• আহত তিন শতাধিক, হাসপাতালে ঢুকেও নির্মমতা
  • মাথায় হেলমেট, হাতে লাঠি, সংঘর্ষের নেতৃত্বে যুবদল নেতা নয়ন
  • তিন ক্যাম্পাসে থমথমে অবস্থা

স্টাফ রিপোর্টার ও জবি সংবাদদাতা

জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসের অনুষ্ঠানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর, অস্থায়ী আবাসন প্রকল্পের কাজ দ্রুত শুরু, মেডিকেল সেন্টারের উন্নয়নের দাবিতে প্ল্যাকার্ড প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে জকসু, শিবির, ইনকিলাব মঞ্চ ও ছাত্রশক্তিসহ কয়েকটি সংগঠনের নেতাকর্মী এবং শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করেছে ছাত্রদল। শাখা ছাত্রদলের হামলায় জকসু ভিপি-জিএস ও সাংবাদিকসহ দুই শতাধিক আহত হয়েছেন। অনেকে চিকিৎসা নিতে গেলে হাসপাতালে গেলে সেখানেও হামলা করে ছাত্রদল। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে এ ঘটনা ঘটে। হামলায় জকসু সহসভাপতি (ভিপি) মো. রিয়াজুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক (জিএস) আব্দুল আলিম আরিফ, এজিএস মাসুদ রানা ও আইনবিষয়ক সম্পাদক ফারুক, জবি ছাত্রশক্তির সভাপতি শাহিন মিয়া ও সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস শেখ গুরুতর আহত হয়েছেন।

এছাড়াও গতকাল ঢাকা কলেজ ও ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা ক্যাম্পাসেও ছাত্রদল ও যুবদলের শসস্ত্র ক্যাডাররা শিবিরের ওপর হামলা চালিয়েছে। এতে সাধারণ শিক্ষার্থীসহ অন্তত শতাধিক শিবির নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। তিনটি ক্যাম্পাসে দিনভর দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এসময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে দেখা যায়। তিন ক্যাম্পাসে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।

জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজ দ্রুত সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর, কেরানীগঞ্জে অস্থায়ী আবাসন প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়ন, মেডিকেল সেন্টারের সুযোগ-সুবিধা ও চিকিৎসাসেবার উন্নয়নসহ শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবি প্ল্যাকার্ডে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ইউজিসি চেয়ারম্যান বিশ্ববিদ্যালয়ে আসায় তার সামনে এসব দাবি তুলে ধরতে জকসুর প্রতিনিধিরা প্ল্যাকার্ড নিয়ে মিলনায়তনে প্রবেশের চেষ্টা করেন। তবে প্ল্যাকার্ড নিয়ে কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে প্রবেশের সময় তাদের বাধা দেওয়া হয়। একপর্যায়ে জকসুর প্রতিনিধিদের সঙ্গে ছাত্রদলের নেতাকর্মী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের সংশ্লিষ্টদের কথা-কাটাকাটি ও ধস্তাধস্তি হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে প্ল্যাকার্ড কেড়ে নিয়ে ছিঁড়ে ফেলা হয় এবং হামলা চালানো হয়। জকসু ভিপি রিয়াজুল ইসলামসহ নেতারা অডিটোরিয়ামে প্রবেশ করতে গেলে ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল তাদের বাধা দেন। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক ড. কে এ এম রিফাত হাসান পরিস্থিতি সামাল দিতে গেলে তাকেও ধাক্কা দেন ছাত্রদল আহ্বায়ক। এ সময় হিমেলকে বলতে শোনা যায়, ‘এই, দরজা বন্ধ কর। দ্রুত গেট আটকা।’ পরে মিলনায়তনের গেট আটকে দেওয়া হয়। অডিটরিয়ামের সামনেই ছিঁড়ে ফেলা প্ল্যাকার্ড হাতে বিক্ষোভ করেছেন জকসু নেতারা।

জকসু নেতাদের অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবিগুলো ইউজিসি চেয়ারম্যানের সামনে তুলে ধরতেই তারা শান্তিপূর্ণভাবে প্ল্যাকার্ড প্রদর্শনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু প্রক্টর অফিস ও ছাত্রদল যোগসাজশ করে তাদের সেই কর্মসূচিতে বাধা দেয়, প্ল্যাকার্ড ছিঁড়ে ফেলে এবং সরাসরি হামলা চালায়। জকসু এজিএস মাসুদ রানা বলেন, ‘আমরা শান্তিপূর্নভাবে দাবি নিয়ে প্রতিবাদ করি। প্লাকার্ড হাতে অবস্থান নেই কিন্তু ছাত্রদল প্রথম দফায় মেহেদী হিমেলের নেতৃত্বে হামলা করা হয়। ২য় দফায় ছাত্রদল মিছিল নিয়ে ভিসির সামনে আমাদের আক্রমণ করে। এ বিষয়ে জকসু ভিপি রিয়াজুল ইসলাম বলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রদলের হামলা হয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবির পোস্টার ছিঁড়ে ফেলেছে প্রক্টর অফিস ও ছাত্রদলের ক্যাডাররা।

হাসপাতালেও আহত নেতাদের ওপর হামলা

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) ছাত্রশিবির ও ছাত্রশক্তির নেতাকর্মী এবং জকসু নেতাদের ওপর হামলার পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহতদের ওপর হামলা চালিয়েছে ছাত্রদল। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জকসু) নেতারা অভিযোগ করেছেন, বিকালে পুরান ঢাকার জনসন রোডে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল ইন্সটিটিউট হাসপাতালে ভর্তি শিবির ও ছাত্রশক্তির নেতাদের ওপর আকস্মিক হামলা চালান ছাত্রদল নেতারা। তারা অভিযোগ করেন, প্রশাসনের সামনে হামলা হলেও ছাত্রদলের বিরুদ্ধে তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। সূত্রাপুর থানার ওসি মতিউর রহমান বলেন, ‘দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির-ছাত্রদল সংঘর্ষ করেছে। এরপর ন্যাশনাল হাসপাতালে আহতরা ভর্তি হয়েছেন। সেখানেও আরেকবার ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ঘটনা ঘটেছে। আমাদের পুলিশ পরিস্থিতি শান্ত করছে।’

ঢাকা কলেজে সংঘর্ষ

পোস্টার লাগানোকে কেন্দ্র করে ঢাকা কলেজে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা চালিয়েছে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এ ঘটনায় ৩০-৪০ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। একজনের মাথায় গুরুতর আঘাত লেগেছে। অন্যদিকে, ছাত্রদল অভিযোগ করেছে, শিবির পরিকল্পিতভাবে তাদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালিয়েছে। দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির ঢাকা কলেজ শাখার উদ্যোগে ‘জুলাই অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক আলোচনা সভা এবং জুলাইয়ে আহতদের সম্মাননা অনুষ্ঠান উপলক্ষে নেতাকর্মীরা কলেজের গ্যালারি-০২-এর সামনে পোস্টার লাগাচ্ছিলেন। অনুষ্ঠানটি দুপুর ২টায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। এ সময় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায় বলে অভিযোগ করেছে ছাত্রশিবির। ছাত্রশিবিরের দাবি, হামলায় মাথায় গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তি ঢাকা কলেজ শাখা ছাত্রশিবিরের অর্থ সম্পাদক আব্দুল মালেক। তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ধানমন্ডির পপুলার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রথম দফার ঘটনার পর দুপুর দেড়টার দিকে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ঢাকা কলেজের আবাসিক হল এলাকায় অবস্থান নেন। পরে অডিটোরিয়ামে কিছুক্ষণ অবস্থান করার প্রায় ২০ মিনিট পর কলেজের মূল ফটকের সামনে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আবারও সংঘর্ষে জড়ান। এ সময় ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের লাঠিসোঁটা হাতে ঢাকা কলেজের মূল ফটকের সামনে অবস্থান করতে দেখা যায়। এছাড়া, সাংবাদিকদের কোনো ধরনের ভিডিও ফুটেজ ধারণ করতে দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ ওঠে।

