শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরাতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পক্ষে গোপন তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একদল শিক্ষক। দেশব্যাপী গোপন তৎপরতা ও নৈরাজ্যের প্রস্তুতির মূলে প্রধান ভূমিকা পালনের অভিযোগ উঠেছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবর রহমানের বিরুদ্ধে। জানা যায়, পুরো বিষয়টি সমন্বয় করা হয় মেসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রামে খোলা সিক্রেট গ্রুপের মাধ্যমে।
গত মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) রাত ৯টা ২১ মিনিটে অনলাইন গণমাধ্যম এশিয়া পোস্টে "শেখ হাসিনাকে ফেরাতে ২২ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ শিক্ষকের গোপন তৎপরতা" শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবদেনে এসব তথ্য জানা যায়।
সূত্র জানায়, পুরো বিষয়টি সমন্বয় করা হয় মেসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রামে খোলা "বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ" নামের একটি সিক্রেট গ্রুপের মাধ্যমে। এই দেশব্যাপী গোপন তৎপরতা ও নৈরাজ্যের প্রস্তুতির মূল সমন্বয়ে প্রধান ভূমিকা পালন করছেন ড. মো. মাহবুবর রহমান। তাঁর সঙ্গে সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. এম অহিদুজ্জামান। এছাড়া ড. মাহবুবর রহমান এডমিন হিসেবে উক্ত সিক্রেট গ্রুপে বার্তা প্রদানের বিষয়টি দেখা গেছে।
গ্রুপের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, টেলিগ্রাম ও এর বাইরে বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা নিয়মিত বিভিন্ন বৈঠকে মিলিত হচ্ছেন। এমন একটি বৈঠক আহ্বানের স্ক্রিনশটে দেখা যায়, সাধারণ সম্পাদক ড. মাহবুবর রহমান কমিটির পক্ষ থেকে একটি বার্তা দিয়েছেন। সেখানে তিনি যা লিখেছেন তা তুলে ধরা হলো:
‘শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষকমন্ডলী,
আজ রাত ১০টায় সিস্টেম আপডেটের স্বার্থে এই গ্রুপের সংযুক্ত সকল শিক্ষক মত বিনিময় সভায় মিলিত হবো। আপনাদের কিছু সময়ের জন্য সংযুক্ত হওয়ার বিশেষভাবে অনুরোধ করছি। আমরা আশাবাদী রাত ১০টায় আর কোন........) আজ রাত ১০টায় এই গ্রুপের সংযুক্ত সকল শিক্ষক ২য় মত বিনিময় সভায় মিলিত হবো। সকলের অংশগ্রহণে আলোচনা প্রানবন্ত হবে আশা করি। নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকর্মীগণকে অবহিত ও সংযুক্ত হওয়ার পন্থা জানানোর জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করছি।
জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু
অধ্যাপক ড. এম অহিদুজ্জামান
সভাপতি ও.....
সূত্র জানায়, গোপন কার্যক্রম পরিচালনার ওই গ্রুপের ২৮ পৃষ্ঠার একটি স্ক্রিনশট পাওয়া গেছে, যেখানে ৪০৩ জন শিক্ষকের নাম শনাক্ত করা গেছে। এর বাইরে ২১ জনের শুধু মোবাইল নম্বর এবং বেশ কিছু সাংকেতিক নাম ব্যবহার করতে দেখা গেছে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিয়মিত একাধিক বৈঠকের মাধ্যমে তারা আওয়ামী লীগের পক্ষে সংবাদ শেয়ার ও পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে সাজাচ্ছেন তাদের পরিকল্পনা।এছাড়া গ্রুপে ৫ আগস্ট পরবর্তী শিক্ষক নিগ্রহ ও আওয়ামী লীগ সমর্থিত নানা প্রতিবেদন শেয়ার করতে দেখা গেছে।
পরবর্তীতে সফল ট্রায়াল শেষে সভাপতি অধ্যাপক ড. এম অহিদুজ্জামান ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবর রহমান যৌথবার্তায় লিখেন, সুপ্রিয় সহকর্মীবৃন্দ, শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন। আপনাদের সার্বিক সহযোগিতায় সিস্টেম আপডেট করে গত রাতে আমরা সফলভাবে ট্রায়াল শেষ করেছি। আমাদের মাহেন্দ্রক্ষণ সন্নিকটে। সে লক্ষ্যে প্রোগ্রামের গাইডলাইনসহ অন্যান্য বিষয়াদি অবহিত করার স্বার্থে আজ বিকেল ৩:০০ মিনিটে কিছু সময়ের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ এক সভায় মিলিত হব। টেলিগ্রাম গ্রুপে সংযুক্ত সকল সম্মানিত শিক্ষককমণ্ডলীকে উক্ত সময়ে যুক্ত হওয়ার জন্য বিনীত অনুরোধ করছি।
টেলিগ্রাম গ্রুপটিতে চিহ্নিত হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষকদের মধ্যে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯২ জন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬৮ জন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৪ জন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪২ জন (যার মধ্যে আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর গুলি চালানোর অভিযোগে অভিযুক্ত শিক্ষক ইলিয়াস হোসেনও রয়েছেন), নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৮ জন এবং মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৯ জন শিক্ষক।
