জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বালাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে, যে কোনো সময়, দেশের স্বার্থে যে কোনো বিষয়ে আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে রাজি আছি। কিন্তু জনগণের একটি সিঙ্গেল অধিকারকেও বিসর্জন দিতে হবে এমন কোনো আধিপত্যবাদের কাছে মাথা নত করবো না, এ মাথা সমুন্নত থাকবে। দরকার হলে ফাঁসির তক্তায় যাব, আয়নাঘরে যাব আল্লাহ যেটা নির্ধারণ করেছেন, সেখানে যাব। সবাই মিলে দেশের জন্য আমরা লড়ে যাব এবং বিজয় হবে, ইনশাআল্লাহ।
গতকাল মঙ্গলবার বেলা ১১টায় রাজধানীর সিরডাপ আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ওয়ান ইনিশিয়েটিভ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কর্তৃক ‘আজাদী সংগ্রামের পটভূমিতে জুলাই বিপ্লব ২০২৪’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন ও প্রকাশনা উৎসব অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
তিনি জাতির প্রতি প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে বলেন, আমরা কথা দিচ্ছি এই প্রিয় জাতির প্রয়োজনে আমাদের যতটুকু সামর্থ্য আছে, সবটুকু দিয়ে আমরা কাজ করে যাব। আমরা এখানে কোনো ক্ষান্ত দেব না, কোনো কম্প্রোমাইজ করব না।
তিনি আরও বলেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পার হতে চলল, অথচ মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা হলো না। শুনেছি, মাত্র স্বল্প সংখ্যক শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পান। বলা হয়, এত এত লক্ষ মানুষ মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন, তাহলে তাঁদের সঠিক রেকর্ড কেন থাকল না?
তিনি আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সামনে আনতে হবে; এটা সরকারের দায়িত্ব। আমি সরকারকে অনুরোধ করব আপনারা উদ্যোগ নিন, সঠিক ইতিহাসের সূচনা করুন। পরিবারগুলোকে স্বীকৃতি দিতে হবে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ২০২৪ সালের পরিবর্তনের আগে রাজনীতিবিদদের কণ্ঠে যে সুর ছিল, ৫ আগস্টের পর থেকে সেই সুর আস্তে আস্তে বদলে যাচ্ছে। ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর পর তা ব্যাপকভাবে বদলে গেছে। একটি বিশেষ রাজনৈতিক মহল নতুন ন্যারেটিভ দাঁড় করাচ্ছেন, বয়ান তৈরি করছেন।মীরে জামায়াত গণভোট প্রসঙ্গে বলেন, একটি গণতান্ত্রিক সমাজে জনগণের অভিপ্রায় সর্বোচ্চ মর্যাদা পায়। গণভোটে ৭০ ভাগ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে সরকারি দল তা মানবে না, তা হতে পারে না। মানতেই হবে। ইনশাআল্লাহ, মানতে বাধ্য করা হবে।
জুলাই ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য আমাদেরকে অনেক প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে। আমাদের সোজাসাপটা কথা জুলাই ভুলিয়ে দেওয়ার সকল অপচেষ্টা তছনছ করে দেওয়া হবে। জনগণ যে রায় দিয়েছে, সেটাই মানতে হবে। তার বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমরা জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে চাই না। কেউ করলে আমরা তা মানব না।
ফ্যাসিস্টদের বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এতগুলো মানুষ গুম হলেন, পঙ্গু হলেন, নির্যাতিত হলেন, মিথ্যা মামলার শিকার হলেন তাঁদের বিচার এখন স্থবির হয়ে পড়েছে। আগের সরকারের সময় যেটুকু গতি ছিল, সেটাও এখন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। খুনিদের অবশ্যই বিচার হতে হবে।
তিনি সরকারের প্রতি হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করে বলেন, জুলাই যোদ্ধাদের গায়ে হাত দেবেন না। যাঁদের কারণে আজ আপনি সরকারে, সেই জুলাই যোদ্ধাদের চোখগুলো কেড়ে নেবেন না, হাত-পা ভাঙবেন না, এক ফোঁটাও রক্ত ঝরাবেন না। যদি রক্ত ঝরান, এটি অবশ্যই চরম নিমকহারামি হবে। যাঁদের রক্ত, সাহসিকতা ও সংগ্রাম আজকের বাংলাদেশকে এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে, তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলবেন না, বলার চেষ্টা করবেন না।