ঢাকা আলিয়া, সংঘর্ষ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা কলেজে চলমান সংঘর্ষের মধ্যেই এবার উত্তপ্ত পরিস্থিতি ঢাকা আলিয়া মাদরাসা ক্যাম্পাস। সেখানে ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর পুরান ঢাকায় আলিয়া মাদরাসা ক্যাম্পাসে এ ঘটনা ঘটে। হল দখলকে কেন্দ্র করে এ সংঘর্ষের সূত্রপাত বলে জানিয়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। সরেজমিনে দেখা যায়, ছাত্রদলের অনেকের মাথায় হেলমেট। এদিকে সংঘর্ষ থামাতে ব্যস্ত পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা।

মাথায় হেলমেট, হাতে লাঠি, সংঘর্ষের নেতৃত্বে যুবদল নেতা নয়ন

এদিকে, পরনে সাদা পাঞ্জাবি, মাথায় হেলমেট আর হাতে পাইপ-এভাবেই ঢাকা আলিয়া মাদরাসা এলাকায় ছাত্রশিবিরের ওপর হামলার সময় মাঠে দেখা গেছে যুবদল নেতা রবিউল ইসলাম নয়নকে। এক স্থান থেকে আরেক স্থানে দৌড়াতে এবং ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে অবস্থান নিতে দেখা যায় তাকে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, সংঘর্ষের সময় তিনি ছাত্রদলের পক্ষে সংঘর্ষে নেতৃত্ব দেন। রবিউল ইসলাম নয়ন যুবদলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সাবেক সদস্য সচিব। সংঘর্ষের সময় তাকে সাদা পাঞ্জাবি পরিহিত অবস্থায় মাথায় হেলমেট ও হাতে লাঠি বা জিআই পাইপ নিয়ে ঘটনাস্থলে অবস্থান করতে দেখা যায়। এ সময় তিনি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছুটে গিয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে অবস্থান নেন। সংঘর্ষের একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গেও বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন নয়ন। ঘটনাস্থলে পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তাকে বলতে শোনা যায়, “তারা (শিবির) গুলি করছে, আপনারা কিছু করছেন না কেন?” প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সংঘর্ষের সময় উভয় পক্ষ পরস্পরকে ধাওয়া ও পাল্টা ধাওয়া করে। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সন্ধ্যা সাতটার দিকে আলিয়া মাদরাসা সংলগ্ন এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

এ ঘটনায় রাতে বিক্ষোভ মিছিল করার কথা জানিয়েছে ছাত্র শিবিরি। রাত ৮টায় বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেট থেকে মিছিল শুরু হয়ে ৯ টায় কেন্দ্রীয় অফিসে সাংবাদিক সম্মেলন করার কথা।

সাংবাদিকদের ওপর হামলা

জবিতে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার আহত সাংবাদিকরা হলেন, বাংলা ট্রিবিউন এর জবি প্রতিনিধি সোহায়েল আহমেদ, আজকালের খবর এর কায়েস মাহমুদ, আমার সংবাদ এর আব্দুল্লাহ আল মামুন, ঢাকা স্ট্রীমের রজব আল ফাহিম, প্রাইম বাংলাদেশ এর মোহন খন্দকারসহ আরও কয়েকজন।

শিক্ষার্থীদের উদ্ধার করতে গিয়ে অবরুদ্ধ শিক্ষক

আহত শিক্ষার্থীদের দেখতে যান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বিলাল হোসাই, অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক। পরবর্তীতে হাসপাতালের ভেতরে ছাত্রদল হামলা চালায়ে তাঁরা অবরুদ্ধ হন, কিচেনে অব¯’ান নেন। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদেরকে পিছনের গেট দিয়ে বের হয়ে যেতে বললে শিক্ষার্থীদেরকে রেখে তারা হাসপাতাল থেকে বের হতে অস্বীকৃতি জানান।

বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত কমিটি গঠন

এদিকে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোস্তফা হাসানকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।