বাংলাদেশের ব্যাংক খাত দীর্ঘদিন ধরেই সংকটে। অনিয়ম, লুটপাট, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং দুর্বল তদারকি-সব মিলিয়ে এই খাত বহুবার ধাক্কা খেয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই সংকট আরও প্রকট হয়েছে। বিশেষ করে শরীয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোকে ঘিরে যে কেলেঙ্কারি সামনে এসেছে, তা দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ‘ব্যাংক রেজুল্যুশন অধ্যাদেশ ২০২৫’ ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। লক্ষ্য ছিল পরিষ্কার-দুর্নীতিগ্রস্ত মালিকদের সরিয়ে ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠন করা। কিন্তু মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সেই দর্শন বদলে গেল। নতুন ‘ব্যাংক রেজুল্যুশন আইন ২০২৬’ পাসের মাধ্যমে তৈরি হলো এক নতুন বাস্তবতা। যেখানে সংস্কারের বদলে পুনর্বাসনের অভিযোগ উঠেছে জোরালোভাবে। প্রশ্নটা তাই সরাসরি-এটি কি সত্যিই সংস্কার, নাকি সুবিধা?
২০২৫ সালের অধ্যাদেশটি ছিল কঠোর। এতে বলা হয়েছিল, যারা ব্যাংক ধ্বংস করেছে, তারা আর ফিরতে পারবে না। জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে। ব্যাংকের মালিকানা পুনর্গঠন হবে নতুনভাবে। অর্থাৎ, ‘অ্যাকাউন্টেবিলিটি’ ছিল কেন্দ্রীয় ধারণা। কিন্তু ২০২৬ সালের আইনে এসে সেই জায়গাতেই তৈরি হয়েছে বড় ফাঁক। বিশেষ করে ১৮(ক) ধারা যুক্ত হওয়ার পর পুরো আইনের চরিত্র বদলে গেছে। এই ধারায় বলা হয়েছে, আগের মালিকরা চাইলে আবার ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে পারেন। শর্তও এমন, যা অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য। মাত্র ৭.৫ শতাংশ অর্থ অগ্রিম দিয়ে মালিকানা ফেরত নেওয়া যাবে। বাকি ৯২.৫ শতাংশ দুই বছরে, ১০ শতাংশ সরল সুদে পরিশোধ করতে হবে।
এটা কি বাজার অর্থনীতির নিয়ম? নাকি বিশেষ সুবিধা?
এই ধারাটি নিয়েই সবচেয়ে বেশি বিতর্ক। কারণ, এটি মূলত সেই ব্যক্তিদের জন্য দরজা খুলে দিয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে ব্যাংক লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি একটি ‘মোরাল হ্যাজার্ড’ তৈরি করবে। অর্থাৎ, যারা আগে অপরাধ করেছে, তারা বুঝবে-শেষ পর্যন্ত রক্ষা পাওয়ার পথ আছে। একজন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তা বলেছেন, ‘যারা ব্যাংক ডুবিয়েছে, তাদের আবার দায়িত্ব দেওয়া মানে একই ভুল পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি নেওয়া।’ এই বক্তব্য হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
ব্যাংকপাড়ায় এখন খোলামেলাভাবে আলোচনা হচ্ছে-এই আইনের প্রকৃত সুবিধাভোগী কারা? শরীয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে যে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করা হয়েছিল, তার চারটিই ছিল একটি বিতর্কিত ব্যবসায়ীগোষ্ঠী এস আলমের নিয়ন্ত্রণে। অন্যদিকে, আরেকটি বড় বেসরকারি ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে অন্য একটি প্রভাবশালী গ্রুপের হাতে ছিল। এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে-আইনটি কি নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীর কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছে? অনেকে বলছেন, এটি কেবল আইনি কাঠামো নয়, বরং একটি ‘পলিসি সিগন্যাল’-যা বলে দেয়, ক্ষমতার পালাবদল হলেও প্রভাবশালীরা শেষ পর্যন্ত ফিরে আসতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-এই ধারার বিরুদ্ধে ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেই। তারা আনুষ্ঠানিকভাবে এই ধারা বাতিলের অনুরোধ জানিয়েছিল। কিন্তু সেই মতামত উপেক্ষা করা হয়েছে। এখানেই তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন।
অর্থনীতিবিদরা খুব পরিষ্কার ভাষায় কথা বলছেন। তাদের মতে, এই আইন বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করবে। যারা আগে অর্থ পাচার করেছে, তারা এখন সেই অর্থেরই একটি অংশ দিয়ে আবার ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে। একজন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ বলেছেন, ‘এটি অপরাধীদের পুরস্কৃত করার একটি কাঠামো তৈরি করছে।’
এই বক্তব্যের পেছনে যুক্তি আছে। কারণ, যদি কেউ হাজার কোটি টাকা বের করে নেয় এবং পরে তার একটি ছোট অংশ দিয়ে আবার মালিক হয়, তাহলে সেটি কি শাস্তি, নাকি প্রণোদনা?
