরের ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত এই দুর্বলতা এক বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের বিভাগীয় শহরগুলোর বাইরে বা জেলা-উপজেলা পর্যায়ে ৩জি বা ৪জি নেটওয়ার্কের স্থায়িত্ব অত্যন্ত শোচনীয়। কোনো গ্রাহক যখন কিউআর কোড স্ক্যান করে পেমেন্ট করতে যান, তখন নেটওয়ার্কের ধীরগতির কারণে প্রসেসিং বাফার করতে থাকে। ডিজিটাল ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অনেকেই ওয়াই-ফাই সুবিধার বাইরে থাকেন। সার্বক্ষণিক মোবাইল ডেটা অন রাখা তাদের জন্য একটি বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ। ডেটা প্যাকেজের চড়া দাম এবং দুর্বল ইন্টারনেট গতির কারণে বিক্রেতা ও গ্রাহক উভয়েই সময় বাঁচাতে নগদ লেনদেনে ফিরে যান। অন্যদিকে, বাংলা কিউআর ব্যবহারের জন্য গ্রাহক ও মার্চেন্ট উভয়েরই ইন্টারনেট-সংযুক্ত অ্যাপস এবং তুলনামূলক ভালোমানের স্মার্টফোন প্রয়োজন। দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর হাতে এখনও ফিচার ফোন রয়েছে, যা সার্বজনীন ক্যাশলেস বাস্তবায়নে বড় এক দেয়াল। ইন্টারনেট ভালো থাকলেও প্রযুক্তিগত নানা কারিগরি গোলযোগের কারণে বাংলা কিউআরের ওপর ব্যবহারকারীদের আস্থা নষ্ট হচ্ছে।
ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব অ্যাপস এবং জাতীয় পেমেন্ট সুইচ (NPSB)-এর অভ্যন্তরীণ কানেক্টিভিটিতে প্রায়ই সার্ভার ডাউন বা সিস্টেম ক্র্যাশ ঘটে। পেমেন্ট করার পর গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা কেটে গেলেও মার্চেন্টের অ্যাকাউন্টে টাকা জমা হতে দীর্ঘ সময় লাগে। প্রযুক্তিগত বিভ্রাটের কারণে পেন্ডিং পেমেন্ট বা ব্যর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে টাকা ফেরত পেতে (Reversal) গ্রাহকদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। অনেক সময় ৭ থেকে ১৫ কার্যদিবস পর্যন্ত ব্যাংকের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়। বিশেষ করে ক্ষুদ্র কেনাকাটার ক্ষেত্রে (যেমন: ৫০ বা ১০০ টাকার লেনদেন) গ্রাহক ও বিক্রেতা উভয়েই এই ধরনের প্রযুক্তিগত ঝুঁকি নিতে চান না। বাংলা কিউআরের মূল দর্শন ছিল—যেকোনো ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাপ দিয়ে একই কিউআর স্ক্যান করে পেমেন্ট করা যাবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, কিছু নির্দিষ্ট ব্যাংক বা এমএফএস প্রতিষ্ঠানের অ্যাপ দিয়ে সব বাংলা কিউআর সঠিকভাবে রিড করা যায় না বা রিড করলেও লেনদেন ফেইল্ড দেখায়। প্রযুক্তিগত সমন্বয়হীনতার কারণে সার্বজনীনতার উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়াও নতুন প্রযুক্তির প্রতি মানুষের সহজাত দ্বিধা কাটাতে কার্যকর প্রচার ও শিক্ষার অভাব স্পষ্ট। গ্রাহক ও মার্চেন্ট শিক্ষার অভাব: কীভাবে বাংলা কিউআর কাজ করে, এটি যে নিরাপদ এবং এর ব্যবহারবিধি কতটা সহজ—সে বিষয়ে ব্যাপক মাঠপর্যায়ের ক্যাম্পেইনের অভাব রয়েছে। অনেক দোকানদার তাদের কিউআর কিট পেলেও কীভাবে সেটি পরিচালনা করবেন বা টাকা কীভাবে ব্যাংকে জমা হচ্ছে, তা বুঝতে না পেরে কিউআর কোড ড্রয়ারে বন্ধ করে রাখেন। সাম্প্রতিক সময়ে ক্রমবর্ধমান অনলাইন জালিয়াতি, ফিশিং ও ওটিপি (OTP) প্রতারণার কারণে প্রবীণ ও সাধারণ গ্রাহকরা অ্যাপের মাধ্যমে পেমেন্ট করতে ভয় পান। নগদ টাকাই তাদের কাছে সবচেয়ে নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য মাধ্যম বলে মনে হয়।
বাস্তবায়নের জন্য সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি
এনবিআরের নীতিগত নমনীয়তা ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের জন্য বার্ষিক লেনদেনের নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ট্যাক্স-ফ্রি সুবিধা দেওয়া এবং মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট খোলার প্রক্রিয়া থেকে টিআইএন/এনবিআর অডিটের ভয় দূর করা। অবকাঠামোগত উন্নয়ন দেশের সর্বস্তরে নিরবচ্ছিন্ন ৪জি/৫জি নেটওয়ার্ক নিশ্চিত করা এবং ক্ষুদ্র মার্চেন্টদের জন্য বিশেষ কম খরচে ইন্টারনেট ডেটা প্যাক বা ফ্রি কানেক্টিভিটির ব্যবস্থা করা। প্রযুক্তিগত স্থিতিশীলতা এনপিএসবি ও ব্যাংক-এমএফএসগুলোর