আসিফ আরসালান

গুরুতর সঙ্কট সন্ধিক্ষণে পৌঁছেছে বাংলাদেশের ভারতনীতি। আরো বলা যায়, বাংলাদেশের ভারত নীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে এসে দাঁড়িয়েছে। বাঁক বা মোড় নিয়েছে কিনা সেটি এ মুহূর্তে সঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না। চিত্রটি পরিষ্কার হতে কিছু সময় লাগবে। এ সময় এক মাস দুই মাসও হতে পারে, আবার তিন মাসও হতে পারে। তবে ডিসেম্বরের পূর্বে জনগণ এবং সরকার এ ধোঁয়াশাচ্ছন্ন অবস্থা থেকে বের হতে পারবেন বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন।

সঙ্কটটির সৃষ্টি হয়েছে গত ৫ অগাস্ট দিল্লির ফরেন করেসপনডেন্টস ক্লাবে শেখ হাসিনার প্রেস কনফারেন্সকে কেন্দ্র করে। এ প্রেস কনফারেন্সের বেশ কয়েক দিন আগেই বাংলাদেশের তরফ থেকে ভারতকে অনুরোধ করা হয়েছিলো, তারা যেনো শেখ হাসিনাকে এ প্রেস কনফারেন্স করা থেকে বিরত রাখেন। কিন্তু ভারত সরকার এ বলে বিষয়টি এড়িয়ে যায় যে, শেখ হাসিনার প্রেস কনফারেন্সটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে বেসরকারি উদ্যোগে। এখানে ভারত সরকারের হস্তক্ষেপ করার কোনো সুযোগ নাই। বাংলাদেশ সরকার ভারত সরকারের এই জবাবকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পারে নি। তার পর থেকেই সৃষ্টি হয়েছে সঙ্কট। আর সে সঙ্কটের আশু ভিক্টিম হলো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দিল্লি সফর। তারেক রহমানের দিল্লি সফর ঝুলে গেলো। তিনি কবে যাবেন সেই বিষয়টি কারো কাছেই পরিষ্কার নয়। এমনকি ভারত সরকার এবং বাংলাদেশ সরকারও সঠিকভাবে বলতে পারবেন না যে, এই সফরটি কবে অনুষ্ঠিত হবে। তবে ভারত সরকার বাংলাদেশের দাবির ব্যাপারে যে অবস্থান নিয়েছে তার ফলে সঙ্কটের কেন্দ্রবিন্দু আরো জটিল এবং ঘনীভূত হলো। বাংলাদেশ সেই শুরু থেকেই, অর্থাৎ ইন্টারিম সরকার ড. ইউনূসের সময় থেকেই বলে আসছিলো যে, যেহেতু বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে ২০১৩ সালে স্বাক্ষরিত প্রত্যর্পণ চুক্তি বা এক্সট্রাডিশন চুক্তি রয়েছে তাই ঐ চুক্তির অধীনে ভারত সরকার শেখ হাসিনা ও তার দলবলকে এবং শহীদ ওসমান হাদির ঘাতকদের ফেরত পাঠাক। এখন এখানে সোজা পথে না গিয়ে ভারত যে জিলাপির প্যাঁচ কষেছে সেখান থেকে ভারত নিজেই এত সহজে বের হতে পারবে বলে মনে হয় না।

ওসমান হাদির ব্যাপারে ভারত সরকার সরাসরি তার অবস্থান বলে নি। শুধু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রনধীর জয়সওয়াল একই কথা বার বার বলে আসছেন যে, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পরবর্তীতে তিনি বলেন যে, ওসমান হাদির ঘাতকদের ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে আইনি বিষয় জড়িত। সুতরাং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই বিষয়টির ফয়সালা হবে। সাধারণ পাঠকের কাছে এ আইনি প্রক্রিয়া নামক বিষয়টি অস্পষ্ট মনে হতে পারে। তাই বিষয়টি পরিষ্কার করা দরকার।

ওসমান হাদির ঘাতক এবং তার সহযোগী যথাক্রমে ফয়সাল করিম মাসুদ ও আলমগীর শেখ বাংলাদেশের হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে ভারতের মেঘালয়ে প্রবেশ করে। অতঃপর তারা মেঘালয় থেকে কলকাতা যায়। এখন ভারত সরকার বলছে যে, বাংলাদেশ সরকারের নোট পাওয়ার পর তাদেরকে কলকাতায় গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার করার পর তাদের বিরুদ্ধে ভারতীয় আইনে মামলা করা হয়েছে। কিসের মামলা? মামলাটি হলো, ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশের মামলা। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ওসমান হাদিকে হত্যা করার পর সে দিনই ঘাতক ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগী আলমগীর শেখ যে মোটর বাইক থেকে হাদিকে গুলি করেছিলো সেই বাইক নিয়েই তারা গাজীপুরের কালিয়াকৈর পর্যন্ত যায়। সেখানে তারা দুপুরের আহার গ্রহণ করে এবং পরিধেয় বস্ত্র এবং মোটর বাইক বদল করে নতুন কাপড় এবং অন্য মোটর বাইক নিয়ে হালুয়াঘাট যায়। সেখানে আগে থেকেই কন্টাক্ট করা দালাল ফিলিপ স্নাল ও তার সহযোগী সিবিয়ন দিউ এবং সঞ্জয় চিসিম তাদেরকে ভারত পার করে দেয়। পরবর্তীতে ফিলিপ স্নাল ভারতে গেলে তাকেও গ্রেফতার করা হয়। এ ৩ জনের বিরুদ্ধেই অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগ আনা হয়েছে।

অবৈধ অনুপ্রবেশের এ মামলা শেষ হতে কত দিন বা কত বছর লাগবে তা কেউ বলতে পারে না। তবে বাংলাদেশের এ ব্যাপারে রয়েছে তিক্ত অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশের বতর্মান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির নেতা সালাহ উদ্দিন আহমেদকেও এক প্রত্যুষে মেঘালয়ের রাজধানী শিলংয়ের রাস্তায় উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। অতঃপর পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে । পুলিশের কাছে সালাহ উদ্দিন তার নিজের পরিচয় দেন এবং বলেন যে, এর আগে তিনি বেগম জিয়ার ক্যাবিনেটে প্রতিমন্ত্রী ছিলেন।

যাহোক, সালাহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগ আনা হয়। সে অভিযোগটির চূড়ান্ত ফয়সালা হতে ৬ বছর লাগে। ৬ বছরের আরো ২ বছর পর, অর্থাৎ ৮ বছর পর বাংলাদেশে জুলাই বিপ্লবের পর সালাহ উদ্দিন দেশে ফেরেন। এখন হাদির হত্যাকারী ফয়সাল ও মাসুদের মামলার ফয়সালা ৬ বছর না হোক, যদি ২ বছরও হয় তাহলে তারেক রহমানের ভারত সফর কি এই ২ বছর ঝুলে থাকবে? এ বিষয়ে কেউ কিছু বলতে পারেন না। দ্বিতীয়ত এবং প্রধান বিষয়টি হলো শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন। এ বিষয়টিকে ভারত ইচ্ছাকৃতভাবে জটিল থেকে জটিলতর করে তুলেছে। তারা বলছে যে, শেখ হাসিনা তো ভারতে বন্দী নন। ভারত তো তাকে দিল্লিতে নিয়ে আসেনি। বিষয়টি প্রত্যর্পণ আইনসহ অন্যান্য আইনের আলোকে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এটি হলো সরকারি ভার্সন। কিন্তু চানক্য বুদ্ধির ভারত এখানে কানাকে হাইকোর্ট দেখাচ্ছে।

তারা বিজেপি অনুগত গণমাধ্যমে খবর ফাঁস করে দিচ্ছে যে, বাংলাদেশে আইসিটি অর্থাৎ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে যে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে সে সম্পর্কিত কাগজপত্র ভারত সরকারের নিকট পাঠাতে হবে। প্রয়োজন হলে এই মামলাটি ভারতীয় আদালতে ওঠবে। আদালত এব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে। ভারতের এ অবস্থানের মধ্যে রয়েছে অনেক মারপ্যাঁচ। শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে বাংলাদেশের আদালত। ভারতীয় আদালত তার কি রিভিউ করবে? শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে ভারতের প্রায় সমস্ত নাম করা গণমাধ্যম এবং অনেক গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব প্রায় প্রতিদিন ইউটিউবে এ সম্পর্কে অনর্গল কথা বলে যাচ্ছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন দিল্লি প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি গৌতম লাহিড়ী, নর্থ ইস্ট নিউজের চন্দন-নন্দী, বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন দত্ত প্রমুখ। এদের সুরে সুর মিলিয়ে বাংলাদেশেও কথা বলছেন এ্যাডভোকেট মহসিন রশিদ, বিবিসি বাংলার সাবেক প্রধান মরহুম সাংবাদিক কে.জি মোস্তফার ছেলে সাব্বির মোস্তফা, লন্ডনের আওয়ামী লীগ কর্মী ও ইউটিউবার মাসুদা ভাট্টি প্রমুখ। ওদের কথা, বলাবাহুল্য, সবই ভারত সরকারেরই কথা। ভারত সরকার এখানে সে পুরানা খেলা খেলছে। তারা যা করতে চায় সেটি পত্রিকায় ফাঁস করে দেয়। তারপর দেখে জনগণের প্রতিক্রিয়া। অনেক ক্ষেত্রে জনগণের প্রতিক্রিয়াও দেখা হয় না। বরং একাধিক গণমাধ্যমে অনেকটা সিন্ডিকেটেড নিউজের মতো সংবাদ প্রচার করে জনমত গঠন করা হয়। অতঃপর সেই জনমত অনুযায়ী সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

শেখ হাসিনার ব্যাপারে ভারত সরকারের স্ট্র্যাটেজি এবং বক্তব্য নিম্নরূপ :

(১) শেখ হাসিনা নিজ থেকে ভারতে আসেন নি। অথবা ভারত সরকারও তাকে বাংলাদেশ থেকে নিয়ে আসে নি। বাংলাদেশের সেনা বাহিনী ভারতীয় সেনাবাহিনীকে অনুরোধ করে, তারা (বাংলাদেশ সেনাবাহিনী) শেখ হাসিনার নিরাপত্তা দিতে পারছে না। তাই তারা হাসিনাকে ভারতে পাঠাতে চায়। ভারত সে প্রস্তাব গ্রহণ করে। বাংলাদেশ অতঃপর নিজ দেশের একটি সামরিক বিমানে করে শেখ হাসিনাকে ভারতে পাঠায়। ভারত তাকে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে রেখেছে।

(২) ভারতীয়দের মতে, এখন তো প্রত্যর্পণের প্রশ্ন আসে না। কারণ শেখ হাসিনা তো নিজ থেকেই দেশে ফিরতে চাচ্ছেন। একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে কিভাবে বাংলাদেশ গ্রহণ করবে সেটি নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

(৩) এক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠতে পারে যে তিনি তো একজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি। তিনি বাংলাদেশে এলে আইন তার নিজস্ব পথ অনুসরণ করবে। অর্থাৎ বাংলাদেশে এলে তাকে গ্রেফতার করা হবে। এ মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে আইনে যদি আপিল করার সুযোগ থাকে তাহলে তিনি ঊর্ধ্বতন আদালতে আপীল করবেন। আপীলের সুযোগ থাকলে প্রথমে তিনি বাংলাদেশের হাইকোর্টে আপীল করবেন। সেখানে তার ভাষায় ন্যায়বিচার না পেলে সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগে আপীল করবেন। সুপ্রীম কোর্ট যে রায় দেয় সেটিই চূড়ান্ত হবে।

(৪) এটি হলো বাংলাদেশের অবস্থান। কিন্তু ভারত বলছে যে, শেখ হাসিনা যে বাংলাদেশে যাবেন তার পর তার নিরাপত্তার গ্যারান্টি কি? কোনো ব্যক্তিকে দেশে নিয়ে গিয়ে ফাঁসি দেওয়া হবে, সে জন্য ভারত কোনো ব্যক্তিকে ফেরত পাঠাতে পারেন না। অন্য কথায় ভারত চায় যে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের পর তার নিরাপত্তার গ্যারান্টি বাংলাদেশ সরকার ভারতকে দিক।

এগুলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। তাই বাংলাদেশ এসব বিষয় নিয়ে ভারত সরকারের সাথে কথা বলবে না। সেক্ষেত্রে ভারতের কথা হলো, যেহেতু হাসিনা ভারতের অতিথি তাই তার মৃত্যুদণ্ড রিভিউ করবে ভারতের আদালত। তারা দেখবে যে মৃত্যুদণ্ড যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অবলম্বন করে দেওয়া হয়েছে কিনা। যদি ভারতের দৃষ্টিতে যথাযথ প্রক্রিয়া অবলম্বন করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া না হয়ে থাকে তাহলে ভারত ঐ মৃত্যুদণ্ড মানবে না।

বাংলাদেশ তার একজন নাগরিককে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। সে দণ্ড সঠিক না বেঠিক সেটি বিচার করার অথরিটি ভারতকে কে দিলো? এখানে ভারত ‘গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়লের’, ভূমিকা নিচ্ছে। বাংলাদেশ এখন হাসিনার জামানায় নেই। তারা ভারতের তাঁবেদার নয়। সুতরাং শেখ হাসিনার ব্যাপারে ভারতের এই মোড়লীপনা বাংলাদেশ কোনো অবস্থাতেই গ্রহণ করতে পারে না।

এখানেই আটকে আছে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন প্রসঙ্গ। আর এখানেই আটকে আছে ওসমান হাদির হত্যাকারীদের ফেরত দেওয়া প্রসঙ্গ। আগেই বলেছি যে, শেখ হাসিনা এবং ওসমান হাদির ব্যাপারে ভারত তাদের হাজার বছর আগের গুরু চাণক্য বা কৌটিল্যের যে প্যাঁচ কষেছে সেই প্যাঁচে আটকে গেছে তারেক রহমানের ভারত সফর।

আমার ভাবতে অবাক লাগে যে, বাংলাদেশের এক শ্রেণীর সুশীল এবং ইউটিউবার হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে যে ভাষায় কথা বলছেন তার সাথে ভারতীয় বয়ান অক্ষরে অক্ষরে মিলে যাচ্ছে। বাংলাদেশে বাস করে ভারতের প্রভুত্ববাদী বয়ান বাংলাদেশে ফেরি করা দেখে অবাক লাগে। সরকার এব্যাপারে রহস্যময়ভাবে নির্বিকার।

হাসিনা ও তার দলবল এবং ওসমান হাদির ঘাতকদের প্রত্যর্পণ প্রশ্নে শুধুমাত্র তারেক রহমানের ভারত সফরই ঝুলে যায় নি, বরং বাংলাদেশের ভারত নীতিই প্রচণ্ড হোঁচট খেয়েছে। বিদেশ নীতিতে আরো অনেক বিষয় আছে। আজ আর সেগুলো উল্লেখ করলাম না। তবে বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের সুস্পষ্ট মতামত হলো শেখ হাসিনার বিচারের রায় এবং ওসমান হাদির খুনিদের ফেরত দানের ব্যাপারে জনগণ কোনো আপস করবে না। ভারতীয় বা অন্য কোনো চাপে পড়ে সরকার যদি আপসের পথে পা বাড়ায় তাহলে জনগণ রুখে দাঁড়াবেন।

Email:[email protected]