আজ ৮ আগস্ট বিকেলে রাজধানীর মগবাজারের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে সংস্কার না করে জ্বালানি খাতের বেসরকারিকরণ এবং নতুন নীতিমালা প্রণয়নের তীব্র সমালোচনা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার সরকারের এই উদ্যোগকে সংস্কার নয়, বরং জ্বালানি খাতকে হাতেগোনা কয়েকটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়ার লুটপাটের নতুন লাইসেন্স হিসেবে অভিহিত করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত জামায়াতে ইসলামীর প্রধান অভিযোগ ও উদ্বেগগুলোর মধ্যে রয়েছে জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত, পরিবহন ও বিপণন বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার সরকারি উদ্যোগ। দলটির মতে, এই ব্যবসায় গভীর সমুদ্রবন্দর, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং, বড় ট্যাংক টার্মিনাল, পাইপলাইন এবং বিপুল ব্যাংকিং সক্ষমতার প্রয়োজন হয়। ফলে চাইলেও সাধারণ বা মাঝারি কোনো প্রতিষ্ঠান এতে টিকতে পারবে না; বরং হাতেগোনা কয়েকটি বড় করপোরেট গোষ্ঠী বাজারে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করবে। এতে রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া ব্যবসা ভেঙে আরও বিপজ্জনক বেসরকারি সিন্ডিকেট বা একচেটিয়া ব্যবস্থা তৈরি হবে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনকে অদক্ষ ও লোকসানি প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিত্রিত করে বেসরকারিকরণের যে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে দলটি। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিপিসি ৩ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২ হাজার ৫০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। এর আগে বৈশ্বিক মন্দার কারণে ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে কিছু লোকসান হলেও, বর্তমান সংকটকে বিপিসির ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতা বলা ভুল; এটি মূলত বিশ্ববাজার ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার ফল।
গত ২৮ জুলাই অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর ২০২৬ মেয়াদের পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের সময়সীমা ৪২ দিন থেকে কমিয়ে মাত্র ১০ দিন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জামায়াতের অভিযোগ, এই হঠকারী সিদ্ধান্তের ফলে বড় আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীরা দরপত্রে অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে, যা পরবর্তীতে দরদাতা সংকট, চড়া মূল্য এবং নতুন সিন্ডিকেট তৈরিতে সহায়তা করবে।
বার্ষিক প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার জ্বালানি বাজার গুটিকয়েক গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে প্রতি লিটারে সামান্য অতিরিক্ত মুনাফাও বছরে হাজার কোটি টাকার লুটপাটে পরিণত হতে পারে। তাছাড়া জ্বালানি তেল কেবল সাধারণ কোনো পণ্য নয়; এটি কৃষি, বিদ্যুৎ, পরিবহন এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। জরুরি পরিস্থিতিতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো অলাভজনক বা দুর্গম এলাকায় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
পাশাপাশি জ্বালানি খাতের শ্রমিক সংগঠনের আইনি সুরক্ষা কমিয়ে দেওয়ার জন্যও জোরালো অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। বাংলাদেশ শ্রম আইনের ১৮৭ ধারা জ্বালানি খাতের শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের ক্ষেত্রে রহিত করার সুপারিশ করা হয়েছে বলে দাবি করে জামায়াত, যা শ্রমিকদের অধিকার হরণের শামিল।
জ্বালানি খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রক্ষায় সংবাদ সম্মেলনে কিছু সুনির্দিষ্ট দাবি পেশ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণন বেসরকারি খাতে উন্মুক্ত করার বর্তমান উদ্যোগ অবিলম্বে স্থগিত করা এবং খসড়া নীতিমালাসহ যাবতীয় নথিপত্র জনসমক্ষে প্রকাশ করে কমপক্ষে ৬০ দিন জনমত গ্রহণ করা। বেসরকারিকরণের পথ না বেছে সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটির অধীনে উন্মুক্ত শুনানির মাধ্যমে বিপিসির কাঠামোগত সংস্কারের দাবি জানানো হয়। এছাড়া বিপিসির বোর্ডে পেশাদার বিশেষজ্ঞ নিয়োগ, জ্বালানি ক্রয়ে ই-জিপি বাধ্যতামূলক করা, প্রতি তিন মাসে আমদানির মূল্য ও পরিমাণ প্রকাশ, ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপন ও কৌশলগত মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন এবং শ্রমিকদের আইনি সুরক্ষা খর্ব করার যাবতীয় সুপারিশ প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়।
প্রেস ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর আ ন ম শামছুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি ড. এএইচএম হামিদুর রহমাহন আযাদ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য জনাব মো. আব্দুর রব, অধ্যক্ষ মো. শাহাবুদ্দিন, ড. রেজাউল করিম, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য জাহিদুর রহমান, ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন এমপি, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য আতাউর রহমান সরকার, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী প্রচার সম্পাদক আব্দুস সাত্তার সুমন।
এটার এক লাইনে অতি সংক্ষিপ্ত সামারি দাও