"আধিপত্যবাদ বিরোধী নাগরিক সমাজ" নামে একটি নতুন নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আজ সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এ উপলক্ষে আজ (১০ অগাস্ট) জাতীয় প্রেস ক্লাবে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়I অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ড. দিলারা চৌধুরী, প্রধান, আহ্বায়ক কমিটি — আধিপত্যবাদ বিরোধী নাগরিক সমাজ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ফাহিম মাশরুর।
অনুষ্ঠানের শুরুতে "আধিপত্যবাদ বিরোধী নাগরিক সমাজ"-এর পক্ষ থেকে এর সদস্য রুবি আমাতুল্লাহ এই নতুন প্ল্যাটফর্মের ঘোষণাপত্র পাঠ করেন এবং এর উদ্দেশ্য ও অঙ্গীকার সকলের কাছে তুলে ধরেন। ঘোষণাপত্রে বলা হয়, আধিপত্যবাদের ঝুঁকি সম্পর্কে জনগণ ও রাষ্ট্রকে সচেতন করা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সম্মিলিত প্রয়াস গড়ে তোলার লক্ষ্যেই এই প্ল্যাটফর্ম গঠিত হয়েছে।
এই নতুন প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. দিলারা চৌধুরী তাঁর বক্তব্যে বলেন, জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও পরিবর্তিত আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য তৈরির প্রয়োজনীয়তা থেকে এই প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়েছে। তিনি দেশের সকল শ্রেণি-পেশার নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানান — যাঁরা স্বাধীনতা, জাতীয় মর্যাদা, গণতান্ত্রিক আত্মশাসন এবং শান্তিপূর্ণ আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় বিশ্বাস করেন, তাঁরা যেন এই নাগরিক প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হন।
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে "নতুন বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ রাষ্ট্রে সার্বভৌমত্ব কৌশল" শীর্ষক একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বেশ কয়েকজন রাজনীতিবিদ, সংসদ সদস্য, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মী, সাবেক কূটনীতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক অংশ নেন। এই পর্বে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী।
আলোচনায় অংশ নেন শহিদুল আলম (আলোকচিত্রী ও মানবাধিকার কর্মী), মারদিয়া মমতাজ এমপি (বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী), শফিকুল আলম (সম্পাদক, দৈনিক ওয়াদা ও সাবেক প্রেস সচিব), তাজুল ইসলাম (সাবেক চিফ প্রসিকিউটর, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল), ব্যারিস্টার ফুয়াদ (এবি পার্টি), ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাসান নাসির (সাবেক সেনা কর্মকর্তা), ডেল এইচ খান (জনতার দল), দিদার ভূঁইয়া (রাষ্ট্র সংস্কার), রাজনীতিবিদ রিতা রহমান।
মানবাধিকার কর্মী শহিদুল আলম তাঁর বক্তব্যে বলেন, জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলন একদিকে যেমন স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা ও তাঁর দলের বিরুদ্ধে ছিল, অন্যদিকে তেমনি ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধেও ছিল। ভারত যদি শেখ হাসিনাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া থেকে বিরত না থাকে, তাহলে প্রমাণ হবে যে ভারত বাংলাদেশ সম্পর্কে তার আধিপত্যবাদী অবস্থান এখনো পরিবর্তন করেনি।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম তাঁর বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা না বাড়ালে সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। দেশে নিজস্ব ড্রোন তৈরির সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে এবং চিকেন নেক-কেন্দ্রিক সামরিক প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে হবে। তবে এর মূল উদ্দেশ্য নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কাউকে আক্রমণ করা নয়। তিনি জুলাই জাদুঘর থেকে ফেলানীর ভাস্কর্য সরিয়ে ফেলার সমালোচনা করেন।
দৈনিক ওয়াদার সম্পাদক ও সরকারের সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, দেশের বেশিরভাগ খাদ্যপণ্য ও জ্বালানি যদি দেশের বাইরে থেকে আমদানি করতে হয়, তাহলে দেশের সার্বভৌমত্ব সবসময় ঝুঁকিতে থাকবে।
রাজনীতিবিদ ব্যারিস্টার ফুয়াদ তাঁর বক্তব্যে বলেন, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যেভাবে বাংলার সম্পদ লুট করার জন্য সার্বভৌমত্ব ধ্বংস করেছিল, সেই ধারাবাহিকতায় লুটপাট ও অর্থনৈতিক বৈষম্য টিকিয়ে রাখার জন্য আধিপত্যবাদের রূপ পরিবর্তন হয়েছে, ধরন পরিবর্তন হয়নি। তিনি বলেন, চব্বিশ-পরবর্তী সময়ে আগের আধিপত্যবাদী শক্তিকে ফিরিয়ে আনার জন্য নতুন বয়ান তৈরি করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠান শেষে "আধিপত্যবাদ বিরোধী নাগরিক সমাজ" এর ৭ সদস্যের আহবায়ক কমিটিকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। আহ্বায়ক- রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও বিশ্লেষক প্রফেসর দিলারা চৌধুরী। এছাড়া সদস্য হিসেবে রয়েছেন মানবাধিকার ও সমাজকর্মী এবং গবেষক রুবি আমাতুল্লা, সাবেক সেনা কর্মকর্তা ব্রি জে মোহাম্মদ হাসান নাসির (অব),
উদ্যোক্তা ও সংগঠক ফাহিম মাসরুর, সাবেক কূটনীতিক সাকীব আলী, অবসর প্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা খান মুখলেছুর রহমান এবং এক্টিভিস্ট মিনহাজুল আবেদীন।