রেজাউল করিম রাসেল, কুমিল্লা অফিস
প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে এলএনজি টার্মিনাল ( FSRU) থেকে এলএনজি সরবরাহে বিঘœ ঘটায় জাতীয় পর্যায়ে প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ কমে গেছে। ফলে বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিডিসিএল) প্রায় পাঁচ লাখ গ্রাহক গ্যাস সংকটে পড়েছেন। কুমিল্লাসহ কোম্পানিটির আওতাধীন ছয় জেলার আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প গ্রাহকদের ভোগান্তি চরমে উঠেছে।
বিজিডিসিএলের জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এলএনজি টার্মিনাল থেকে সরবরাহ বিঘিœত হওয়ায় জাতীয় পর্যায়ে প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ অনাকাক্সিক্ষত পর্যায়ে হ্রাস পেয়েছে। ফলে সারা দেশের মতো বিজিডিসিএলের বিতরণ এলাকাতেও গ্যাসের স্বল্পচাপ বিরাজ করছে। কোম্পানিটির বিতরণ এলাকার মধ্যে রয়েছে কুমিল্লা, নোয়াখালী, চাঁদপুর, ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা।
গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় বিশেষ করে সকাল ও সন্ধ্যার রান্নার সময়ে নগরীর বিভিন্ন বাসাবাড়িতে চরম দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। অনেক বাসায় চুলা জ্বললেও গ্যাসের চাপ এত কম যে স্বাভাবিকভাবে রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। কোথাও কোথাও দীর্ঘ সময় গ্যাস না থাকায় বাধ্য হয়ে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করছেন গ্রাহকরা।
নগরীর কাপ্তানবাজার এলাকার বাসিন্দা মজিবুর রহমান বলেন, “গ্যাসের বিল নিয়মিত দিচ্ছি, কিন্তু রান্নার সময় গ্যাস পাই না। বাধ্য হয়ে সিলিন্ডার কিনে রান্না করতে হচ্ছে। একই জ্বালানির জন্য দুইবার টাকা দিতে হচ্ছে। এভাবে আর কতদিন চলবে?”
নগরীর গৃহিণী মাহবুবা আক্তার বলেন, “সকালে বাচ্চাদের নাশতা তৈরির সময় গ্যাস থাকে না। সন্ধ্যায় রান্নার সময়ও একই অবস্থা। অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। শেষ পর্যন্ত সিলিন্ডার ব্যবহার করতে হচ্ছে।”
একই এলাকার স্কুলশিক্ষক খাইরুল আলম বলেন, “বেতন বাড়ছে না, কিন্তু সংসারের খরচ বাড়ছে। তার মধ্যে গ্যাসের বিল দেওয়ার পরও সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। মাসে এই বাড়তি খরচ মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য অনেক বড় চাপ।”
এদিকে গ্যাস সংকটের প্রভাবে বেড়েছে সিলিন্ডার ও লাকড়ির চাহিদা। আগে যেসব পরিবার গ্যাসের চুলায় রান্না করতেন, তাদের অনেকেই এখন এলপিজি সিলিন্ডার অথবা লাকড়ির চুলা ব্যবহার করছেন। এতে বিকল্প জ্বালানির বাজারেও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
নগরীর চকবাজার এলাকার লাকড়ি ক্রেতা কাশেম বলেন, “গ্যাস না থাকায় লাকড়ি কিনতে হচ্ছে। আগে এত লাকড়ি কিনতে হতো না। এখন নিয়মিত কিনতে হচ্ছে। এতে রান্নার খরচ অনেক বেড়ে গেছে।”
সিলিন্ডার ব্যবসায়ী তোফায়েল আহমেদ বলেন, “গ্যাস সংকটের কারণে সিলিন্ডারের চাহিদা আগের তুলনায় বেড়েছে। নগরীর অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে এলপিজির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।”
শুধু আবাসিক গ্রাহকরাই নন, গ্যাস সংকটে ভোগান্তিতে পড়েছেন হোটেল-রেস্তোরাঁ, বেকারি, ছোট-বড় শিল্পকারখানা ও বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিকরাও। পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে গিয়ে বেড়ে যাচ্ছে পরিচালন ব্যয়।
নগরীর এক হোটেল ব্যবসায়ী আব্দুর রহিম বলেন, “গ্যাসের ওপর আমাদের ব্যবসা অনেকটাই নির্ভরশীল। গ্যাসের চাপ না থাকলে রান্না করা যায় না। তখন সিলিন্ডার ব্যবহার করতে হয়। এতে খাবারের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে।”
গ্রাহকদের অভিযোগ, নিয়মিত গ্যাসের বিল পরিশোধ করেও প্রয়োজনের সময় গ্যাস না পাওয়ায় তাদের বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। গ্যাস সংকটের কারণে সংসারের ব্যয় বাড়ছে, পাশাপাশি কর্মজীবী মানুষের সময়ও নষ্ট হচ্ছে।
একজন ভুক্তভোগী বলেন, “আমরা গ্যাস চাই, কোনো অনুদান চাই না। নিয়মিত বিল দিই, তাই নিয়মিত গ্যাস পাওয়ার অধিকারও আমাদের আছে। দিনের পর দিন এভাবে গ্যাস না পেয়ে বিকল্প জ্বালানি কিনে সংসার চালানো সম্ভব নয়।”
এদিকে বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে গ্রাহকদের সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে এলএনজি টার্মিনাল (ঋঝজট) থেকে এলএনজি সরবরাহ বিঘিœত হওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গ্রাহকদের সহযোগিতা কামনা করেছে কর্তৃপক্ষ।
গ্রাহকরা দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি সংকটের সুযোগে সিলিন্ডার ও লাকড়ির অতিরিক্ত দাম নেওয়া হচ্ছে কি না, তা তদারকির দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, গ্যাস সংকট এখন আর শুধু রান্নাঘরের সমস্যা নয়; এটি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বাখরাবাদ গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রয়োজনে গ্রাহকরা হটলাইন ১৬৫২৩ নম্বরে যোগাযোগ করতে পারবেন।