জাফর আহমাদ

আমাদের এই উপমহাদেশে আল্লাহর এই আয়াতটি অত্যন্ত কার্যকর। কারণ এই উপমহাদেশে অনেক মাজারপূজারী দেখতে পাওয়া যায়, যা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে খুব একটা বেশি দেখতে পাওয়া যায় না। আমাদের এই মাজারপূজারীরা মনে করে, কবরে শায়িত ব্যক্তি তাদের কথা শুনতে পায় এবং তাদের মনের ইচ্ছা-আকাক্সক্ষা পূরণ করতে পারে। ফলে তাদের কাছে ধন-দৌলত, টাকা-পয়সা ও সন্তান-সন্তুতির জন্য প্রার্থনা করে। তারা কবর সাজায়, কবরে মোমবাতি জ¦ালায়, কবরের উপর ঘর তৈরি করে, কবর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে, লাল-নীল কাপড় দিয়ে আচ্ছাদিত করে। সবচেয়ে বড় পথভ্রষ্টামী হলো, সেই কবরে মর্যাদার প্রতীক নিজের মাথা কপাল ঠেকিয়ে সেজদা করে। যেই মাথা ও কপাল একমাত্র আল্লাহর সামনেই নত হতে পারে। মর্যাদাবান ব্যক্তিরা এই মর্যদা তার মত অন্য কোন সৃষ্টির সামনে কখনো লুটিয়ে দেয় না। আর এই জন্যই সে সৃষ্টি সেরা সৃষ্টিজীব। যারা নিকৃষ্ট, অধম ও অন্ধ পথভ্রষ্ট কেবল তারাই নিজের মর্যাদার প্রতীকগুলো অন্য সৃষ্টির সামনে নত করে দেয়।

আল্লাহ তা’আলা বলেন, “সেই ব্যক্তির চেয়ে বেশি পথভ্রষ্ট কে যে আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন সব সত্তাকে ডাকে যারা কিয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়া দিতে সক্ষম নয়। এমনকি আহ্বানকারী যে তাকে আহ্বান করছে সে বিষয়েও সে অজ্ঞ।” (সুরা আহকাফ : ৫) মুফাসসিরগণ লিখেছেন, প্রথমত: জবাব দেয়ার অর্থ কার্যত জবাবী, তৎপরতা দেখানো, শুধু মুখে উচ্চস্বরে জবাব দেয়া কিংবা লিখিতভাবে জবাব পাঠিয়ে দেয়া নয়। অর্থাৎ কেউ যদি সেই উপাস্যদের কাছে নালিশ বা সাহায্য প্রার্থনা করে কিংবা তাদের কাছে দু’আ করে তাহলে যেহেতু তাদের আদৌ কোনো শক্তি ও কর্তৃত্ব নেই তাই তার আবেদনে কোন প্রকার ইতিবাচক বা নেতিবাচক বাস্তব তৎপরতা চালাতে সক্ষম নয়।

দ্বিতীয়ত: কিয়ামত পর্যন্ত জবাব না দিতে পারার অর্থ হচ্ছে, যতদিন পর্যন্ত এই পৃথিবী আছে ততদিন পর্যন্ত ব্যাপারটা ওখানেই স্থির থাকবে। অর্থাৎ সেই সব উপাস্যদের পক্ষ থেকে তাদের আবেদনের কোনো জবাব পাওয়া যাবে না। কিন্তু যখন কিয়ামত হবে তখন ব্যাপারটা আরো অগ্রসর হয়ে এই দাঁড়াবে যে, সেই সব উপাস্যরা উল্টা এসব উপাসনাকারীদের দুশমন হয়ে যাবে। পরের আয়াতে এ কথাই বলা হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “যখন সমস্ত মানুষকে সমবেত করা হবে তখন তারা নিজেদের আহ্বানকারীদের দুশমন হয়ে যাবে এবং ইবাদাতকারীদের অস্বীকার করবে।” (সুরা আহকাফ : ৬) তারা সুস্পষ্ট ভাষায় বলে দেবে, না আমরা কোন সময় তোমাদের একথা বলেছি যে, আমাদের ইবাদাত করতে হবে, না আমাদের জানা আছে যে, এ লোকেরা আমাদের ইবাদাত করতো। এই গোমরাহীর জন্য তারা নিজেরাই দায়ী। তাই তার পরিণাম তাদেরকেই ভোগ করতে হবে। এ ভ্রষ্টতায় আমাদের কোন অংশ নেই।

যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যদেরকে ডাকে তাদের আহবান আদৌ তাদের কাছে পৌঁছে না। না তারা নিজেদের অন্য কোন সূত্রে তাদের কাছে এ খবর পৌঁছে যে পৃথিবীতে কেউ তাদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছে। আল্লাহর এ বাণীকে আরো পরিস্কার করে এভাবে বুঝুন: সারা পৃথিবীর মুশরিকরা আল্লাহ ছাড়া যেসব সত্তার কাছে প্রার্থনা করছে তারা তিনভাগে বিভক্ত। এক, প্রাণহীন ও জ্ঞান-বুদ্ধিহীন সৃষ্টি। দুই, অতীতের বুযুর্গ মানুষেরা। তিন, সেই সব পথভ্রষ্ট মানুষ যারা নিজেরাও নষ্ট ছিল এবং অন্যদেরকেও নষ্ট করে দুনিয়া থেকে বিদায় হয়েছিল। প্রথম প্রকারের উপাস্যদের তাদের উপাসনাকারীদের উপাসনা সম্পর্কে অনবহিত থাকা সুস্পষ্ট। এরপর থাকে দ্বিতীয় প্রকারের উপাস্য যারা আল্লাহর কাছে এমন একটি জগতে আছে যেখানে মানুষের আওয়াজ সরাসরি তাদের কাছে পৌঁছে না। আরেকটি কারণ হচ্ছে সারাজীবন যারা মানুষকে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা শিখিয়েছেন তারাই এখন উল্টা তাদের কাছে প্রার্থনা করছে আল্লাহ এবং তার ফেরেশতারা তাদের কাছে এ খবর পৌঁছিয়ে দেন না। কারণ তাদের কাছে এই খবরের চেয়ে বেশি কষ্টদায়ক জিনিস আর কিছুই হতে পারে না। আল্লাহ তার সেই নেক বান্দাদের কষ্ট দেয়া কখনো পছন্দ করেন না। এরপর তৃতীয় প্রকারের উপাস্যদের সম্পর্কে যদি চিন্তা করেন তাহলে দেখবেন, তাদের অনবহিত থাকার দুটি কারণ। একটি কারণ হচ্ছে তারা আল্লাহর অপরাধী হিসেবে বিচারের অপেক্ষায় বন্দী। সেখানে দুনিয়ার কোন আবেদন-নিবেদন পৌঁছে না। আরেকটি কারণ হচ্ছে, আল্লাহ এবং তার ফেরেশতারাও তাদের এ খবর দেন না যে, পৃথিবীতে তোমাদের মিশন খুব সফলতা লাভ করেছে এবং তোমাদের মৃত্যুর পর মানুষ তোমাদেরকে উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করেছে। কারণ এ খবর তাদের জন্য খুশির কারণ কারণ হবে। অথচ আল্লাহ জালেমদের কখনো খুশি করতে চান না।

প্রসঙ্গত আল্লাহ তার সৎ বান্দাদের কাছে মানুষের সালাম এবং তাদের রহমত কামনায় দু’আ পৌঁছিয়ে দেন। কেননা এসব তাদের খুশির কারণ হয়। একইভাবে তিনি অপরাধীদেরকে দুনিয়ার মানুষের অভিশাপ ক্রোধ তিরস্কার সম্পর্কেও অবহিত করেন। যেমন একটি হাদীস অনুসারে বদর যুদ্ধে নিহত কাফেরদের নবী (সা.) তিরস্কার শুনানো হয়েছিল। কারণ তা ছিল তাদের জন্য কষ্টের ব্যাপার। কিন্তু যা নেককার বান্দাদের জন্য দুঃখ ও মনকষ্টের এবং অপরাধীদের জন্য আনন্দের কারণ হয় সে রকম বিষয় তাদের কাছে পৌঁছানো হয় না। এই ব্যাখ্যার সাহায্যে মৃতদের শুনতে পাওয়া সম্পর্কিত বিষয়টির তাৎপর্য অতি উত্তমরূপে সুস্পষ্ট হয়ে যায়।

