রাজধানীর অপরাধপ্রবণতা এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নগরবাসীর জানমালের নিরাপত্তা দিতে হিমসিম খাচ্ছে। তারপরও পুলিশ প্রশাসনের দাবি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কিন্তু রাজধানীতে একের পর এক ঘটছে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা। যা আত্মসচেতন মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকন্ঠা সৃষ্টি করেছে।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ঢাকার অপরাধ জগৎ নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠছে। একের পর এক হত্যাকা-, গুলি, ছুরিকাঘাত, কুপিয়ে আহত করা, সন্ত্রাসী হামলা ও প্রকাশ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় নগরবাসীর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ধারাবাহিক অভিযান চালালেও অপরাধী চক্রগুলো নতুন কৌশলে সক্রিয় হয়ে উঠছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ, সরকারি-বেসরকারি প্রকল্পকে কেন্দ্র করে দখলদারিত্ব, মাদক কারবার, কিশোর গ্যাং, অনলাইন জুয়ার সিন্ডিকেট এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাকে ঘিরে সঙ্ঘাত বাড়ছে। এ ছাড়াও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের সদস্যরা দেশকে অস্থিতিশীল করতে টার্গেট অ্যাটাক করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসব অপরাধ দমনে খুব একটা সাফল্য দেখাতে পারছে না। ফলে নগর জীবনে স্বস্তি ফিরছে না।
জানা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন থানা এলাকায় স্থানীয় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে ছোট-বড় সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর মধ্যে সঙ্ঘাত বাড়ছে। বাজার, পরিবহন, ফুটপাথ, নির্মাণকাজ, কাঁচাবাজার, ট্রাকস্ট্যান্ড, টার্মিনাল, বস্তি এবং বিভিন্ন ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা চলে আসছে। নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ, পরিবহন, মার্কেট, হকার, পার্কিং, বালু ও ইট বহনকারী যানবাহন, এমনকি বিভিন্ন স্থানীয় ব্যবসা থেকেও নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এসব অবৈধ আয়ের উৎস নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত শুক্রবার রাত ১১টার দিকে রাজধানীর কাফরুলের ওপেক্স গার্মেন্টের পাশে দুর্বৃত্তদের এলোপাতাড়ি গুলীতে একজন নিহত ও দু’জন আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরো দু’জন গুলীবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন। এর আগে গত ২১ জুলাই রাতে সবুজবাগে পলাশ নামে এক বিএনপি কর্মীকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। একই রাতে হাজারীবাগে দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হয়েছেন একজন সিএনজি চালিত অটো রিকশাচালক। অপর দিকে ২৩ জুলাই রাতে মোহাম্মদপুরের কাদেরাবাদ হাউজিংয়ে এক পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টরকে কুপিয়ে আহত করা হয়েছে। তিনি স্পেশাল ব্র্যাঞ্চের (এসবি) শাহজালাল বিমানবন্দর ইমিগ্রেশনে কর্মরত রয়েছেন। ২৪ জুলাই মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে নাশকতার উদ্দেশে পরিত্যক্ত অবস্থায় রাখা হয়েছিল দু’টি শক্তিশালী টাইম বোমা। তবে আনসার সদস্যের সতর্কতায় সেটি বিস্ফোরণ হওয়ার আগেই শনাক্ত হওয়ায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পাওয়া গেছে। এ ছাড়া অসংখ্য চাঁদাবাজি, হামলা, ভাঙচুরের ঘটনা ঘটছে।
ডিএমপি সূত্র বলেছে, শীর্ষ সন্ত্রাসী থেকে শুরু করে বিভিন্ন মামলার আসামিদের কেউ কেউ জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। পুরনো সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক পুনর্গঠন, নতুন সদস্য সংগ্রহ এবং আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এতে অপরাধ দমনে নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়েছে। এমন পরিস্থিতে সুযোগ নিচ্ছে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা। তারা গোপনে এবং প্রকাশ্যে দেশকে অস্থিতিশীল করার নানা ধরনের চেষ্টা চালাচ্ছে। তারই অংশ হিসেবে বিভিন্ন ধরনের টার্গেট অ্যাটাক করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক হিসেবে দেখাতে চাইছে। ফলে বেশ কিছু অপরাধমূলক ঘটনা দৃশ্যমান হচ্ছে। তবে প্রতিটি ঘটনাই শনাক্ত করে জড়িতদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। যেসব এলাকায় সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধের ঝুঁকি বেশি, সেখানে গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল বাড়ানো হয়েছে। অপরাধীদের গ্রেফতারে বিশেষ অভিযানও অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু সার্বিক পরিস্থিতির কোন উন্নতি নেই।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, রাজধানী ঢাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বড় ধরনের অবনতি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে না। মূলত, বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই এসব ঘটনা বেশি ঘটছে। একই সাথে সক্রিয় রয়েছে পেশাদার অপরাধী চক্র। পতিত স্বৈরাচারের প্রতিভূরাও পরিকল্পিতভাবে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে; যাতে দেশের স্বাভাবিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো যায়।
এমতাবস্থায় নগরবাসীর জানমালের নিরাপত্তার জন্য সরকার, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে শূন্য সহনশীলতা দেখাতে হবে। অপরাধ দমনে নিতে হবে আইনানুগ কঠোর পদক্ষেপ। এক্ষেত্রে সকল রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে থেকে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চত করতে হবে। অন্যথায় আগামী দিনে পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে।