॥ মুঃ শফিকুল ইসলাম ॥
মানুষ প্রতিদিন দাঁত পরিষ্কার করে সুস্থ থাকার জন্য। কিন্তু সে টুথপেস্টই যদি অদৃশ্য প্লাস্টিক কণার মাধ্যমে মানবদেহে নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে, তবে সেটি কেবল একটি পণ্যের মানগত ত্রুটি নয়; এটি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রশ্ন। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় দেশের বাজারে প্রচলিত ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির তথ্য উদ্বেগকে আরও গভীর করেছে। বিষয়টি এখন আর গবেষণাগারের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই; এটি রাষ্ট্র, উৎপাদক এবং ভোক্তা সবার জন্য একটি সতর্ক সংকেত।
মাইক্রোপ্লাস্টিক আজ বিশ্বের অন্যতম নীরব দূষণ। খাদ্য, পানি, বায়ু পেরিয়ে এর উপস্থিতি মানবদেহের রক্ত, ফুসফুস, যকৃত ও প্লাসেন্টা পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে আন্তর্জাতিক গবেষণায় উঠে এসেছে। এর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে গবেষণা চলমান থাকলেও বিজ্ঞানীরা সম্ভাব্য প্রদাহ, কোষের ক্ষতি, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এবং অন্যান্য জটিল রোগের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করছেন। সে বিবেচনায় মুখগহ্বরের মাধ্যমে প্রতিদিন ব্যবহৃত টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।
এখানেই প্রশ্ন ওঠে দেশে ব্যক্তিগত পরিচর্যাপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? বাজারে বিক্রির আগে সংশ্লিষ্ট পণ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর। যদি গবেষণায় উল্লিখিত তথ্য বাস্তবতার প্রতিফলন হয়, তবে তা প্রমাণ করে যে বিদ্যমান তদারকি ব্যবস্থায় ঘাটতি রয়েছে। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত অবিলম্বে স্বাধীন তদন্ত পরিচালনা, বাজার থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজনে ক্ষতিকর উপাদানযুক্ত পণ্য প্রত্যাহারের ব্যবস্থা নেওয়া। একই সঙ্গে উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। ভোক্তার স্বাস্থ্যকে ঝুঁকিতে ফেলে কোনো শিল্পের মুনাফা টেকসই হতে পারে না।
নিরাপদ বিকল্প উপাদান ব্যবহার, কাঁচামালের উৎস যাচাই এবং উপাদান তালিকায় পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি। আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ না করলে দেশীয় পণ্যের প্রতি আস্থাও ক্ষুণ্ন হবে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ কেবল পরিবেশগত সংকট নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, ভোক্তা অধিকার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই সরকারের উচিত এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন, পরীক্ষাগার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও বিস্তৃত গবেষণায় উৎসাহিত করতে হবে, যাতে নীতিনির্ধারণে নির্ভরযোগ্য তথ্যভিত্তি তৈরি হয়।
স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রশ্নে কোনো আপস চলে না। প্রতিদিনের অভ্যাস যদি নীরবে নতুন বিপদের জন্ম দেয়, তবে সেই বিপদকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। মানুষের আস্থা রক্ষা, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং নিরাপদ বাজারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ একটি সভ্য রাষ্ট্রে টুথপেস্ট মানুষের দাঁত পরিষ্কার করবে—দেহে প্লাস্টিক জমা করবে না।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।