মুন্সী আবু আহনাফ
একবিংশ শতাব্দীর ভূরাজনীতিতে কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব কেবল মানচিত্রের সীমারেখায় কিংবা জাতিসংঘের সদস্যপদে সীমাবদ্ধ থাকে না। সার্বভৌমত্বের প্রকৃত পরীক্ষা হয় দেশের অভ্যন্তরে জনগণের ইচ্ছার অবাধ প্রতিফলন এবং বাইরে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি প্রয়োগের সক্ষমতায়। বাংলাদেশ কি অতীতে এমন এক রাজনৈতিক চক্রে আটকা পড়েছিল, যেখানে অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার বৈধতা অর্জনে বিদেশী প্রভাবের মুখাপেক্ষী হতে হয়েছে? এবং বাংলাদেশ কি ভবিষ্যতে আর কোনো রাজনৈতিক শক্তির অভ্যন্তরীণ আধিপত্য বা কোনো আঞ্চলিক পরাশক্তির প্রভাববলয়ে ফিরে যাবে, নাকি নিজের জাতীয় স্বার্থ, জনগণের ভোটাধিকার ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার ভিত্তিতে এক নতুন পথ তৈরি করবে? আজকের বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এটাই। ইতিহাস সাক্ষী, কোনো দেশ যখন নিজের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থাকে স্রেফ একটি নির্দিষ্ট বিদেশী শক্তির ভূরাজনৈতিক পছন্দের ওপর সমর্পণ করে, তখন তা কেবল অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রকেই ধ্বংস করে না, বরং জাতীয় সার্বভৌমত্বকেও দুর্বল করে। বাংলাদেশ কারও শত্রু নয়, তবে বাংলাদেশ আর কোনো দেশের ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’ বা আনুগত রাষ্ট্র হয়ে থাকার জন্য গঠিত হয়নি এই কথা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান তাদের বক্তব্যে একাধিবার বলেছেন। ক্লায়েন্ট স্টেট (Client State) বা নির্ভরশীল রাষ্ট্র হলো রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। ক্লায়েন্ট স্টেট-এর সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য এবং এর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস; এছাড়াও বাংলাদেশ কিভাবে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের শাসনকালে ভারতীয় আদিপত্যবাদের Client
State-এ পরিণত হয়েছিল এই মতামত কলামে সেটাই আলোচ্য বিষয়।
এক. রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, ক্লায়েন্ট স্টেট হলো এমন একটি রাষ্ট্র যা অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা সামরিক দিক থেকে অন্য একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের (যাকে বলা হয় ‘প্যাট্রন’ বা Patron State) ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল এবং সেই শক্তিশালী রাষ্ট্রের কৌশলগত ও রাজনৈতিক নির্দেশাবলি মেনে চলতে বাধ্য হয়। সহজ কথায়, বাহ্যিকভাবে বা কাগজে-কলমে রাষ্ট্রটি সার্বভৌম ও স্বাধীন মনে হলেও, বাস্তবে দেশটির অভ্যন্তরীণ বা পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো কোনো শক্তিশালী পরাশক্তি বা বড় প্রতিবেশী রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, একটি ক্লায়েন্ট স্টেটের মধ্যে প্রধানত নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলো দেখা যায়। তা হলো: ১. রাষ্ট্রটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বা পররাষ্ট্রনীতিতে নিজের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। সাধারণত Patron বা নিয়ন্ত্রণকারী রাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক অবস্থানের বাইরে গিয়ে কাজ করার ক্ষমতা এদের থাকে না। ২. ক্লায়েন্ট রাষ্ট্রগুলো নিজেদের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নিরাপত্তার জন্য Patron রাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা, অস্ত্র সরবরাহ, সামরিক ঘাঁটি বা সরাসরি নিরাপত্তার ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল থাকে। ৩. Patron রাষ্ট্র থেকে নিয়মিত অর্থনৈতিক সাহায্য, ঋণ বা বাণিজ্য সুবিধা পাওয়ার ওপর ক্লায়েন্ট রাষ্ট্র টিকে