ইবনে হাসান
পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে বিগত তিন বছরে সাত শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। প্রেমঘটিত কারণেই বেশিরভাগ আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে বলে খবরে উল্লেখ করা হয়েছে। খবরটি নিছক খবর নয়; বরং ভয়ঙ্কর ঘটনা। সাধারণত মেধাবীরাই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখার সুযোগ পান। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী পরিবার, সমাজ, জাতির জন্য নক্ষত্রতুল্য। অনেকটা পথ পেরিয়ে মেধার স্বাক্ষর রেখেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ মেলে। একবুক সোনালি স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে পা রাখেন একজন শিক্ষার্থী। সে স্বপ্ন তার একার নয়; তার সাথে জড়িয়ে থাকে পরিবার, সমাজ, দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ। প্রত্যাশা একটাই সকলের স্বপ্ন পূরণ করে সাফল্যের সোপানে আরোহন করে তার অবদানে সিক্ত করবে সবাইকে। কিন্তু স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষা ভেঙে চুরমার করে কেন এমন অঘটন ঘটে। কেন এসব লক্ষত্রের মর্মান্তিক পতন? দু’একটি ঘটনা হলে এতটা আতঙ্কের ব্যাপার হতো না। বিগত তিন বছরে ববির ৭ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা রীতিমতো উদ্বেগের ব্যাপার। এটা তো কেবল ববির ঘটনা। অন্যান্য বিবিতে কী ঘটছে তা জানা নেই। নানা ঘাত-প্রতিঘাত ঘটনা-দুর্ঘটনার কারণে যখন কেউ বেঁচে থাকা অর্থহীন মনে করে, চরমভাবে বেদনা ভারাক্রান্ত হয়ে জীবিত থাকাকে দুর্র্বহ বোঝা মনে করে, তখন অতি আবেগতাড়িত ও হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এক চরম মুহূর্তে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেন।
শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়, সারাদেশেই আত্মহত্যার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। পারিবারিক কলহ ও অশান্তিসহ নানা কারণেই এসব দুর্ঘটনা ঘটছে। তবে যে কারণেই ঘটুক তা কোনোক্রমেই কাক্সিক্ষত ও যৌক্তিক নয়। কেননা কোন নীতি-নৈতিকতা, আদর্শ ও আইনে এর অনুমোদন নেই। কোনো অবস্থাতেই একজন মানুষ আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। জীবনের মালিক তো সে নয়। জীবনের স্রষ্টা যিনি তিনিই এর মালিক। এটা তো একটা আমানত। সুতরাং আত্মহত্যা মানেই আমানতের খেয়ানত। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা বুঝার মতো শিক্ষা, পরিবেশ কিছুই নেই। যিনি জানেন ও বিশ্বাস করেন জীবন দেয়া ও নেয়ার মালিক একজন এবং তিনি হলেন মহানস্রষ্টা আল্লাহ। আমি আমার জীবনের যেহেতু স্রষ্টা ও মালিক নই সে কারণে জীবন রাখা না রাখার সিদ্ধান্তও আমি কোনো অবস্থাতেই নিতে পারি না। আসলে জীবন সম্পর্কে আমাদের সঠিক ধারণাই নেই বা থাকলেও জীবনকে অর্থবহ করার জন্য তা যথার্থ ও যথেষ্ট নয়। বর্তমান বস্তুবাদী ও ভোগবাদী সভ্যতা আমাদের এমনভাবে অষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে যে, জীবনের সত্যিকার অর্থ খোঁজার মতো অবকাশই নেই। ভোগের উপকরণ করায়ত্ত করতে অন্তহীন প্রতিযোগিতা, দ্বন্দ্ব ও সংঘাতে লিপ্ত হয়ে পড়ছে সবাই।
খবর ছিল ববিতে তিন বছরে ৭ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার অস্বাভাবিক ও অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যুর ঘটনা। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন আসলে অনেকটা শৃঙ্খলমুক্ত জীবন। এ সময় অবাধ স্বাধীনতার অবকাশ থাকে। জীবনকে যেভাবে ইচ্ছা গড়ে তোলার সুবর্ণ সুযোগ যেমন থাকে, তেমনি মুক্ত বিহঙ্গের মতো অবাধে বিচরণের দ্বারও থাকে উন্মুক্ত। কেউ এ মহাসুযোগ কাজে লাগিয়ে সাফল্যের স্বর্ণশিখরে আরাহণ করে, আবার কেউ ভুল পাথে হেঁটে ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে অন্ধকারে হারিয়ে যায়। অবশ্য একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, লেজুড়বৃত্তির নষ্ট ছাত্র-রাজনীতি শিক্ষাঙ্গনে ঘৃণ্য অভিশাপ। এটা মেনে নেয়া যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। একশ্রেণি ব্যস্ত মৌমাছির মতোই সুধা সংগ্রহ করে। অপরশ্রেণি প্রজাপতির মতো উড়ে ঘুরে অনর্থক সময় কাটায়। অপর এক শ্রেণি মুর্খের মতো ফুল থেকে বিষ সংগ্রহ করে জীবনটাকে বিষাক্ত করে ফেলে। