ডিসিসিআই’র সেমিনার
- জ্বালানি সংকট এক মাসে সমাধান হওয়ার নয়: অর্থমন্ত্রী
- অর্থনীতির ক্ষেত্রে দেশ যুগসন্ধিক্ষণে রয়েছে : ড. হোসেন জিল্লুর রহমান
- করের পুরো টাকা কোষাগারে জমা না হওয়া উদ্বেগজনক: অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান
স্টাফ রিপোর্টার
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সুদের হার হ্রাস ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে শিল্পখাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশে নেমে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংগঠনটি।
গতকাল শনিবার রাজধানীর মতিঝিলে ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে আয়োজিত সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ এসব কথা হলেন। ‘২০২৬ অর্থবছরের দ্বি-বার্ষিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, প্রেক্ষিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি এবং বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক সেমিনার আয়োজন করে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)।
সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ও ব্র্যাকের চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জায়েদি সাত্তার, বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সিমিন রহমান।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘এনার্জি সিকিউরিটি ইজ দ্য প্রাইমারি কম্পোনেন্ট ফর দ্য ডেভেলপমেন্ট অব দ্য ইকোনমি।’ তবে এ সমস্যা এক মাসে সমাধান হওয়ার নয়। সরকার যে পরিস্থিতি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে, সেখান থেকে দ্রুততম সময়ে সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের কোনো কোনো এনার্জি খাতে ১৫ দিন বা ১৭ দিনের রিজার্ভও ছিল না। বর্তমানে সেই রিজার্ভ এক মাসে উন্নীত করা সম্ভব হয়েছে। এখন এটিকে তিন মাসে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট সমাধানে সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। গ্যাসের সংকট মোকাবিলায় এফএসআরইউ নিয়ে আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে অনশোরভিত্তিক গ্যাসের উৎস ও পাইপলাইন নিয়েও কাজ শুরু হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, প্রতিটি এনার্জি সেক্টরে তিন মাসের রিজার্ভ নিশ্চিত করার লক্ষ্য রয়েছে। এ জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে বিনিয়োগের কোনো বিকল্প নেই। দেশে বিনিয়োগ না হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থাও তৈরি হবে না।
তিনি বলেন, বিগত দিনে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি মূলত বেসরকারি খাতনির্ভর ছিল। বিএনপির মৌলিক দর্শন হচ্ছে বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধি। বেসরকারি খাত অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি পরিচালনা করবে এবং সরকারের দায়িত্ব হবে প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করা, সহায়তা ও সুবিধা দেওয়া।
ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে ডিরেগুলেশনের ওপর গুরুত্বারোপ করে আমির খসরু বলেন, শুধু নীতিমালা ঘোষণা করলেই হবে না, এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। ডিরেগুলেশনের বিষয়গুলো সামনে আনতে সরকার কাজ করছে এবং ব্যবসায়ীরা কোথাও বাধাগ্রস্ত হলে তা জানানোর জন্য একটি ওয়েবসাইট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকেও তাদের সদস্যদের সমস্যার বিষয়ে অবস্থান নিতে হবে।
কাস্টমস, বন্দর ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বসে ব্যবসার খরচ কমানোর বিষয়ে আলোচনা করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, একটি বৈঠকেই প্রায় ৮ থেকে ১০টি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পণ্য আমদানির পর কার্গো ছাড় করতে কত সময় লাগবে, কাস্টমস ও বন্দর কোন কাজ কত দিনের মধ্যে শেষ করবে; এসব বিষয়ে সময়সীমা নির্ধারণ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
ব্যবসায়ীদের খেলাপি ঋণের সমস্যা প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি সংকটসহ বিভিন্ন কারণে শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ পুনঃতফসিল ও ওয়ান-টাইম সেটেলমেন্টের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, যারা ব্যবসা চালিয়ে যেতে চান, তাদের জন্য পুনঃতফসিলের মাধ্যমে সময় ও গ্রেস পিরিয়ড দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আর যারা ব্যবসা থেকে বের হয়ে যেতে চান, তারা ওয়ান-টাইম সেটেলমেন্টের মাধ্যমে বেরিয়ে যেতে পারবেন।
বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা তুলে ধরে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ধীরে ধীরে সুদের হার কমিয়ে সহনীয় পর্যায়ে আনতে হবে, যদিও এরই মধ্যে ৫০ বেসিস পয়েন্ট হ্রাস পেয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে শিল্পখাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, ঘোষিত সিএমএসএমই সহায়তা প্যাকেজের ৫ হাজার কোটি টাকার কার্যকর বাস্তবায়ন, স্বচ্ছ তদারকি এবং প্রকৃত উৎপাদনমুখী উদ্যোক্তাদের কাছে সহজে অর্থ পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, খেলাপি ঋণ হ্রাস এবং আর্থিক খাতের প্রতি জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। সর্বোপরি, ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরিয়ে এনে স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়াতে হবে। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিঃসন্দেহে চ্যালেঞ্জপূর্ণ। তবে যথাযথ নীতিগত সমন্বয়, কার্যকর সংস্কার, জবাবদিহিমূলক বাস্তবায়ন এবং সরকারি-বেসরকারি খাতের নিবিড় অংশীদারত্বের মাধ্যমে এই চ্যালেঞ্জগুলোকে সুযোগে রূপান্তর করা সম্ভব।
তাসকীন আহমেদ বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণের উচ্চ ব্যয় এবং ব্যবসায়িক খরচ বেড়ে যাওয়ায় দেশের বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে চাপ তৈরি হয়েছে। সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ২৫ দশমিক ৯ শতাংশ হলেও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৫ শতাংশ। এ পরিস্থিতি বিনিয়োগের জন্য উদ্বেগজনক।
তিনি বলেন, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৩ দশমিক ১ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। বাণিজ্য বাধা, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট, সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধকতা, জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি এবং পণ্য পরিবহনের খরচ দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও।
ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যবসা সহজ করার লক্ষ্যে বেশ কিছু সংস্কারমূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কোম্পানি নিবন্ধন প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে ৪৮ ঘণ্টায় সম্পন্ন করা, চামড়া, পাদুকা ও হোম টেক্সটাইল খাতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা আরও তিন বছর বাড়ানো এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে ১০টি নতুন খাতকে শুল্কমুক্ত সুবিধার আওতায় আনার উদ্যোগ রয়েছে।
পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, অর্থনীতির ক্ষেত্রে দেশ একটি যুগসন্ধিক্ষণে রয়েছে। সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারলে অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত গতি আসবে, অন্যথায় পিছিয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হবে।
অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে হয়রানি একটি নেতিবাচক কাঠামোতে পরিণত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে সংস্কার কার্যক্রম কাক্ষিত ফল দিচ্ছে না। করজাল সম্প্রসারণে হয়রানি কমানোর কোনো বিকল্প নেই এবং এ ক্ষেত্রে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি রেজিলিয়েন্ট হলেও কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান তৈরিতে ক্রমাগত পিছিয়ে যাচ্ছে। খেলাপি ঋণ কমাতে কাঠামোগত সমস্যা দূর করার পাশাপাশি এসএমই খাতে ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়ন তদারকিতে ‘ইকোনমিক রিফর্ম এক্সিলারেশন ইউনিট’ গঠনের প্রস্তাবও দেন তিনি।
আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, মূল্যস্ফীতি এখনও প্রত্যাশিত মাত্রায় নামেনি। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ দীর্ঘদিনের মধ্যে সর্বনি¤œ পর্যায়ে রয়েছে। বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং শিল্পখাতের সক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি উচ্চ সুদহার, উৎপাদন ও আমদানি ব্যয়, বিনিময় হার এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা ব্যবসার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে।
দেশের অর্থনীতিকে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে নিতে বেসরকারি খাতের আস্থা, সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি স্থিতিশীল, পূর্বানুমানযোগ্য ও বিনিয়োগবান্ধব নীতিগত পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জায়েদি সাত্তার বলেন, দেশের নীতিমালা ও বাস্তবায়নের মধ্যে বড় ধরনের ফারাক রয়েছে। ফলে কাক্সিক্ষত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। রপ্তানি পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণে নীতি উদার হলেও আমদানির ক্ষেত্রে উচ্চ শুল্কের কারণে স্থানীয়ভাবে পণ্যের দাম ও মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। এলডিসি উত্তরণের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এডিপি বাস্তবায়ন করতে হলে কর আহরণে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। বাজেটে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সম্ভাবনা খুবই কম। তিনি বলেন, বাজেটে ভালো উদ্যোগ থাকলেও মুদ্রানীতিতে তার প্রতিফলন নেই। ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় মুদ্রানীতিতে সংস্কার জরুরি। জনগণের কাছ থেকে আদায় করা করের পুরোটা কোষাগারে জমা না হওয়ার বিষয়টিও উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি। বিদেশি ঋণ গ্রহণ ও পরিশোধের ক্ষেত্রেও সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেন এ অর্থনীতিবিদ।