দুর্নীতিবিরোধী সংস্থার শীর্ষ পর্যায় থেকেও এসেছে তীব্র সমালোচনা। টিআইবি’র মতে, এটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। এতে ব্যাংক খাতের লুটেরাদের পুনর্বাসন করা হচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি তারা তুলেছেন-এই শর্তগুলো কি বাস্তবে পূরণ করা সম্ভব? যারা আগে নিয়ম মানেনি, তারা এখন কি হঠাৎ করে সুশাসনের মডেল হয়ে যাবে? এ প্রশ্নের উত্তর এখনো কেউ দেয়নি।
ব্যাংকিং খাতের মূল ভিত্তি হলো আস্থা। মানুষ বিশ্বাস করে বলেই ব্যাংকে টাকা রাখে। কিন্তু এই আইনের পর সেই আস্থায় বড় ধাক্কা লেগেছে। গত এক বছরে মানুষ কিছুটা স্বস্তি ফিরে পেয়েছিল। মনে হয়েছিল, খাতটি সংস্কারের পথে যাচ্ছে। কিন্তু এখন আবার অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যদি বিতর্কিত মালিকরা ফিরে আসে, তাহলে কি আমানত নিরাপদ থাকবে? এই প্রশ্নের উত্তর কেউ নিশ্চিতভাবে দিতে পারছে না।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ‘ব্যাংক রান’। অর্থাৎ, মানুষ আতঙ্কিত হয়ে একসঙ্গে টাকা তুলে নিতে শুরু করতে পারে। এটি ঘটলে শুধু একটি ব্যাংক নয়, পুরো আর্থিক ব্যবস্থা ধসে পড়তে পারে। ইতিহাসে এমন উদাহরণ অনেক আছে। তাই এই ঝুঁকিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।
ইসলামী ব্যাংক ইস্যু : সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু
বর্তমান বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দেশের অন্যতম বড় বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড। এই ব্যাংককে ঘিরে সম্প্রতি যা ঘটেছে, তা উদ্বেগজনক।
একদিকে লুটেরা এস আলমের পক্ষের সমর্থকদের শোডাউন। অন্যদিকে আমানতকারীদের পাল্টা কর্মসূচি। এটি কেবল একটি ব্যাংকের ইস্যু নয়। এটি পুরো খাতের ভবিষ্যতের ইঙ্গিত।
রাজধানীতে বড় আকারের শোডাউন হয়েছে। এতে অংশ নিয়েছেন কথিত সাবেক কর্মচারী ও সমর্থকরা। তাদের দাবি-পুরোনো বোর্ড ফিরিয়ে দিতে হবে। চাকরি পুনর্বহাল করতে হবে। কিন্তু এখানে প্রশ্ন উঠছে-এই কর্মসূচি কি স্বতঃস্ফূর্ত, নাকি সংগঠিত? অনেকের দাবি, বাইরে থেকে লোক এনে এই সমাবেশ করা হয়েছে। যদি তা সত্যি হয়, তাহলে এটি একটি বিপজ্জনক প্রবণতা।
অন্যদিকে, আমানতকারীরা স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন। তারা বলছেন, ‘লুটেরাদের আমরা ফিরতে দেব না।’ তাদের দাবি-অভিযুক্তদের গ্রেফতার করতে হবে। পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনতে হবে। বিতর্কিত ধারা বাতিল করতে হবে। এই প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে- সাধারণ মানুষ বিষয়টি কতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।
এস আলমের দখলকৃত ব্যাংকগুলোতে নিয়োগ নিয়ে যে অভিযোগ এসেছে, সেটিও গুরুতর। বলা হচ্ছে, নিয়ম না মেনে হাজার হাজার লোক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। অনেকেই অযোগ্য ছিলেন। এমনকি জাল সনদের অভিযোগও রয়েছে। এদের নামেও ঋণ নেওয়া হয়েছে। এটি শুধু অনিয়ম নয়। এটি একটি সুসংগঠিত আর্থিক অপরাধের চিত্র। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই ব্যাংকগুলো থেকে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা বের করা হয়েছে। এই পরিমাণ অর্থ দেশের অর্থনীতির জন্য বিশাল। এটি শুধু একটি ব্যাংকের সমস্যা নয়। এটি জাতীয় অর্থনীতির সংকট।
নতুন আইনের বাস্তবতা : শর্ত বনাম সক্ষমতা
আইনে অনেক শর্ত দেওয়া হয়েছে। যেমন-মূলধন জোগান, দায় পরিশোধ, সুশাসন নিশ্চিত করা। কাগজে-কলমে এগুলো ভালো শোনায়। কিন্তু বাস্তবে কি সম্ভব? যারা আগে এসব মানেনি, তারা এখন কীভাবে মানবে? এখানেই আইনের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। সরকার একদিকে বলছে, তারা সুশাসন নিশ্চিত করতে চায়। অন্যদিকে এমন একটি আইন করছে, যা বিতর্কিত। এই দ্বিমুখী বার্তা বাজারে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। নীতির ধারাবাহিকতা না থাকলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যায়।
বিশ্বব্যাপী ব্যাংক রেজল্যুশন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক দেশ কঠোর নীতি অনুসরণ করে। সেখানে দায়ীদের শাস্তি দেওয়া হয়। মালিকানা বদলানো হয়। বাংলাদেশের নতুন আইন সেই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ-এ প্রশ্নও উঠছে।
এই পুরো ইস্যুতে একটি বিষয় স্পষ্ট-ব্যাংক খাত কেবল অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিকও। ক্ষমতার সঙ্গে ব্যাংকের সম্পর্ক গভীর। এই সম্পর্ক যদি নিয়ন্ত্রণে না রাখা যায়, তাহলে নীতি প্রভাবিত হয়। বর্তমান পরিস্থিতি সেই আশঙ্কাই বাড়াচ্ছে। এই আইন যদি চিহ্নিত ও প্রমাণিত লুটেরাদের পুনর্বাসনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তাহলে সংকট আরও গভীর হবে।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাত এখন একটি ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে। একদিকে সংস্কারের সুযোগ। অন্যদিকে পুরোনো ভুলে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি। ‘ব্যাংক রেজুল্যুশন আইন ২০২৬’ এই দুই পথের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে- দেশ কোন পথে যাবে? সংস্কারের পথে, নাকি সুবিধার পথে? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সরকারের নয়, পুরো জাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ডিইউজে।