থাকে। অনেক সময় অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণই রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে। ৪. ক্লায়েন্ট রাষ্ট্রের শাসক বা সরকার অনেক সময় নিজ দেশের জনগণের জনসমর্থন বা ভোটের চেয়ে Patron রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সমর্থনের ওপর ভিত্তি করে ক্ষমতায় টিকে থাকে। ৫. জাতিসংঘ বা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে ক্লায়েন্ট রাষ্ট্রটি সাধারণত Patron রাষ্ট্রের পক্ষে ভোট দেয় বা তাদের সুরেই সুর মিলায়। ৬. দেশটির মানচিত্র, নিজস্ব পতাকা এবং সরকার থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নীতি নির্ধারণে জাতীয় স্বার্থের চেয়ে Patron রাষ্ট্রের স্বার্থ প্রাধান্য পায়।
প্রাচীনকাল থেকেই শক্তিশালী সাম্রাজ্যগুলোর অধীনে ছোট ছোট অঞ্চলের ‘ভ্যাসাল স্টেট’ (Vassal
State) বা অনুগত রাজ্য থাকার প্রচলন ছিল। তবে আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’ ধারণার প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা ও বিকাশ ঘটে মূলত স্নায়ুযুদ্ধ (Cold War) চলাকালে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বিশ্ব যখন মূলত দুটি মেরুতে (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন) বিভক্ত হয়ে পড়ে, তখন থেকে ক্লায়েন্ট স্টেট ধারণার ব্যাপক প্রচলন ঘটে। তৎকালীন পূর্ব ইউরোপের বহু দেশ (যেমন: পোল্যান্ড, পূর্ব জার্মানি, হাঙ্গেরি, রোমানিয়া ইত্যাদি) এবং পরবর্তীতে কিউবা ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্লায়েন্ট স্টেট। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও তার প্রভাব বিস্তারের জন্য এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক রাষ্ট্রকে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তার মাধ্যমে ক্লায়েন্ট রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল ( যেমন: দক্ষিণ ভিয়েতনাম, প্রাক-বিপ্লব ইরান, এবং লাতিন আমেরিকার বেশ কিছু স্বৈরশাসনাধীন রাষ্ট্র)। প্রক্সি ওয়ার (Proxy War) বা ছায়াযুদ্ধের যুগ অথবা স্নায়ুযুদ্ধের সময় দুই পরাশক্তি সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়ে নিজেদের ক্লায়েন্ট রাষ্ট্রগুলোকে ব্যবহার করে বিশ্বজুড়ে ছায়াযুদ্ধে লিপ্ত হতো। এর ফলে ক্লায়েন্ট স্টেট ধারণাটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী রূপ নেয়। স্নায়ুযুদ্ধোত্তর (১৯৯০ থেকে বর্তমান) ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর একমেরু বিশ্বে মার্কিন আধিপত্যের যুগে বহু দেশ আমেরিকান নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তবে একবিংশ শতাব্দীতে চীন ও রাশিয়ার পুনরুত্থানের ফলে পুনরায় বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থা (Multipoles) গড়ে উঠছে, যেখানে আঞ্চলিক বা বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলো নিজেদের প্রভাববলয়ে ছোট ছোট রাষ্ট্রগুলোকে অনুগত রাখতে নতুন কৌশলে (অর্থনৈতিক ঋণ, ট্র্যাপ ডিপ্লোমেসি, অবকাঠামো উন্নয়ন ইত্যাদি) ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’ তৈরির চেষ্টা করে থাকে।
দুই. বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস : যখন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বৈধতা বা নির্বাচনের সঠিক প্রক্রিয়াকে বাইপাস করে ক্ষমতায় টিকে থাকার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গত দেড় দশকে বাংলাদেশে নির্বাচনের যে মডেলগুলো প্রত্যক্ষ করা গেছে; যেমন ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচন, ২০১৮ সালের নৈশকালীন ভোট কিংবা ২০২৪ সালের প্রার্থী-মনোনয়নকেন্দ্রিক প্রক্রিয়া; তা নিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি দেশী-বিদেশী নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা ও জাতিসংঘের মানবধিকার ফোরামগুলোতেও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর এই দুর্বলতা কেবল রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তা বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনিক কাঠামোর ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল।
তিন. ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লেগের শাসনকালে যেভাবে বাংলাদেশ ভারতের ক্লায়েন্ট স্টেট (Client State) পরিণত হয়েছিল? ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের আগস্টে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে পতন ঘটার আগ পর্যন্ত; ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের দীর্ঘ শাসনকালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক কীভাবে পরিচালিত হয়েছিল, তা নিয়ে ভূরাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও গবেষকের মতে, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বৈধতার ঘাটতি এবং ক্ষমতায় টিকে থাকার ব্যাকুলতার সুযোগ নিয়ে ভারতকে অতিরিক্ত একপাক্ষিক সুবিধা প্রদান করা হয়েছিল, যার ফলে বাংলাদেশ কার্যত একটি ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’ (Client State) বা অতি-নির্ভরশীল রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার চিত্র ফুটে ওঠে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়; যখন কোনো দেশের সরকার তার অভ্যন্তরীণ জনগণের সম্মতির চেয়ে কোনো বিদেশী শক্তির ভূরাজনৈতিক পছন্দের ওপর টিকে থাকে এবং পররাষ্ট্র, নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে নিজের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সংকুচিত করে ফেলে, তখনই ক্লায়েন্ট স্টেটের লক্ষণসমূহ স্পষ্ট হয়। আওয়ামী লীগ আমলে যেভাবে এই নির্ভরশীলতা ও ক্লায়েন্ট স্টেটের বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়েছিল, তার প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো: ১. ক্লায়েন্ট রাষ্ট্রের প্রধান লক্ষণ হলো; শাসকশ্রেণি দেশের জনগণের ভোটাধিকারের চেয়ে ‘প্যাট্রন’ বা অভিভাবক রাষ্ট্রের সমর্থনের ওপর বেশি ভরসা করে। যেটা আ’লীগ সরকার করেছে। ২. নির্বাচনী বৈধতা সংকট তৈরি হওয়া; ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচন, ২০১৮ সালের বিতর্কিত নৈশকালীন ভোট এবং ২০২৪ সালের ডামি প্রাথীভিত্তিক নির্বাচন নিয়ে পশ্চিমা বিশ্ব ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো যখন প্রশ্ন তোলে, তখন ভারত প্রকাশ্যে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারকে সমর্থন দেয়। ৩. বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের একদলীয় শাসন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের সমালোচনা ঢাকা দিতে তৎকালীন ভারত সরকার কূটনৈতিক ঢাল হিসেবে কাজ করেছে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের নিবন্ধে উঠে এসেছে। ফলে আওয়ামী লীগ সরকার অনুধাবন করেছিল; জনগণের ভোটের প্রয়োজন নেই, যদি দিল্লীর কূটনৈতিক সমর্থন নিশ্চিত থাকে। ৪. আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নীতি হলো ‘পারস্পরিক সমতা’ (Reciprocity)। কিন্তু এ সময়ে বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও কৌশলগত সুবিধা ভারতকে যেভাবে প্রদান করা হয়েছে, তার বিনিময়ে বাংলাদেশের পাওনা আদায় করা হয়নি। ৫. বিনা-শুল্কে/নগণ্য শুল্কে ট্রানজিট ও কন্টিনিউয়াস রোড-রেইল লিঙ্ক ভারতকে দেওয়া। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে পণ্য ও যাত্রী পরিবহনের জন্য বাংলাদেশের বুক চিড়ে সড়ক, রেলপথ এবং সমুদ্রবন্দর (চট্টগ্রাম ও মোংলা) ব্যবহারের স্থায়ী সুযোগ দেওয়া হয়। ৬. ভারত তার নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে বাংলাদেশকে একটি কৌশলগত করিডোর হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ পায়, যা ভারতের অভ্যন্তরীণ সংযোগ ব্যয় বহুগুণ কমিয়ে আনে। অথচ এর বিনিময়ে বাংলাদেশ আঞ্চলিক বাণিজ্য ও ট্রানজিট থেকে আশানুরূপ রাজস্ব আদায় করতে পারেনি। ৭. কোনো রাষ্ট্র যখন নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বা অপর রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে নিজের ভূখণ্ডকে পুরোপুরি অন্য রাষ্ট্রের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়, তখন জাতীয় নিরাপত্তায় নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ ক্ষুণ্ন হয়। ৮. ভারত তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী দলগুলোকে (যেমন ULFA) দমনে তৎকালীন সরকারের কাছ থেকে শতভাগ নিরাপত্তা সহযোগিতা পায়। ৯. ভারত নিজের নিরাপত্তার শতভাগ নিশ্চয়তা পেলেও, বাংলাদেশের সীমানায় বিএসএফ (BSF) কর্তৃক প্রতিনিয়ত সাধারণ বাংলাদেশী নাগরিকদের ওপর গুলী ও হত্যা বন্ধের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ বা দ্বিপাক্ষিক গ্যারান্টি দিতে পারেনি। ১০. একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী নিজের ন্যায্য পাওনা আদায়ে সোচ্চার থাকে। কিন্তু ওই সময়কালে জাতীয় সংবেদনশীল ইস্যুতে সরকারের ভূমিকা ছিল নমনীয়। তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখা হলেও তৎকালীন সরকার ভারতের ওপর কোনো কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারেনি। উল্টো অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ভারতের অসমাপ্ত অনুরোধগুলো আগেই বাস্তবায়ন করা হয়েছে (যেমন ফেণী নদীর পানি প্রদান)। ১১. বিশ্বে দুটি বন্ধুপ্রতিম দেশের সীমান্তে এত বিপুল সংখ্যক নিরস্ত্র নাগরিক হত্যার আর কোনো নজির নেই। কিন্তু প্রতিটি সীমান্ত হত্যার পরও তৎকালীন সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল নীরব বা দুর্বল প্রতিবাদমূলক। ১২. অর্থনৈতিক ও জ্বালানি খাতের অসম চুক্তি। রামপাল ও আদানি বিদ্যুৎ চুক্তি; সুন্দরবনের পরিবেশগত ঝুঁকি সত্ত্বেও ভারতীয় কোম্পানির সাথে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ এবং ভারতীয় আদানি গ্রুপের সাথে একটি চরম একপাক্ষিক ও ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়। যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বিদ্যুৎ খাতের ওপর বিপুল আর্থিক বোঝা তৈরি করে। ১৩. ভারতীয় পণ্যের অবাধ প্রবেশাধিকার থাকলেও নন-ট্যারিফ বাধা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার কখনোই আশানুরূপ বিস্তৃত হতে দেওয়া হয়নি। ১৪. ভারতের একমুখী প্রভাব ও ‘বাফার জোন’ হিসেবে ব্যবহার করেছে। ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতের কৌশল ছিল বাংলাদেশকে একটি অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত ‘বাফার জোন’ এবং ভারতের প্রভাব বলয়ের ভেতরে আবদ্ধ রাখা, যাতে সেখানে চীন বা অন্য কোনো বৈশ্বিক শক্তির একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা না হতে পারে। এই উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে মূলত একটি নির্দিষ্ট প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কৌশলের সাথে সামঞ্জস্য রেখে পরিচালনা করা হতে থাকে, যা বাংলাদেশের সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তিকে দুর্বল করেছিল।
চার. ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে সংগঠিত গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীদের এই প্রতিবাদ যখন একটি সর্বজনীন গণআন্দোলনে রূপ নেয়, তখন রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়ায় যে নজিরবিহীন সংঘাত ও ২ সহস্রাধিক প্রাণহানি ঘটে, তা কেবল দেশীয় সমাজকেই নাড়া দেয়নি, বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও গভীরভাবে স্তম্ভিত করেছে।
