জসিম উদ্দিন মনছুরি

সম্প্রতি নো কিংস বিক্ষোভে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্রে নজিরবিহীন প্রতিবাদ বিক্ষোভ হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের দাবি ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে রাজা মনে করছেন অথচ তিনি রাজা নন জনগণই হচ্ছে রাজা। বিক্ষোভে কয়েক মিলিয়ন লোক অংশ নেন। আমেরিকার বড় বড় শহর ছাড়াও শেলবিভিল এবং হাউলের মতো ছোট শহরগুলোতেও মানুষ রাস্তায় নেমে যুদ্ধ ও অভিবাসন নীতির প্রতিবাদ জানায় । শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, প্যারিস, লন্ডন এবং লিসবনের মতো আন্তর্জাতিক শহরগুলোতেও প্রবাসী মার্কিনিরা জড়ো হয়ে ট্রাম্পকে ‘ফ্যাসিস্ট’ ও ‘যুদ্ধাপরাধী’ আখ্যা দিয়ে তার অভিশংসন দাবি করেছেন। গত অক্টোবরে ‘নো কিংস’ র‌্যালিতে দেশজুড়ে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছিল। এবারও শিকাগো, বোস্টন, ন্যাশভিল এবং হিউস্টনের মতো শহরগুলোতে বিক্ষোভ দানা বাঁধছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে বেশ কয়েকটি রাজ্যে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করা হয়।

মার্কিন রাজনীতির এই জটিল সমীকরণ, অর্থনীতির নাজুক অবস্থা, মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রভাব এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সম্ভাব্য অভিশংসনের ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে শঙ্কা।আয়োজকদের তথ্যানুযায়ী ফের শুরু হওয়া আন্দোলনে ৫০টি অঙ্গরাজ্যে ৩ হাজার ২০০টির বেশি কর্মসূচির পরিকল্পনা ছিল। নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন, ডালাস ও ফিলাডেলফিয়ায় বড় সমাবেশ হলেও, দুই-তৃতীয়াংশ কর্মসূচি হয়েছে ছোট শহর ও কমিউনিটিতে-যা আন্দোলনের বিস্তারকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। উল্লেখ্য মিনেসোটায় ফেডারেল ইমিগ্রেশন এজেন্টদের হাতে রেনে গুড এবং অ্যালেক্স প্রেটি নামের দুই মার্কিন নাগরিকের মৃত্যুর পর সেখানে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়, যা এই বিক্ষোভের অন্যতম প্রধান ইন্ধন হিসেবে কাজ করছে।

ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে উত্থাল যুক্তরাষ্ট্র। ফোর্বসের একটি জরিপে দেখা যায়, প্রতি ১০ জন ডেমোক্র্যাটের মধ্যে প্রায় ৯ জন, ১০ রিপাবলিকানের মধ্যে ৩ জন এবং ১০ স্বতন্ত্রের মধ্যে ৬ জন ভোটার এই সামরিক পদক্ষেপের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে মিডটার্ম নির্বাচনেও এর প্রভাব পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থায় প্রেসিডেন্ট চার বছরের জন্য নির্বাচিত হন। ইউএস ভোট ফাউন্ডেশনের সংজ্ঞা অনুযায়ী, এই মেয়াদের ঠিক মাঝামাঝি সময়ে (অর্থাৎ দুই বছর পর) যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাকেই ‘মিডটার্ম’ বা মধ্যবর্তী নির্বাচন বলা হয়। ২০২৬ সালে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ৩ নভেম্বর। ট্রাম্প নিজেই রিপাবলিকান আইন প্রণেতাদের সতর্ক করে বলেছেন যে, ‘আপনাদের মধ্যবর্তী নির্বাচনে জিততেই হবে। কারণ আমরা না জিতলে তারা আমাকে অভিশংসন করার একটা কারণ খুঁজে বের করবে। আমি অভিশংসিত হবো।’এদিকে ডেমোক্র্যাটরা যদি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়, তবে তারা ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চরম মাত্রায় আইনি নজরদারি এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পরিকল্পনাও করছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্প বিজয়ী হতে না পারলেই ধারণা করা হচ্ছে তাকে অবিশংসনে যেতে হবে। তবে, যুক্তরাষ্ট্রে কোনো প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব পাস হওয়া মানেই সরাসরি ক্ষমতাচ্যুত হওয়া নয়।অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু করার একক ক্ষমতা রয়েছে হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভস বা নিম্নকক্ষের হাতে। হাউসে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে অভিশংসনের অভিযোগ গৃহীত হলে প্রেসিডেন্ট বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা অভিশংসিত হন।এরপর সিনেট (উচ্চকক্ষ) বিচার প্রক্রিয়া পরিচালনা করে। প্রেসিডেন্টকে দোষী সাব্যস্ত করে পদচ্যুত করতে হলে সিনেটের ১০০ সদস্যের মধ্যে ৬৭ জনের ভোট প্রয়োজন হয়। অভিযোগের মূল ভিত্তি হতে হয়-রাষ্ট্রদ্রোহ, ঘুষ গ্রহণ অথবা অন্যান্য গুরুতর অপরাধ ও অসদাচরণ। ওয়াশিংটন পোস্টের রিপোর্ট অনুযায়ী মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা জয়ী হলে তারা আইনি নোটিশ জারির মাধ্যমে একাধিক তদন্ত শুরু করতে প্রস্তুত।তারা জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে ট্রাম্পের অতীত সম্পর্ক এবং এ সংক্রান্ত আইনি ফাইল আটকে রাখার বিষয়ে প্রেসিডেন্টকে জিজ্ঞাসাবাদ করার কথা ভাবছেন। ট্রাম্প ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে সংবিধানের ‘উপহার সংক্রান্ত অনুচ্ছেদ’ লঙ্ঘন তদন্তের প্রস্তুতি চলছে। এর মধ্যে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে ক্রিপ্টো ব্যবসার অংশীদারত্ব বিক্রি, নিজের ব্যক্তিগত আয়করের তথ্য ফাঁসের পর সরকারের বিরুদ্ধে ১০ বিলিয়ন ডলারের মামলা এবং কাতার থেকে পাওয়া একটি উড়োজাহাজ গ্রহণের মতো বিষয়গুলো। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ট্রাম্প ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের অভিশংসিত দুই প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিংটন ও রিচার্ড নিক্সন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে আজ পর্যন্ত কোনো প্রেসিডেন্টকে সিনেট চূড়ান্তভাবে পদচ্যুত করতে পারেনি। রিচার্ড নিক্সন (১৯৭৪) : ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির কারণে অভিশংসন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই তিনি পদত্যাগ করেছিলেন। বিল ক্লিনটন (১৯৯৮) : মনিকা লিউইনস্কি স্ক্যান্ডালে হোয়াইট হাউসের ইন্টার্নের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে শপথের অধীনে মিথ্যা বলার অভিযোগে তিনি অভিশংসিত হন। তবে সিনেটে তিনি খালাস পান।

ডোনাল্ড ট্রাম্প (২০১৯ ও ২০২১) : ডোনাল্ড ট্রাম্পই একমাত্র মার্কিন প্রেসিডেন্ট যিনি তার প্রথম মেয়াদে দুইবার অভিশংসিত হয়েছেন। ২০১৯ সালে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ইউক্রেনে সামরিক সহায়তা আটকে রাখার অভিযোগে এবং ২০২১ সালে নির্বাচনের আগে ক্যাপিটল হিলে হামলার ঘটনায় উসকানির অভিযোগে তাকে অভিশংসন করা হয়। প্রতিবারই সিনেটে তিনভাগের দুইভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় তিনি খালাস পেয়েছিলেন।

