নাটোরের লালপুর ও বাগাতিপাড়া উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ডের সুপারভাইজার ও তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে দুই উপজেলার নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) অফিসে হামলা, সরকারি কর্মকর্তা ও দৈনিক সংগ্রামের বাগাতিপাড়া উপজেলা প্রতিনিধি ফজলুর রহমানসহ ৭ জন সাংবাদিককে মারধরের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মামলা দায়ের হয়নি। তাছাড়া সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা সরকারি সম্পদ নষ্ট ও কর্মকর্তাদের লাঞ্ছিত করলেও মামলা করার কোনো তোড়জোড় নেই দুই উপজেলার ইউএনওদের।
এদিকে বৃহস্পতিবার দুপুরে সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের হামলার প্রতিবাদ এবং হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন জেলার গণমাধ্যমকর্মীরা। এ সময় লালপুর ও বাগাতিপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে প্রত্যাহারের আল্টিমেটাম দেন তারা। অন্যথায় বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সাংবাদিক নেতারা।
গত বুধবার দুপুরে লালপুর ও বাগাতিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে ফ্যামিলি কার্ড শুমারির তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলে স্থানীয় ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীরা ইউএনওর কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেন। এ সময় মিছিল নিয়ে বিক্ষুব্ধরা বাগাতিপাড়া উপজেলার নির্বাহী অফিসারের রুমের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। এ সময় বেশ কিছু ফুলের টব ও ইউএনও অফিসের গেট ভাঙচুর করা হয় এবং কৃষি কর্মকর্তা ও এক অফিস সহকারীকে মারপিট করেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। এ সময় ভিডিও করতে গেলে দৈনিক সংগ্রামের প্রতিনিধি সাংবাদিক ফজলুর রহমান ও চ্যানেল এস-এর খাদেমুল ইসলামসহ চার সাংবাদিককে মারপিট করা হয় এবং চ্যানেল ওয়ান ও স্টার নিউজ টিভির সাংবাদিককে লাইভ সম্প্রচারে বাধা দেওয়া হয়।
এছাড়া একই দাবিতে লালপুর উপজেলায় ইউএনও অফিস ঘেরাও করে সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙচুর এবং সমাজসেবা কর্মকর্তা মাসুদ রানা ও আইসিটি কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমানকে লাঞ্ছিত করেন সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা। এ সময় ভিডিও ধারণ করতে গেলে মানবজমিন-এর সাংবাদিক রাশেদুল এবং এনটিভি অনলাইনের সজিবুল ইসলাম হৃদয়কে মারপিট করেন তারা।
এসব ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও দুই উপজেলার ইউএনও কোনো আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি।এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে দুই উপজেলার ইউএনও কেউ ফোন রিসিভ করেননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, সরকারি সম্পদ নষ্ট হলেও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
তবে লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম এবং বাগাতিপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল হান্নান বলেন, এখন পর্যন্ত কেউ থানায় অভিযোগ করেনি। তবে অভিযোগ পেলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে দুই উপজেলায় সাংবাদিকদের মারপিটের ঘটনায় বৃহস্পতিবার দুপুর আড়াইটার দিকে নাটোর পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে ঘণ্টাব্যাপী এই মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে জেলার বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকরা অংশ নেন।
এ সময় মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, পুলিশের দায়িত্ব ছিল সাংবাদিক এবং উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা দেওয়া। কিন্তু তারা সেই দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। পুলিশের উপস্থিতিতেই ইউএনওকে অবরুদ্ধ করা এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
নির্যাতিত সংগ্রাম-এর প্রতিনিধি ফজলুর রহমান ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, বুধবার দুপুরে আমরা ইউএনও অফিসে সংবাদ সংগ্রহ করছিলাম। এ সময় বাগাতিপাড়া উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সোহেল রানা ও পৌর ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোতালেব হোসেন পান্নার নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী আমাদের ওপর হামলা চালায়। তারা ক্যামেরা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে ফুটেজ মুছে ফেলে এবং আমাদের শারীরিকভাবে নির্যাতন করে।
নাটোর ইউনাইটেড প্রেসক্লাবের সভাপতি নাসিম উদ্দিন নাসিম বলেন, মব সৃষ্টি করে সাংবাদিকদের মারধর করা হয়েছে। ইউএনওর কলার ধরে ঝাঁকানো হয়েছে। ঘটনার পর নির্যাতিত সাংবাদিকরা থানায় অভিযোগ দিতে গেলেও পুলিশ তা দলীয় নেতাকর্মীদের জানিয়ে দেন। তিনি ৭২ ঘণ্টার মধ্যে হামলাকারীদের গ্রেপ্তার এবং দুই থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা না হলে কঠোর আন্দোলনের ঘোষণা দেন।