সুপ্রিয় পাঠক আপনাদের নিশ্চয় মনে আছে, শহীদ আনাসের কথা। যার লেখা চিঠি পড়ে হাজার মানুষের চোখের অশ্রু ঝরেছে। বুক ফাটা কান্নায় ভিজেছে দুই গাল। যে চিঠি মানুষকে জুলাই আন্দোলনের প্রতি আরো মমত্ববোধের দীক্ষা দিয়েছে। ২০২৪ ইং সালে আন্দোলনের সময়গুলোতে লেখা আরও কিছু কথা প্রকাশ করেছেন শহীদ আনাসের মা সানজিদা খান দীপ্তি। তিনি যখন শহীদ আনাসের খাতা থেকে কথাগুলো পড়ছিলেন তখন নীরবে শোনা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। শহীদ জননীর মুখে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ আলোড়িত করে মানুষের হৃদয়।

পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ার দীননাথ সেন রোডে ঢুকলে এখনো চোখ আটকে যাবে যে কারো। দেওয়ালে দেওয়ালে আঁকা গ্রাফিতি। লেখা ‘শহীদ আনাস সড়ক’। জুলাই শহীদ আনাস মানুষের হৃদয়জুড়ে। পরিবার আনাসের শূন্যতায় কাঁদছে। সন্তানের রক্তমাখা সাদা শার্ট, হাতে লেখা ডায়েরি ও ব্রেসলেট পরম যত্নে আগলে রেখেছেন মা। শহীদ আনাসের মা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা কোনো দল বা রাজনীতি বুঝি না। আমাদের সন্তানদের রক্তের ওপর দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। জামায়াত ও এনসিপি বিরোধী দল হয়েছে। আমাদের বিশ্বাস ছিল, অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়নসহ শহীদ ও আহতদের সঠিক তালিকা করে স্বীকৃতি দিয়ে যাবে। তারা কিছু পদক্ষেপ নিলেও পুরোপুরি শেষ করতে পারেনি। আমরা এখনো আশায় বুক বেঁধে আছি নতুন সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়নসহ অসমাপ্ত কাজ করবে। তবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা হবে কিনা বুঝতেছি না।

আন্দোলনকালীন সময়ে ছেলের আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আকুতির স্মৃতিচারণ করে শহীদ আনাসের মা বলেন, ৩৬ জুলাইয়ের দিনগুলোতে বাইরে যখন গোলাগুলী হচ্ছিল, মানুষ মারা হচ্ছিল; ওই সময় আনাসের পড়ায় মন বসতো না। স্বভাবতই আমি তাকে তাগাদা দিতাম, পড়তে বাসো। ওই সময়টাতে আনাস তারা খাতায় তৎকালীন কিছু ঘটনা লিখে যায়। সেখানে লেখা ছিলÑশত শত শিশু-কিশোর, তরুণ যুব সমাজ নিহত হয়েছে। হাসপাতালগুলোর মর্গে রয়েছে লাশের বন্যা। এছাড়া আহত হয়েছে হাজার হাজার মানুষ। একটি জীবনের মূল্য কোটি কোটি টাকার চেয়ে বেশি। আমাদের পূর্ব প্রজন্ম কি এসব দেখার জন্য এদেশকে স্বাধীন করেছিল? এদেশটা আমার আমাদের। দেশটা আমাদের গর্ব দেশটা আমাদের অধিকার। মনে রাখতে হবে বাঁচলে, মাথা উঁচু করে বাঁচবো। তবুও অন্যায়ের সাথে আপস করবো না। স্লোগান একটাই হবে আমার দেশ আমার অঙ্গিকার। মানবো না কোন অন্যায় অবিচার।

এর আগে ভাইরাল হওয়া চিঠিতে আনাস লিখেছিল, মা, আমি মিছিলে যাচ্ছি। আর নিজেকে আটকে রাখতে পারছি না। সরি আব্বু, আপনার নিষেধ অমান্য করেই বের হলাম।’ এমন হৃদয়বিদারক চিঠি লিখে ঘর ছাড়ে দশম শ্রেণির ছাত্র শাহরিয়ার খান আনাস। যে জুলাই বিপ্লবের অংশ হতে চেয়েছিল প্রাণ দিয়ে। তার সেই ছোট্ট বার্তা কাঁদিয়েছিল হাজারো মানুষকে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের কয়েক ঘণ্টা আগে, রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় পুলিশের গুলীতে নিহত হয় আনাস। একটি বুলেট তার বুকের বাম পাশে ঢুকে পিঠ চিরে বেরিয়ে যায়। মিছিলে অংশ নিয়েই শহীদ হয় সে। সেদিন সকালের নীরবতা ভেঙে উঠে গোসল করে আনাস। তারপর মা-বাবার জন্য একটি চিঠি লিখে পড়ার টেবিলে রেখে নিঃশব্দে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।