ছাত্রশিবিরের ডকুফিল্ম প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ডা. শফিকুর রহমান
বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, নতুন কোনো ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হলে জনগণ আবারও প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে আয়োজিত ‘জুলাই জাগরণ ডকুফিল্ম প্রতিযোগিতা ২০২৬’-এর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। দুই বছর আগে সংঘটিত ঘটনাপ্রবাহ ইতিহাসে বিশেষভাবে স্থান করে নিয়েছে। শিশু থেকে তরুণ, সবাইকে এই ইতিহাস জানাতে হবে। প্রতীকী কবর ও স্মৃতি প্রদর্শনী ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, এসব আয়োজন মানুষকে আন্দোলনের আত্মত্যাগ উপলব্ধি করতে সহায়তা করবে। ডকুফিল্ম প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া তরুণরাই ভবিষ্যতে দেশ গঠনে নেতৃত্ব দেবে বলে তিনি আশা করেন। বিজয়ী ও অংশগ্রহণকারী সবার জন্য দোয়া করে তিনি তাদের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের সেক্রেটারি ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বাংলাদেশের মানুষ কোনো স্বৈরাচার বা দমনমূলক শাসন মেনে নেয় না। জুলাই আন্দোলনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছাত্র-জনতা গণভবনের দিকে অগ্রসর হয়েছিল পরিবর্তনের প্রত্যাশায়। সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠীর পরিবেশনা এবং ছাত্রশিবিরের ডকুফিল্ম প্রতিযোগিতা জুলাই আন্দোলনের স্মৃতিকে আরও মর্যাদাপূর্ণ করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, কেউ যদি নতুন করে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে, তবে জনগণ অতীতের মতোই প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। আহত ও শহীদ পরিবারের পাশে থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে তিনি সরকারকে অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানান।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনের কঠিন সময়েও জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা ভয়-ভীতি ও দমন-পীড়ন উপেক্ষা করে কর্মসূচি পালন করেছিলেন। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আজকের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি ধরে রাখতে এ ধরনের সাংস্কৃতিক আয়োজন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রিয় সভাপতি নূরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, এ প্রতিযোগিতার মূল উদ্দেশ্য ছিল সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা জুলাই আন্দোলনের দলিল, স্মৃতি ও তথ্য সংগ্রহ করে প্রামাণ্যচিত্রের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা। বিচারকদের মূল্যায়নের ভিত্তিতে সেরা ডকুফিল্মগুলো নির্বাচন করা হয়েছে।
সরকারকে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা প্রতিশোধের আগুনে জ্বলছি। তারপরেও আমাদের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করে যাচ্ছি। যদি প্রতিশোধ নিতে হয়, কোনো অপশক্তি তা ঠেকাতে পারবে না।”
অনুষ্ঠানে ডকুফিল্ম প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের নাম ঘোষণা এবং আগত অতিথিদের মাধ্যমে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। ডকুফিল্ম প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করে ‘গ্রামের চোখে জুলাই’ (মাহমুদ এইচ এম, নোয়াখালী) তাকে পুরস্কার হিসেবে ২ লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সনদ তুলে দেওয়া হয়। দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে ‘জুলাইয়ের ছিটেফোঁটা’ (গাজীপুর মহানগর), পুরস্কার ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। তৃতীয় স্থান লাভ করে ‘দ্রোহের জুলাই’ (নরসিংদী জেলা শাখা), পুরস্কার ১ লাখ টাকা। চতুর্থ স্থান অধিকার করে ‘বুলেটের বৃষ্টি পেরিয়ে’ (ঢাকা মহানগর পূর্ব), পুরস্কার ৫০ হাজার টাকা। পঞ্চম স্থান অর্জন করে ঞযব ঝরষবহঃ ঊপযড়, পুরস্কার ৩০ হাজার টাকা।
অনুষ্ঠানে শহীদ পরিবারের সদস্য, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।