এছাড়া সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২ জন, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১ জন, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১ জন, কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ জন, শের-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ জন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯ জন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭ জন (যার মধ্যে শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার আসামি ড. মশিউর রহমান অন্তর্ভুক্ত), পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬ জন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ জন শিক্ষক যুক্ত আছেন।
অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ জন, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ জন, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ জন, মেহেরপুর মুজিবনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ জন, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ জন, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ জন, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ জন এবং স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের ৩ জন নেতা এই তালিকায় রয়েছেন।
গণমাধ্যম সূত্রে পাওয়া টেলিগ্রাম গ্রুপে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হলেন-
ড. মাহবুবর রহমান, কে এম শরফ উদ্দিন, শারমিন সুলতানা, প্রফেসর ড. আলমগীর , প্রফেসর ড. সেলিনা নাসরিন, ড. মো. মাহবুব, ড. মো. মিজানুর রহমান, নাসিরুল হক, মো. শফিকুল ইসলাম, ড. আজরান আজমী, প্রফেসর ড. মো. মিজানুর রহমান, জয়, ড. তহিদুর রহমান, অঞ্জন কুমার রায়, প্রফেসর মো. সাজ্জাদ হোসেন, আলতাফ রাসেল, মিনহাজুল হক, ড. মো. আসাদুজ্জামান, আফরোজা সাথী, প্রফেসর ড. মাহবুব শুভ। এছাড়া অনেকে সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহারে এসব গোপন তৎপরতা চালাচ্ছে বলে জানা গেছে।
টেলিগ্রাম গ্রুপ পরিচালনার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা গবেষণা বিভাগের অধ্যাপক ড. এম অহিদুজ্জামান বলেন, এখানে শেখ হাসিনা বা কোনো রাজনৈতিক দলের বিষয় নয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শত শত শিক্ষকের সব ধরনের অধিকার খর্ব করে রাখা হয়েছে। আমাদের বয়কট করে রাখা হয়েছে, পজিশন কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শিক্ষক, প্রগতিশীলতা রক্ষা করি, তাদের নিজেদের রক্ষা করতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছি। প্রয়োজন হলে আমরা আন্দোলন করব, রাস্তায় নামব, আমরা জীবন দেব।
এ বিষয়ে ড. মো. মাহবুবর রহমান বলেন, এটি সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক সংগঠন যার সদস্য হওয়ার একটিই শর্ত মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অনুগত থাকা। সরকারকে লিখিতভাবে অবহিত করেই সংগঠনটি আত্মপ্রকাশ করে। এটি দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরিচ্যুত, বরখাস্ত, বয়কট বা অ্যাকাডেমিক শাস্তির মুখে পড়া শত শত শিক্ষকের সাংবিধানিক অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং ক্যাম্পাসে একটি নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার অনুকূল অ্যাকাডেমিক পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এটাকে রাজনৈতিক রং দেয়ার কোন সুযোগ নেই।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান বলেন, “আগের প্রশাসন কোন যুক্তিতে তাদের বরখাস্ত করেছিল বা পরবর্তীতে কী বিবেচনায় সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছে, তার ব্যাখ্যা আমি দিতে পারব না। তবে নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো রাজনৈতিক দল বা তাদের আদর্শিক অনুসারীরা যদি নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করে এবং তার প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে অবশ্যই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
প্রসঙ্গত, অভিযুক্ত ড. মাহবুবুর রহমান বিগত আওয়ামী শাসনামলে প্রক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ক্ষমতার অপব্যবহার, ভিন্ন মত দমনে ‘জঙ্গি নাটক’ সাজানো, নিরীহ শিক্ষার্থীদের ধরে নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে ক্রসফায়ারের চক্রান্ত ও গুমের হুমকি প্রদান, ৭০ জন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দায়ের এবং পর্দা করার কারণে নারী শিক্ষার্থীদের হয়রানিসহ নানা অপকর্ম ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের জন্য অভিযুক্ত।