রয়টার্সের তথ্যমতে, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে পেন্টাগন হোয়াইট হাউসের কাছে ২০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল যুদ্ধকালীন তহবিল কংগ্রেসের কাছে চাওয়ার আবেদন করেছে। এটি মার্কিন রাজনীতিতে প্রবল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।আইনপ্রণেতাদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম ছয় দিনেই ১১ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, তুর্কিয়ে টুডে, আল-জাজিরা কেএএ তথ্যমতে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ। চলমান সংঘাতে এরই মধ্যে অন্তত ১৩ জন মার্কিন সেনা প্রাণ হারিয়েছেন। ধ্বংস হয়েছে রাডার, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে একঝাঁক অর্থাৎ ১৬টির মত যুদ্ধবিমান, এমনকি দুটি রণতরীও। ১৪ মার্চ মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, সৌদি আরবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর পাঁচটি ট্যাংকার বা রিফুয়েলিং প্লেন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সৌদীর প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে অবস্থান করা যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচটি ট্যাংকার প্লেন মাটিতে থাকা অবস্থায় হামলার শিকার হয়। দুই মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে জানানো হয়েছে, প্লেনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ধ্বংস হয়নি। সেগুলো মেরামত করা হচ্ছে। এই পর্যন্ত ইরান যুদ্ধে প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের সামরিক ক্ষতি হয়েছে। তুরস্কের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরুর প্রথম দুই সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার রাডার যন্ত্রাংশে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান ও সৌদি আরবে থাকা চারটি এএন/টিপিওয়াই-২ রাডার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে। এসব ক্ষতির আনুমানিক মূল্য প্রায় ২০০ কোটি ডলার। এ ছাড়া কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটিতে থাকা একটি এএন/ এফপিএস-১৩২ রাডার ইরানী ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মূল্য প্রায় ১.১ বিলিয়ন ডলার বলে ধারণা করা হচ্ছে। মার্কিন কর্মকর্তারা সিবিএস নিউজকে জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত ১১টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ভূপাতিত হয়েছে। প্রতিটির মূল্য প্রায় তিন কোটি ডলার।এ ছাড়া কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভুল গোলাবর্ষণে তিনটি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছে। তবে এতে থাকা ছয়জন ক্রু সদস্য বেঁচে যান।ইরানের হামলায় বাহরাইনের রাজধানী মানামায় অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদরদপ্তরেও ক্ষতি হয়েছে। সেখানে দুটি স্যাটেলাইট যোগাযোগ টার্মিনাল ও কয়েকটি ভবন ধ্বংস হয়েছে।গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা শুরু করে। ওই হামলায় এখন পর্যন্ত ইরানে ১ হাজার ৩৪৮ জন নিহত এবং ১৭ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।

দখলদার ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানে হামলা চালিয়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারির ওই আগ্রাসনের পর সমানে আক্রমণ চালিয়েছে তেহরানও। ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়ছে উগ্র ইহুদিবাদী ভূখণ্ড ও উপসাগরীয় দেশগুলোয় মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে। এই ক্ষেপণাস্ত্র বৃষ্টি মোকাবিলা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইন্টারসেপ্টরের মজুদ ফুরিয়ে আসছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে। এমতাবস্থায় ইরানের বিরুদ্ধে তেল আবিব কতদিন টিকতে পারবে-তা নিয়ে চলছে বিভিন্ন ধরনের বিশ্লেষণ-গবেষণা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সৈন্যবাহিনী থাকলেও দখলদার ইসরাইলের সেই সমর্থ্য নেই। তাছাড়া ইসরাইলের অভ্যন্তরে শুরু হয়েছে নানা কোন্দল। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে মানুষ রাস্তায় পর্যন্ত নেমে এসেছে।গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে ইসরাইল ক্রমাগত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার শিকার হচ্ছে। এ কারণে ব্যাপক বিমান হামলার সতর্কবার্তা (এয়ার রেইড অ্যালার্ট), স্কুল বন্ধ রাখা এবং হাজার হাজার রিজার্ভ সৈন্যকে তলব করতে বাধ্য হয়েছে যুদ্ধবাদী সরকার।হাইফা ও তেল আবিবের মতো শহরগুলো টানা হামলার মুখে পড়েছে, জরুরি পরিষেবাগুলো হিমশিম খাচ্ছে। দেশটির সাধারণ মানুষ, যারা তাদের সরকার অন্যদের ওপর যে মাত্রার যুদ্ধ চাপিয়ে দেয় তাতে অভ্যস্ত নয়, তারা গত কয়েকদিন ধরে বোমা আশ্রয়কেন্দ্রে আসা-যাওয়ার মধ্যে আছেন। ইসরাইলী রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ শির হেভার বলেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গেই ইসরাইলজুড়ে সামরিকবাদের এক জোয়ার বয়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, এটি গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের মতো ছিল না। তখন ছিল মূলত আতঙ্ক এবং এক অস্তিত্ব রক্ষার ভয় যে ইরান হয়তো ইসরাইলকে ধ্বংস করে দেবে। এখন এটি এক উন্মাতাল সামরিকবাদ এবং অতি-আত্মবিশ্বাস। এমনকি যুদ্ধের সামান্য সমালোচক যারা আছেন, তারাও প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে যুদ্ধ ‘সংক্ষিপ্ত’ রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন-যেন ইসরাইল নিজেই ঠিক করতে পারে যে এটি কখন শেষ হবে। তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ড্যানিয়েল বার-তাল বলেন, এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাজ্যের ‘ব্লিৎজ’ (লন্ডন বোমা হামলা) এর মতো। তখন ব্রিটিশরা এই বোমাবর্ষণ মেনে নিয়েছিল, কারণ তারা মনে করত তারা এক চরম অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়ছে। ইসরাইলীদের অনুভূতিও একই রকম। জন্মের পর থেকেই আমাদের মগজধোলাই করা হয় যে ইরান হলো অশুভ শক্তি। কিন্ডারগার্টেন, হাই স্কুল এবং সেনাবাহিনীতে এই ধারণাই আরও পোক্ত করা হয়।বার-তালের মতে, কয়েক সপ্তাহের নতুন যুদ্ধের পর ইসরাইলী সমাজ ঠিক কোন দিকে মোড় নেবে তা অনুমান করা অসম্ভব। তবে তিনি উল্লেখ করেন যে, ১৯৪৮ সালের ‘নাকবা’র সময়কার হত্যাকাণ্ড কিংবা সাম্প্রতিক গাজা গণহত্যা কোনোটিই দেশটির শাসনব্যবস্থার ন্যায়পরায়ণতা সম্পর্কে তাদের নৈতিক দৃঢ়তায় ফাটল ধরাতে পারেনি। তিনি বলেন, এখন আমাদের কাছে এমন এক প্রজন্ম আছে, যারা আরও বেশি সামরিকবাদী এবং কট্টর ডানপন্থী। নেতানিয়াহু আমাদের বলছেন যে এখন আমাদের তলোয়ারের ওপর ভর করেই বাঁচতে হবে।

বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা প্রায় নিরবচ্ছিন্ন যুদ্ধ ইসরাইলের অর্থনীতির ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। গোলাবারুদের খরচ এবং পরিকল্পনার চেয়েও অনেক বেশি সময় ধরে কয়েক লাখ রিজার্ভ সৈন্য মোতায়েন রাখা ইসরাইলী কোষাগারের ওপর বিশাল চাপ তৈরি করেছে। ২০২৪ সালে লেবানন ও গাজা যুদ্ধে ইসরাইলের ব্যয় ৩১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে বলে জানা গেছে, যা দেশটিকে গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বাজেট ঘাটতির মুখে ফেলেছে। ২০২৫ সালের প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, যুদ্ধ ব্যয় ৫৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।অর্থনীতির ওপর এই চাপের কারণে ২০২৪ সালে প্রধান তিনটি ক্রেডিট রেটিং সংস্থাই ইসরাইলের সার্বভৌম ক্রেডিট রেটিং কমিয়ে দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিবিদ হেভার বলেন, ইসরাইল বর্তমানে ঋণ সংকট, জ্বালানি সংকট, পরিবহন সংকট এবং স্বাস্থ্যসেবা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

সব মিলিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন বর্তমানে কঠিন সময় পার করছে। দখলদার ইসরাইল বাহিনীও ইরানের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে এখন প্রাণ যায় যায় অবস্থা। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে যেমন চরম অসন্তোষ শুরু হয়েছে তদ্রুপ ইসরাইলের অভ্যন্তরেও নেতানিয়াহু বিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। বলা যায় ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু এখন ঘরে বাইরে কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে। এ অবস্থা থেকে আদৌ কি বেরিয়ে আসতে পারবে তারা? হয়তো সময় বলে দেবে। ইরানের শক্তিশালী মিসাইল প্রতিরোধ করেই দখলদার ইসরাইল বাহিনী কত দিন টিকে থাকতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলো ইরানের লক্ষ্য থেকে কতটুকু নিরাপদে থাকতে পারে দেখার বিষয়। এর মাঝে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়ে ইরানের ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দল ১১ এপ্রিল পাকিস্তানে শান্তি আলোচনায় অংশ নিয়েছে। আলোচনার প্রাথমিক ফলাফলে জানা গেছে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের বিনিময়ে বিভিন্ন দেশে আটকে থাকা ইরানের সম্পদ ইরানের কাছে ফিরিয়ে দিতে যুক্তরাষ্ট্র সম্মত হয়েছে।আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা যদি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে, তবে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিশংসন এবং আইনি তদন্তের বন্যা বয়ে যাওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার। ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে তিনি কত দ্রুত এই যুদ্ধ শেষ করতে পারেন এবং কীভাবে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও রাজনৈতিক চাপ সামাল দেন তার ওপর।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক।