সত্য সবসময় শ্রুতিমধুর হয় না বরং তা অধিকাংশ সময়ই অন্যের জন্য গাত্রদাহের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের একটি বক্তব্য আবারো নতুন করে প্রবাদ বাক্যের সত্যতা প্রমাণ করেছে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন, গত ৫ মাসে দেশে কিছুই বদলায়নি। আগে যেমন অফিসে একদল কর্মকর্তা ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে বিত্ত-বৈভব গড়ে তোলার কাজে ব্যস্ত ছিলেন, এখন অন্যরা স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন। ঘুষ-দুর্নীতি চলছে আগের মতোই। বিগত স্বৈরাচারী সরকারের ১৬ বছরের এক নায়কতান্ত্রিক শাসনামলে এদেশের মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে দলীয়করণ-আত্তীকরণ কাকে বলে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ব্যাপক মাত্রায় দলীয়করণের মাধ্যমে কার্যত অচল করে দেয়া হয়েছিল। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের ফসল বর্তমান সরকারের নিকট মানুষের প্রত্যাশা অনেকে বেশি। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো যোগ্য লোকদের দ্বারা পরিচালিত হবে এটাই সাধারণ মানুষ কামনা করে কিন্তু কার্যত হচ্ছে তার উল্টো। আগে আওয়ামী লীগ সমর্থিত বঙ্গবন্ধু পরিষদ প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে প্যারালাল প্রশাসন গড়ে তুলেছিল। সৎ এবং যোগ্য কর্মকর্তা যারা তাদের স্বার্থ উদ্ধারের প্রতিবন্ধক হিসেবে বিবেচিত হতো তাদের জামায়াত-বিএনপি ট্যাগ দিয়ে কোনঠাসা করে রাখা হতো। অনেকে হতাশ হয়ে চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। আওয়ামী লীগ নামক স্বেচ্ছাচারী রাজনৈতিক দলটি রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হবার পর বিএনপি ক্ষমতায় আসে। বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণ করার আগে থেকেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জিয়া পরিষদের অভ্যুদয় ঘটে। তারা নতুন কমিটি গঠন করে রাজনীতি চর্চা শুরু করেছে। চাকরি থেকে অবসরে গেছেন এমন ব্যক্তিও কোন কোন প্রতিষ্ঠানে জিয়া পরিষদের নেতা হয়ে বসেছেন। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের প্রধান লক্ষ্য ছিল সমাজ থেকে সব ধরনের বৈষম্য দূর করে দেশকে সত্যিকার গণতান্ত্রিক ও কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করা। কিন্তু পরিস্থিতি যা প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে তাতে শুধু উদ্বেগ বাড়ছে।

জামায়াত আমীর ও জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছে, দেশ সেই পুরোনো অন্ধকার পথেই ফিরে যাচ্ছে। তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য ছিল ফ্যাসিবাদমুক্ত, বৈষম্যহীন ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন করা। সে আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের পরিবর্তে চলছে ব্যাপক মাত্রায় দলীয়করণ। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়োগ পাবার প্রধান যোগ্যতা হচ্ছে বিএনপি দলীয় সমর্থক হওয়া। উল্লেখ্য, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে যারা চাকরি করেন তারা প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারী। তারা কোন বিশেষ রাজনৈতিক দলের সমর্থক বা কর্মী হতে পারেন না। অনুসৃত চাকরিবিধি মোতাবেক একজন প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা বা কর্মচারী কোন রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করতে পারেন না। কিন্তু বিগত সরকার আমলে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি কিভাবে বঙ্গবন্ধু পরিষদের নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্যারালাল প্রশাসন চালানো হয়েছে। বর্তমানে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে বিগত সরকারের ক্ষমাহীন দলীয়করণ। যারা বিগত সরকারের আমলে দলীয় বিবেচনায় বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন তারা শুধু সময়ের অপেক্ষায় আছেন। কিভাবে বর্তমান সরকারের ইমেজ নষ্ট করা যায় তারা সেই চেষ্টা করছে। সৎ এবং দায়িত্বশীল আমলাতন্ত্রের সমর্থন এবং সহযোগিতা না পেলে কোন সরকারের পক্ষেই জনপ্রিয়তা নিয়ে টিকে থাকা সম্ভব নয়। কথায় বলে, রাজনীতিবিদগণ নীতি ও পরিকল্পনা তৈরি করেন, আর আমলারা তা বাস্তবায়ন করেন। এ দু’পক্ষের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে প্রশাসন গতিশীল হবে না।

বিগত দিনে যারা বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থেকে জিয়া পরিষদ অথবা বঙ্গবন্ধু পরিষদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন তাদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা যেতে পারে। যারা এখনো চাকরিতে বহাল আছেন তাদের চাকরিচ্যুত করা যেতে পারে। আর যারা চাকরি থেকে অবসরে গিয়েছেন তাদের রিটায়ার্ড বেনিফিট আটকে দেয়া যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, কোন রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এসব দলকানাদের কারণে ক্ষমতায় আসে না। বরং এদের কারণে সরকার নানাভাবে বিতর্কিত ও সমালোচিত হয়ে থাকেন। এদের কারণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। এদের কোনভাবেই ছাড় দেয়া যাবে না।