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে কেউ যত্নের সাথে জীবন গড়ে। কেউ আবার ‘হারিয়ে যেতে নেই মানার’ পথ ধরে হারিয়ে যায় চিরতরে। এদের অবাধ অনৈতিক বিচরণে বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গন হয় কলুষিত। নানা অপকর্ম, অপরাধ ও অশালীন কর্মকাণ্ডের আখড়ায় পরিণত করে পাবিত্র অঙ্গনকে। ফলে খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, রাহাজানির ঘটনা ঘটে অবলীলায়। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরাই সমাজের সবচেয়ে সচেতন অংশ। তারাই তো জাতির ভবিষ্যৎ। যোগ্য মানবসম্পদ তৈরির কারখানা বিশ্ববিদ্যালয়। দুদিন পরই এখান থেকে বের হয়েই তারা দেশের সব ক্ষেত্রে সফল নেতৃত্ব দেবে। সুখী-সমৃদ্ধ ও মর্যাদাবান জাতি গড়বে। বিশ্ববিদ্যালয়ে হানাহানি, সংঘাত, সংঘর্ষ, অস্ত্রবাজি ও নোংরা রাজনীতি দেশের ভবিষ্যত অন্ধকারে আচ্ছন্ন করে। জাতি এমন অবস্থা দেখতে চায় না। এখানে জ্ঞানচর্চা ও সাধনা হবে, গবেষণা চলবে, এখান থেকে সৎ, সাহসী দেশগড়ার যোগ্য কারিগর বের হয়ে আসবে সেটাই তো প্রত্যাশা। বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে গিয়ে প্রেম প্রেম খেলায় মত্ত হবে, অস্ত্রবাজি করবে, মাদকের নেশায় হাবুডুব খাবে, ভুল পথে চলে হতাশার জালে বন্দী হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেবে এমনটা তো কাম্য নয়।
একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, আমাদের তরুণ শিক্ষার্থীরা আজ বিপথগামী হচ্ছে বর্তমান ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শযুক্ত নীতিহীন শিক্ষা ব্যবস্থার কারণে। ধর্মীয় শিক্ষাই মানুষকে সুমতি দান করে। জীবনকে জানা-বোঝার ও সত্যিকার সাফল্য অর্জনের তাগিদ দেয়। পরিবার থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ শিক্ষাঙ্গন পর্যন্ত যদি ধর্মীয় বিধানের অধ্যয়ন, চর্চা ও অনুশীলন থাকে তাহলে বিচ্যুতি ও বিভ্রান্তির শিকার হওয়ার আশঙ্কা খুব কমই থাকবে। চিন্তা-চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে স্বচ্ছতা সৃষ্টি হবে। পরিবার, সমাজ, দেশ ও জাতির প্রতি দায়িত্ববোধ জাগ্রত হবে। মানবতার বন্ধু ও দেশপ্রেমিক হবে। বর্তমানে চালু বহুমুখী শিক্ষার কারণে শিক্ষাঙ্গন থেকে নানা মত ও পথ, দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে শিক্ষার্থীরা বের হয়ে আসছে। অথচ বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য ও সংহতির প্রয়োজনে একমুখী শিক্ষার দরকার ছিল। যে শিক্ষায় বিভেদ বিভাজন সৃষ্টির কোনো উপাদানই থাকবে না। দুর্ভাগ্যবশত স্বাধীনতার এত বছর পরও আমরা এ ব্যাপারে এখনো কোনো ইতিবাচক পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ নিতে পারিনি। সুতরাং বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের প্রশ্ন তাই সোনার হরিণের মতোই। একটা জাতির মধ্যে এত ভিন্ন চরিত্র, মতপথ দৃষ্টিভঙ্গি, দ্বন্দ্ব, বিভেদ-বিভাজন সৃষ্টিকারী শিক্ষা গ্রহণ করে বেরিয়ে আসার পর জাতি তাদের কাছ থেকে কী প্রত্যাশা করতে পারে। অবশ্য সময় শেষ হয়ে যায়নি। অবিলম্বে প্রয়োজন একমুখী এমন শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা যেখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে দুর্নীতিবাজ স্বার্থান্বেষী সুবিধাভোগী, লুটেরা, দেশদ্রোহী বিশ্বাসঘাতক তৈরি হবে না। বরং জাতিকে উপহার দেবে সাচ্চা দেশপ্রেমিক। দেশ-জাতি ও মানুষের প্রয়োজন ও স্বার্থে আত্মত্যাগের মহৎ প্রেরণায় উজ্জীবিত তরুণ তাজাপ্রাণ। এজন্য সরকারকে বাস্তবমুখী উদ্যোগ নিতে হবে।
শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনার জন্য সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও বলিষ্ঠ উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে গেলে সফলতা অনিবার্য। মনে রাখতে হবে শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন ছাড়া অগ্রগতির বিকল্প কোনে পথ নেই। এটা যত দ্রুত হবে ততই মঙ্গল। অন্যথায় জাতির উন্নতি-অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির সকল পদক্ষেপ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক।