প্রায় পাঁচ মিনিটের একটি ডকুমেন্টারি চলছে। তাতে রয়েছে ক্ষোভ, দ্রোহ, তথ্য, সাক্ষ্য, প্রত্যাশা, হতাশা, শঙ্কা এবং সতর্ক সংকেতও। বলা হচ্ছে ২০২৪ ইং সালের জুলাই মানুষ যে স্বপ্ন নিয়ে জুলাই বিপ্লব এনে দিয়েছে তার কতটুকু পেয়েছে ? একই দিনে দুইটা ভোট হলো একটা বাস্তবায়ন হয়ে সরকার গঠন হলো, বাকিটার কি হলো? ত্রয়োদশ নির্বাচনের আগে কোন রাজনৈতিক দলের নেতারা কে কি বলেছিল তাও বাজছে বার বার। এক দফার ঘোষক নাহিদ ইসলামের বক্তব্য প্রচার হচ্ছে বারংবার। মানুষ আসছে, যাচ্ছে, উপলদ্ধি করছে। ২০২৪ইং সালের জুলাইয়ে কি হয়েছিল, আজকে কি হচ্ছে এবং আগামি দিনে আবার কি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। দৃশ্যকল্পটি রাজধানীর মিন্টো রোডে জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতার বাস ভবনের সামনের খোলা মাঠে। চারদিক দিয়ে কাপড়ের বেড়ার মাঝখানে চলছে ‘জুলাই এখনো শেষ হয় নাই’ শিরোনামের প্রদর্শনী।

মিন্টোরোড দিয়ে রমনা পার্কের দিকে গেলেই হাতের বাম পাশে পড়বে একটি সাইনবোর্ড। সেখানে লেখা রয়েছে, জুলাই এখনো শেষ হয় নাই শিরোনামের আলোকচিত্র প্রদর্শনী। গেইটের দুই পাশে জুলাই বিপ্লবের নায়ক আবু সাঈদের ছবি দিয়ে লেখা রয়েছে ‘আমাদেরকে পারতেই হবে’। ভেতরে প্রবেশ করলেই চোখের সামনে ভাসবে জাতি হিসেবে গোলামি আর আজাদির দগদগে ইতিহাস। একনায়কতন্ত্র আর ফ্যাসিস্টের হাত বদল হলো পুরো সময়টা জুড়ে। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা এলো রাষ্ট্র বদলালো না জুলুমবাজ আইয়ুব খান ও ইয়াহিয়ার উত্থান হলো। ১৯৭১ দেশ স্বাধীন হলো রাষ্ট্র বদলালো না, এক নায়ক শেখ মুজিবুর রহমানের উত্থান হলো। ১৯৭৫ সালের একনায়ক শেখ মুজিবুর রহমানের পতন হলো। ১৯৯০ সালে গণঅভুত্থানে একনায়ক এরশাদের পতন হলো রাষ্ট্র বদলালো না। ২০০৯ সালে নতুন সরকার এলো। রাষ্ট্র বদলালো না। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার উত্থান হলো। ২০২৪ সালে জুলাই অভ্যুত্থান হলো ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতন হলো। আবার ফ্যাসিবাদ ? আজাদি অতঃপর স্বপ্ন ভঙ্গ।

প্রদর্শনীতে যারা আসছেন তারা দেখছেন জুলাইয়ের ইতিহাস। কেউ কেউ জুলাই নিয়ে চিঠি লিখছেন সংশ্লিষ্টদের কাছে। আলোক চিত্রে বিজয়ের মুহূর্তগুলো টানানো রয়েছে ফ্রেমবন্দী করে। শহীদদের নাম লেখা রয়েছে মানচিত্র আকারে। প্রতিকী চিঠি টানানো হয়েছে ক্যানভাসজুড়ে। কেউ বা জুলাই শহীদদের বার্তা পড়ছেন। পড়ছেন শহীদ আনসের চিঠি। ছিল পত্রিকার কাটিং। প্রদর্শনীর ভেতর হাঁটতে হাঁটতে পত্রিকার বোর্ডে চোখ আটকে যায় সিনিয়র সাংবাদিক হারুন অর রশিদ ওরফে হারুন ইবনে শাহাদাতের। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এখানে দেশের যে পত্রিকাগুলোর কাটিং দেওয়া হয়েছে; সেগুলো ২০২৪ সালের আগস্টের ৪ তারিখ পর্যন্ত ফ্যাসিস্টকে রক্ষার দায়িত্ব পালন করেছে। আর যেসব পত্রিকাগুলো বিপ্লবের পক্ষে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করেছে, সেই পত্রিকা কাটিং নাই। এটা আমার কাছে কষ্টের জায়গা। শেষ কথা হলো আমাদের পারতেই হবে। অনেকেই আসেন পরিবার পরিজনদের নিয়ে ইতিহাস দেখানোর জন্য।

গতকাল শুক্রবার জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম আসেন প্রদর্শনী দেখতে। সাথে ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, আমরা চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী পালন করছি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার ধারাবাহিক সংগ্রামের যে জায়গায় আমরা এসেছি, কোনো চক্রান্ত বা আধিপত্যবাদী ষড়যন্ত্র যেন আমাদের এ অগ্রযাত্রা রুখতে না পারে। আমাদের সামনের মঞ্জিলে পৌঁছতেই হবে, আমাদের সামনের সংগ্রামে অগ্রসর হতেই হবে, আমাদের পারতেই হবে।

এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, সত্যিকার অর্থেই জুলাই গণঅভ্যুত্থান শেষ হয়নি, পুরো চিত্র প্রদর্শনীতে সেটা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। পুরো বাংলাদেশের রাষ্ট্র প্রকল্প ১৯৪৭ সালের আজাদির লড়াই থেকে ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত বাংলাদেশ যে ঘাত-প্রতিঘাত, স্বৈরতন্ত্র, বাকশাল, ফ্যাসিবাদ সবকিছুকে অতিক্রম করে যে জুলাই গণঅভ্যুত্থান নতুন মুক্তি এনে দিল এই দেশের মানুষকে, জনগণকে, আমরা আলোকচিত্রের মাধ্যমে সেই জিনিসটাকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি।

তিনি বলেন, আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা এই চিত্র প্রদর্শনী থেকে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম আকাক্সক্ষা হচ্ছে রাষ্ট্র সংস্কার এবং যেটা আমরা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছি। সেই ‘হ্যাঁ’ ভোট আমাদের থেকে চুরি করে নিয়ে যাওয়া হলো, কেড়ে নিল এই সরকার। কিন্তু আমাদের যে অঙ্গীকার, জুলাইয়ের অঙ্গীকার হচ্ছে সংবিধান সংস্কার করা, রাষ্ট্র কাঠামোর আমল সংস্কার করা। তো সেই লড়াইটা এখন আসলে রয়ে গিয়েছে। আমাদের আজকের চিত্র প্রদর্শনীর বার্তাটা হচ্ছে এটাই যে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে আমরা যদি ধরে রাখতে চাই, তাহলে তার যে আকাক্সক্ষা, রাষ্ট্র কাঠামোর আমল সংস্কারের সেই লড়াইটা আমরা এখনো চালিয়ে যাচ্ছি।

বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, এই সরকার নির্বাচিত হয়েছে। তারা দুইটা ভোটে অংশগ্রহণ করেছে, কিন্তু একটা যদি কাঠামোগত সংস্কার না করা হয়, এই সরকারও স্বৈরাচারী হবে। তাদের ভেতর সেই প্রবণতা আছে। এই সরকারকে বলব, দ্রুত সময়ের মধ্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সকল দাবি যদি তারা বাস্তবায়ন না করে, তাদের পক্ষে দেশ পরিচালনা করা সম্ভব হবে না। নাহিদ ইসলাম বলেন, আমরা এটা আগেই বলেছি, এই কাঠামো, এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন হবে না যদি গোড়ায় আমরা পরিবর্তন না করি। মৌলিক পরিবর্তন না করি। এটা কোনো ব্যক্তি, প্রধানের, সরকার প্রধানের ব্যক্তিগত ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্র পরিচালিত হয় না।

তিনি বলেন, এবারে যে সরকারিভাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থান উদযাপন হলো, আপনারা দেখেছেন সারাদেশে সেটার কী পরিস্থিতি। ইতিহাস বিকৃতি থেকে শুরু করে দলীয়করণ এবং সবকিছুই সেখানে আপনারা দেখবেন। কোনো ধরনের সার্বজনীন বক্তব্য নাই, অন্তর্ভুক্তিমূলক যে বাংলাদেশ, জুলাই যে সকলের, সেই বার্তাটা তারা দিচ্ছে না। তারা সবকিছুকে দলীয়করণ করছে। স্থানীয় সরকার প্রশাসন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পদ-পদবী যেরকম দলীয়করণ করছে, একইভাবে ইতিহাসকে তারা দলীয়করণ করার চেষ্টা করছে। যেভাবে আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে দলীয়করণ করার চেষ্টা করেছে।

তিনি বলেন, জনগণের আস্থা যখন একটা সরকার হারায়, তখন তাদের টিকে থাকতে হয় ক্ষমতার দাপট এবং সন্ত্রাসের ওপর ভিত্তি করে। আর সেটা কিন্তু সেই চিত্র বিগত ১৬ বছরে যেরকম আমরা দেখেছি, এখন কিন্তু আমরা দেখছি এই সরকার সেটা শুরু করেছে। শুরু করেছে ক্যাম্পাসগুলোর মাধ্যমে। কারণ, যেহেতু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় ভূমিকা, আন্দোলনের দুর্গ ছিল এই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো। ফলে ছাত্রনেতাদের ওপর, নির্বাচিত ছাত্র সংসদ এবং ১১ দলের পক্ষে যেসব ছাত্রনেতারা রয়েছেন, ছাত্রশিবির, ছাত্রশক্তি থেকে শুরু করে জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষের বিভিন্ন শক্তিকে তারা ক্যাম্পাসে ঢুকতে দিচ্ছে না। তারা আক্রমণ করছে নির্বিচারে।

এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুম, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজিব ভূইয়া, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম, যুগ্ম মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) ডা. মাহমুদা আলম মিতু এমপি, যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন, জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমীর এডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য জাহিদুর রহমান প্রমুখ।