চিঠিতে আনাস লিখেছিল, সরি আব্বুজান। তোমার কথা অমান্য করে বের হলাম। স্বার্থপরের মতো ঘরে বসে থাকতে পারলাম না। আমাদের ভাইরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কাফনের কাপড় মাথায় বেঁধে রাজপথে নেমে সংগ্রাম করে যাচ্ছে। অকাতরে নিজেদের জীবন বিসর্জন দিচ্ছে। একটি প্রতিবন্ধী কিশোর, ৭ বছরের বাচ্চা, ল্যাংড়া মানুষ যদি সংগ্রামে নামতে পারে, তাহলে আমি কেন বসে থাকব ঘরে।’ চিঠিতে আনাস আরও লিখেছিল, ‘একদিন তো মরতে হবেই। তাই মৃত্যুর ভয় করে স্বার্থপরের মতো ঘরে বসে না থেকে সংগ্রামে নেমে গুলী খেয়ে বীরের মতো মৃত্যু অধিক শ্রেষ্ঠ। যে অন্যের জন্য নিজের জীবনকে বিলিয়ে দেয় সে-ই প্রকৃত মানুষ। আমি যদি বেঁচে না ফিরি, তবে কষ্ট না পেয়ে গর্বিত হয়ো। জীবনের প্রতিটি ভুলের জন্য ক্ষমা চাই। আনাস।’

আনাসের মা বলেন, ঐদিন (৫ আগস্ট ২০২৪ইং) আন্দোলনকারীদের লং মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচি ছিল। আমি এবং আমার স্বামী আশেপাশে আনাসকে খুঁজি কিন্তু পাচ্ছিলাম না। দুপুর ১টা ২০ মিনিটের দিকে অপরিচিত একটি নাম্বার থেকে আমার ফোনে কল আসে। সে বলে যে আপনাদের কেউ কি আন্দোলনে গিয়েছে ? আমি বলি আমার ছেলে গিয়েছে। সে আমাকে দ্রুত স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতে বলে। সে আরও বলে আপনার ছেলের ফোনে আপনার নাম্বার সেইভ করা ছিল। সেখানে গিয়ে দেখি আমার ছেলে রক্তাক্ত অবস্থায় স্টেচারে পড়ে আছে। আমি আনাসকে জড়িয়ে ধরি। তখন সৌরভ নামের একটি ছেলে যে তাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল সে আমাদেরকে জানায়, আন্দোলন চলাকালে চানখারপুলে পুলিশ টার্গেট করে গুলী করেছিল।

৫ আগস্ট আনুমানিক সকাল ১০টার দিকে হাজার হাজার আন্দোলনকারী শহীদ মিনারে যাওয়ার পথে চানখারপুল এলাকায় পুলিশের বাধার মুখে পড়ে। পুলিশ তখন সাউন্ড গ্রেনেড, রাবার বুলেট ও গুলী ছুড়তে থাকে। তারা তখন জীবন বাঁচাতে নবাব কাটারা গলিসহ বিভিন্ন গলির মুখে আশ্রয় নেয়। আনাস নবাবকাটারা গলিতে আশ্রয় নিলে সেখানে একজন পুলিশ আনাসকে লক্ষ্য করে গুলী করে। একটি গুলী আনাসের বুকের বা পাশে লাগে। সঙ্গে সঙ্গে আনাস মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। গুলীবিদ্ধ আনাসকে তার সঙ্গের আন্দোলনকারীরা রিক্সায় করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। তখন রাব্বীসহ আরও অনেকে এই হত্যার দৃশ্যের ভিডিও মোবাইলে ধারণ করে। সে ভিডিও সংবলিত পেনড্রাইভ, আনাসের চিঠি, রক্তাক্ত জামা-কাপড়, মৃত্যুর সনদ ও জরুরি বিভাগের টিকেট ইতোমধ্যে ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়া হয়েছে।