ববি সংবাদদাতা: পড়ালেখার স্বাভাবিক পরিবেশকে পাশ কাটিয়ে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) যেন ক্রমেই হয়ে উঠছে সংঘর্ষের ময়দান। সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের বিরোধে জড়িয়ে পড়ছেন শিক্ষার্থীরা। বিভাগে বিভাগে ছড়িয়ে পড়ছে কোন্দল। ক্ষেত্রবিশেষে একাধিক বিভাগের শিক্ষার্থীরাও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছেন। গত এক মাসে ইতিহাস-বাংলা, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা-গণিত, আইন-সমাজবিজ্ঞান এবং সর্বশেষ অর্থনীতি-ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দুর্বলতার কারণে এসব ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। ফলে একের পর এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে। তাদের দাবি, জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার সর্বোচ্চ বাতিঘর হওয়ার কথা থাকলেও ধারাবাহিক সংঘর্ষের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়টি ক্রমেই শিক্ষার্থীদের কাছে অনিরাপদ হয়ে উঠছে।
গত ১৫ আগস্ট বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অর্থনীতি বিভাগের এক নারী শিক্ষার্থীকে উত্ত্যক্ত করার অভিযোগকে কেন্দ্র করে দুই বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দফায় দফায় মারামারির ঘটনা ঘটে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইংরেজি বিভাগের ১২তম ব্যাচের মুসা নামের এক শিক্ষার্থী অর্থনীতি বিভাগের ১৫তম ব্যাচের এক নারী শিক্ষার্থীকে নবীনবরণ অনুষ্ঠানের দিন প্রেমের প্রস্তাব দেন। পরবর্তীতে ওই প্রস্তাবে সাড়া না দেওয়ায় তাকে আটকে রাখার অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি অর্থনীতি বিভাগের ১৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা তাদের সিনিয়রদের জানালে তারা ঘটনাস্থলে আসেন।
এ সময় উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে ইংরেজি বিভাগের ওই শিক্ষার্থীকে মারধরের ঘটনা ঘটে। এতে তাঁর মুখ দিয়ে রক্ত পড়তে দেখা যায়। পরে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং দুই বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দুই দফায় মারামারি হয়।
এর আগে ১৯ জুলাই ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলার দিন পূর্ববিরোধের জেরে আইন ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
জানা যায়, আইন বিভাগের শিক্ষার্থীদের একটি মিটিংয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সাইদ এবং আইন বিভাগের শিক্ষার্থী শাহ্ তাকবীর আহমেদ সিয়ামের মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও কলার ধরাধরির ঘটনা ঘটে। পরে বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি গেটের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে আইন বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সালেমি ও সিয়ামের মধ্যেও দ্বন্দ্ব হয়। একপর্যায়ে সালেমি সিয়ামের কানে কামড় দিয়ে আহত করার অভিযোগ ওঠে।
এর আগে ১৮ জুলাই গণিত বিভাগের একদল শিক্ষার্থীর হামলায় গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী এবং ক্যাম্পাস সাংবাদিকসহ উভয় পক্ষের অন্তত ১৫ জন শিক্ষার্থী আহত হওয়ার অভিযোগ ওঠে।
ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাবের ফেসবুক পেজে গণিত বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের এক শিক্ষার্থীর ‘ব্যক্তিগত ভিডিও’ পোস্ট করাকে কেন্দ্র করে ঘটনার সূত্রপাত। অভিযোগ রয়েছে, এ ঘটনার জেরে ওই শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আবু উবাইদা এবং সাংবাদিক আব্দুল কাদের জীবনকে নভোথিয়েটারের সামনে ডেকে নেন। সেখানে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে ওই শিক্ষার্থী ও তাঁর সঙ্গে থাকা কয়েকজন উবাইদা ও কাদেরকে মারধর করেন।
খবর পেয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগসহ অন্যান্য বিভাগের শিক্ষার্থীরা ঘটনাস্থলে এগিয়ে গেলে উভয় পক্ষের মধ্যে পুনরায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় ঘটনার ভিডিও ধারণ করতে গেলে ‘আজকালের কণ্ঠ’-এর সাংবাদিক আব্দুল্লাহ আল মামুন এবং ‘দৈনিক আমার দেশ’-এর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি মাসুদ রানার মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া এবং তাঁদের ওপর হামলার অভিযোগও ওঠে।
এদিকে গত ১৫ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয়-২৪ হলের দ্বিতীয় তলার করিডরে হল প্রভোস্টের সামনে মব সৃষ্টির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় বাংলা বিভাগের মাস্টার্সে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী মো. ইনামুল হক লিখিত অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মো. মোশাররফ হোসেন, ছাত্রদলের সাংস্কৃতিক সম্পাদক অংকন, সাকিবসহ ইতিহাস বিভাগের ২০-২৫ জন শিক্ষার্থীকে অভিযুক্ত করেন।
অন্যদিকে, ভুক্তভোগী হিসেবে দাবি করা ইনামুল হকের বিরুদ্ধেও ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী সাকিবকে মেসের একটি মিটিংয়ে মারধরের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায়ও প্রক্টরের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, গত এক মাসে সংঘর্ষ ও মারামারির একাধিক ঘটনা ঘটলেও কোনো ঘটনারই দৃশ্যমান বিচার বা কার্যকর শাস্তি হয়নি। ফলে অপরাধীদের মধ্যে এক ধরনের দায়মুক্তির প্রবণতা তৈরি হচ্ছে এবং বিভাগে বিভাগে বিরোধ আরও বাড়ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রিপন মন্ডল বলেন,“এক মাসের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে একের পর এক সংঘর্ষের ঘটনা সত্যিই উদ্বেগজনক। ছোটখাটো বিষয়ও এখন সহজেই বড় ধরনের বিরোধ ও সংঘর্ষে রূপ নিচ্ছে। সবচেয়ে হতাশার বিষয় হলো, এসব ঘটনার পরও যদি দৃশ্যমান ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়বে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া এবং ক্যাম্পাসে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত করা।”
বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগ সম্পর্কে দায়িত্বরত প্রক্টর মেহেদী হাসান সোহাগ বলেন,"বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী, প্রত্যেকটি ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে। তদন্ত শেষ হলে প্রতিবেদনটি শৃঙ্খলা কমিটিতে উপস্থাপন করা হবে এবং পরবর্তীতে সিন্ডিকেট থেকে সিদ্ধান্ত আসবে। সকল শিক্ষার্থীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা আমাদের ঈমানি দায়িত্ব। আমরা সে অনুযায়ী কাজ করছি।
বিশৃঙ্খলা প্রশমনে তদন্ত কমিটি গঠনের পাশাপাশি অন্য কোনো পরিকল্পনা আছে কি না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, “যারা এ ধরনের উচ্ছৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি করছে, তাদের নিয়ে গবেষণা করা প্রয়োজন। মারামারির সময় তারা এডিকটেড থাকে কি না, সেটিও দেখা দরকার। পাশাপাশি সব শিক্ষার্থীকে নিয়ে সেমিনারের মাধ্যমে এ ধরনের উচ্ছৃঙ্খল পরিবেশ থেকে বেরিয়ে আসতে কাউন্সেলিং করার পরিকল্পনা রয়েছে প্রশাসনের।”