কোর ব্যাংকিং সিস্টেম (ঈইঝ) আধুনিকায়ন করা এবং ফেইল্ড ট্রানজেকশনের ক্ষেত্রে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ‘স্বয়ংক্রিয় টাকা ফেরত’ (Auto-Reversal) চালু করা। সার্বজনীন প্রচারণা মাঠপর্যায়ে ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে সরাসরি মার্চেন্ট একুইজিশন ড্রাইভ চালানো এবং অ্যাপস ব্যবহারে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতীয়ভাবে সচেতনতামূলক অভিযান পরিচালনা করা। বাংলা কিউআর কেবল একটি পেমেন্ট প্রযুক্তি নয়, এটি দেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়নের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম। তবে প্রযুক্তি আনাটাই শেষ কথা নয়, এর পেছনের বাস্তুতন্ত্রকে (Ecosystem) সহজ ও ঝুঁকিমুক্ত করা আবশ্যক। এনবিআরের কর ভীতির সংস্কৃতি পরিবর্তন, টেলিকম খাতের নেটওয়ার্ক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রযুক্তিগত বিভ্রাট দূর করতে না পারলে ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ’-এর স্বপ্ন ফাইল-কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। সমন্বিত পলিসি সাপোর্ট ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষই পারে বাংলা কিউআর-কে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তুলতে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের প্রায় ৪৩ শতাংশ মানুষ এখনো ইন্টারনেট সেবার বাইরে থাকায় এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তাদের মতে, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং প্রস্তুতি ছাড়া এটি বাধ্যতামূলক করা হলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পরিবর্তে ডিজিটাল বৈষম্য আরও বাড়তে পারে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করলেও স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর হার ৭৩ দশমিক ৪ শতাংশ। অন্যদিকে প্রায় ৪৩ শতাংশ মানুষ এখনো ইন্টারনেট সুবিধার বাইরে; বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চল, চর ও পাহাড়ি এলাকা, নিম্ন আয়ের পরিবার, বয়স্ক নাগরিক এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন ব্যবহারের হার তুলনামূলক কম।
একজন ব্যাংক কর্মকতা বলেছেন, ক্যাশলেস লেনদেনের উদ্যোগটি সময়োপযোগী। ভারত, নেপালসহ বিভিন্ন দেশ এ ক্ষেত্রে অনেক এগিয়েছে। তবে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো ইন্টারনেট সুবিধা ও ডিজিটাল লেনদেন সম্পর্কে সচেতনতার ঘাটতি রয়েছে। তাই সরকারকে অবকাঠামো উন্নয়ন ও জনসচেতনতায় আরও সক্রিয় হতে হবে। রাজধানীর মতিঝিল, পল্টন ও মগবাজার এলাকার বিভিন্ন দোকান ঘুরে দেখা গেছে, অনেক ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ী এখনো ‘বাংলা কিউআর’ সম্পর্কে জানেন না। বেশির ভাগই বিকাশ, নগদ বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কিউআর কোড ব্যবহার করছেন। অভিন্ন কিউআর ব্যবস্থার সুবিধা বা ব্যবহারবিধি সম্পর্কেও তাদের স্পষ্ট ধারণা নেই। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, নগদ লেনদেনে পুরো অর্থ হাতে পাওয়া গেলেও বাংলা কিউআর লেনদেনে নির্ধারিত হারে অর্থ কেটে নেওয়া হবে; পাশাপাশি স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার প্রয়োজনীয়তাও তাঁদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করবে। মতিঝিল এলাকার ফুটপাতের একজন ঝালমুড়ি বিক্রেতার মন্ত্য এভাবে-, ‘নগদ টাকায় লেনদেন করেই কাস্টমার সামলাতে পারি না। ফোনে প্রতিবার লেনদেন করতে গেলে বিক্রি কমে যাবে।’ রাজধানীর বাইরে অসংখ্য দোকান, হাটবাজার, ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এখনো নগদ লেনদেনের ওপর নির্ভরশীল। অনেকের ব্যাংক হিসাব নেই, আবার অনেকে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত নন। ব্যবসায়ীদের মতে, কিউআর ব্যবহারের জন্য স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা—সবই প্রয়োজন। এগুলো নিশ্চিত না করে বাধ্যতামূলক করলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাই সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়বেন।