সবচেয়ে বড় পথভ্রষ্ট সে-ই, যে তার সৃষ্টিকারী রবকে চিনতে পারলো না। তার চোখের সামনে আল্লাহর অসংখ্য নিদর্শন থাকা সত্ত্বেও তাকে না চেনা বড়ই দুর্ভাগ্যের। সে একবার চিন্তা করে দেখে না যে, আল্লাহকে বাদ দিয়ে সে যার আরাধনা করছে সেতো তারই মতো মহান আল্লাহরই একটি সৃষ্টি। তাহলে সৃষ্টি হয়ে কেন সে নিজের মতো আরেক সৃষ্টির পূজা-অর্চনা করবে? যৎসমান্য জ্ঞান-বুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তিও তো এমনটি করতে পারে না। মনে রাখতে হবে, যাকে বুদ্ধি-জ্ঞান দান করা হয়েছে, তাকে তার কাজের জন্য দায়ীও করা হবে। সে তার জ্ঞান ও বুদ্ধি কোন কাজে কিভাবে ব্যবহার করেছে তা মহাজ্ঞানীর নখদর্পনে আছে। সুতরাং জ্ঞান ও বুদ্ধির দাবি হচ্ছে, সৃষ্টি যার, ইবাদাতের হকদারও তিনিই।

যদিও আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে আমাদের বাস্তব চক্ষু দ্বারা দেখতে পাই না এবং ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে অনুভবও করতে পারি না, তথাপি তাকে দূরে মনে করা ঠিক নয়। আল্লাহ তা’আলা প্রত্যেক বান্দার অতি নিকটেই অবস্থান করেন। প্রত্যেক মানুষ ইচ্ছা করলে সব সময় তার কাছে আর্জি পেশ করতে পারে। এতে তিনি সবকিছু শুনেন। কারণ তিনি সামিউম বাছির বা শ্রবণকারী ও মহাদ্রষ্টা। এমন কি মনে মনে যা আবেদন করা হয় তাও তিনি শুনতে পান। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহ মনের গোপন কথাও জানেন।” (সুরা ইমরান : ১১৯) শুধুমাত্র শুনতে পান না বরং সে সম্পর্কে তিনি সিদ্ধান্তও ঘোষণা করেন। মানুষ অজ্ঞতা ও মূর্খতার কারণে যে সমস্ত অলীক, কাল্পনিক ও অক্ষম সত্তাদের উপাস্য ও প্রভু গণ্য করে তাদের কাছে দৌঁড়ে যায়, অথচ তারা তার কোন আবেদন নিবেদন শুনতে পায় না। এবং আবেদনের ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও তাদের নেই। আল্লাহ গভীর ও প্রখর দৃষ্টি সম্পন্ন। তিনি তার বান্দাদের কার্যাবলী, সংকল্প ইচ্ছা পুরোপুরি ভালোভাবেই জানেন। কারণ তিনি বাছিরুম বিল ইবাদ। তিনি লাতিফ বা সূক্ষ্মদর্শী। আল্লাহ তা’আলা বলেন আর লোকমান বলেছিল “হে পুত্র! কোনো জিনিস যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয় এবং তা লুকিয়ে থাকে পাথরের মধ্যে, আকাশে বা পৃথিবীতে কোথাও, তাহলে আল্লাহ তা বের করে নিয়ে আসবেন। তিনি সূক্ষ্মদর্শী এবং সবকিছু জানেন।” (সুরা লুকমান ১৬) “দৃষ্টিশক্তি তাকে দেখতে অক্ষম কিন্তু তিনি দৃষ্টিকে আয়ত্ব করে নেন। তিনি সূক্ষ্মদর্শী ও সর্বজ্ঞ।” (আন’আম : ১০৩) আল্লাহর জ্ঞান ও তার পাকড়াও-এর বাইরে কেউ যেতে পারে না। পাথরের মধ্যে ছোট্ট একটি কণা আমাদের দৃষ্টির অগোচরে থাকতে পারে কিন্তু তার কাছে তা সুষ্পষ্ট। আকাশমন্ডলে একটি ক্ষুদ্রতম কণিকা আমাদের থেকে একান্ত অগোচরে থাকতে পারে কিন্তু তা আল্লাহর বহু নিকটতর। ভূমির বহু নিম্নস্তরে পতিত কোন জিনিস আমাদের কাছে গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত। কিন্তু তার কাছে তা রয়েছে উজ্জল আলোর মত। কাজেই আমরা এমন কোথাও এমন কোনো অবস্থায়ও এমন কোন সৎ বা অসৎ কাজ করতে পারি না যা আল্লাহর অগোচরে থেকে যায়। তিনি কেবল তা জানেন তাই নয় বরং যখন হিসেব-নিকেশের সময় আসবে তখন তিনি আমাদের প্রত্যেকটি কাজের ও নড়াচড়ার রেকর্ড সামনে নিয়ে আসবেন।

লেখক : ব্যাংকার ও প্রাবন্ধিক।