পাঁচ. ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক সহযোগিতা নাকি আধিপত্য, বাস্তবতা ও অমীমাংসিত প্রশ্ন রয়েছে অনেক? প্রথমত, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও সীমান্তে বাংলাদেশী নাগরিকদের প্রাণহানি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল আন্তর্জাতিক ও মানবীয় প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক আইন এবং দ্বিপাক্ষিক সীমান্ত চুক্তির মূল কথাই ছিল অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যু শূন্যে নামিয়ে আনা এবং অমারাত্মক অস্ত্র ব্যবহার নিশ্চিত করা। কিন্তু সীমান্তে সাধারণ নাগরিকদের প্রাণহানির ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে সুসংগঠিত বন্ধুত্বের ধারণার ওপর ছায়া ফেলেছে।
দ্বিতীয়ত, তিস্তাসহ অভিন্ন ৫৪টি নদীর পানি বণ্টন সমস্যা। তিস্তা নদীর চুক্তি নিয়ে বছরের পর বছর আলোচনা চললেও বাস্তব কোনো সমাধান আসেনি। আন্তর্জাতিক নদী আইনের মূল নীতি হলো উজান ও ভাটির দেশের মধ্যে সুষম এবং ন্যায্য পানি বণ্টন। পানি কোনো রাজনৈতিক দয়াদাক্ষিণ্যের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা, পরিবেশ ও কৃষির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
তৃতীয়ত, বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা এবং অবকাঠামোগত ট্রানজিট ইস্যু। সীমান্তে নন-ট্যারিফ বাধা এবং ভারতের বাণিজ্য নীতির কঠোরতার কারণে এখনো বাণিজ্য ঘাটতি অত্যন্ত প্রকট। সম্পর্কের ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হলে এই ক্ষেত্রগুলোতে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া প্রয়োজন।
ছয়. বাংলাদেশের জন্য আজকের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো; ‘ভারতবিরোধিতা’ কিংবা ‘ভারতনির্ভরতা’ কোনোটিই টেকসই কোনো পথ নয়। অন্ধ ভারতবিরোধিতা যেমন সস্তা রাজনৈতিক পপুলিজম তৈরি করে, তেমনি অতিরিক্ত ভারতনির্ভরতা দেশের কৌশলগত স্বাধীনতাকে খর্ব করে। বাংলাদেশের যা প্রয়োজন, তা হলো একটি সম্পূর্ণ ‘বাংলাদেশকেন্দ্রিক’ পররাষ্ট্রনীতি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হওয়া উচিত “সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়; কিন্তু জাতীয় স্বার্থে আপসহীন”। ভারতকে আমাদের ভৌগোলিক বাস্তবতা মেনেই গঠনমূলক ও সমমর্যাদার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের জন্য বৈশ্বিক অঙ্গনে পরিধি বাড়াতে হবে।
পরিশেষে : বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দেশের তরুণ সমাজ ও সাধারণ মানুষ রক্ত দিয়ে প্রমাণ করেছে যে, তারা আর কোনো ধরনের অভ্যন্তরীণ শাসনতান্ত্রিক শোষণে কিংবা বিদেশী প্রভাববলয়ে বাস করতে চায় না। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোনো বিদেশী রাষ্ট্রের পছন্দের সরকার তৈরি হওয়া উচিত নয়; বরং এ দেশের জনগণের অবাধ ও নিরপেক্ষ ভোটে নির্বাচিত, সংবিধানিক ও জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত মালিক কেবল এবং কেবলই বাংলাদেশের জনগণ।
আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে ভারতের সাথে সম্পর্কের যে ধরণ তৈরি হয়েছিল, তা সমমর্যাদা বা ‘উইন-উইন’ (Win-Win) ডিপ্লোমেসির বদলে একপাক্ষিক তোষণনীতিতে রূপ নেয়। জনগণের জনাদেশ ছাড়া ক্ষমতায় টিকে থাকার যে কৌশল আওয়ামী লীগ গ্রহণ করেছিল, তার চূড়ান্ত মাশুল হিসেবে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব সংকুচিত হয়ে বাংলাদেশকে ভারতের একটি ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’-এর মতো আচরণ করতে বাধ্য করা হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণ এটি পরিষ্কার করে দিয়েছে যে-বাংলাদেশ আর কোনো বাইরের দেশের প্রভাববলয় বা ক্লায়েন্ট স্টেট হয়ে থাকবে না; বরং জনগণের ইচ্ছা, মানবাধিকার ও জাতীয় স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতিতে পরিচালিত হবে।