স্টাফ রিপোর্টার, গাজীপুরঃ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বীর শহীদদের জাতীয় জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রেরণার উৎস উল্লেখ করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. এ এস এম আমানুল্লাহ বলেছেন, তাঁদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশে স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে নতুন গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার সূচনা হয়েছে। শহীদদের রক্তের ঋণ কখনো শোধ করা সম্ভব নয়,তবে তাঁদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং তাঁদের স্মৃতিকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে অম্লান রাখাই জাতির অন্যতম পবিত্র দায়িত্ব।
বুধবার (৫ আগস্ট) নেপালের রাজধানী কাঠমন্ডুতে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ উপলক্ষে বাংলাদেশ দূতাবাস আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক)-এর মহাসচিব রাষ্ট্রদূত গোলাম সারওয়ার জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রফেসর ড. এ এস এম আমানুল্লাহর ভূমিকার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের উত্তাল সময়ে ড. আমানুল্লাহ ছিলেন অন্যতম দূরদর্শী চিন্তানায়ক। তাঁর সাহসী নেতৃত্ব, কৌশলগত দিকনির্দেশনা এবং গণমাধ্যমে নির্ভীক অবস্থান আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান জাতির ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের তাৎপর্য তুলে ধরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি বলেন, এটি কেবল রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আন্দোলন ছিল না, বরং বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার ঐতিহাসিক অঙ্গীকার। এই আন্দোলনে আত্মদানকারী শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং তাঁদের পরিবারের কল্যাণে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ইতোমধ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছে।
তিনি জানান, শহীদ পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে প্রতিটি শহীদ পরিবারকে ৮ লাখ টাকা করে অনুদান প্রদান করা হয়েছে। একই সঙ্গে শহীদ পরিবারের শিক্ষার্থীদের সম্পূর্ণ টিউশন ফি মওকুফ করা হয়েছে, যাতে তারা আর্থিক সংকটে শিক্ষা থেকে ঝরে না পড়ে। এছাড়া অসচ্ছল, প্রান্তিক ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের সহায়তায় চালু করা হয়েছে ‘জুলাই শহীদ স্মৃতি শিক্ষাবৃত্তি-২০২৫’।
স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ প্রসঙ্গে প্রফেসর ড. এ এস এম আমানুল্লাহ বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসে শহীদ শিক্ষার্থীদের নামফলক সংবলিত স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি অধিভুক্ত কলেজগুলোর পাঠাগার, আবাসিক হল ও গুরুত্বপূর্ণ ভবন শহীদদের নামে উৎসর্গ করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাঁদের আত্মত্যাগ থেকে অনুপ্রেরণা গ্রহণ করতে পারে।
৩৬ দিনের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিচারণ করে তিনি শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং আহত, দৃষ্টিশক্তি হারানো ও স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণকারী যোদ্ধাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও সমবেদনা জানান। তিনি বলেন, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, শ্রমজীবী মানুষ, চিকিৎসক, নারী সমাজ, প্রবাসী বাংলাদেশিসহ সর্বস্তরের মানুষের ঐক্যবদ্ধ অংশগ্রহণেই এই গণঅভ্যুত্থান সফল হয়েছে।
আন্দোলনের অর্জনকে ধরে রাখার আহ্বান জানিয়ে ভিসি বলেন, ইতিহাসে বহু গণঅভ্যুত্থান অভ্যন্তরীণ বিভক্তির কারণে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। তাই মতপার্থক্য ভুলে জাতীয় ঐক্য, সমতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।
উচ্চশিক্ষার সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ কর্মসূচির আওতায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য ভীতিমুক্ত, আনন্দময় ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা পরিবেশ গড়ে তুলতে কাজ করছে। দেশব্যাপী সাংস্কৃতিক উৎসব, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশে বিভিন্ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পরিবর্তিত বিশ্ব বাস্তবতায় শিক্ষার্থীদের শুধু সনদনির্ভর শিক্ষা নয়, তথ্যপ্রযুক্তি, বিদেশি ভাষা, ফ্রিল্যান্সিং, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং অন্যান্য দক্ষতাভিত্তিক শর্ট ও সার্টিফিকেট কোর্সের মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম পুনর্গঠন করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত মো. শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক দপ্তরের পরিচালক মোহাম্মদ শফিউল করিম, সার্কের মহাসচিব রাষ্ট্রদূত গোলাম সারওয়ার, দূতাবাসের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কূটনৈতিক মিশনের সদস্য এবং নেপালে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে জুলাই-আগস্টের শহীদদের আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।