সার্জিও গোরের ঢাকা সফর

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত এবং ভারতে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোরের সদ্যসমাপ্ত ঢাকা সফরকে কেবল একটি নিয়মিত বা আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সফর হিসেবে দেখছেন না আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। এমন এক সময়ে তাঁর এই সফর অনুষ্ঠিত হয়েছে, যখন বাংলাদেশে তৈরি হয়েছে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা, গতিশীল হয়েছে আঞ্চলিক ভূরাজনীতি এবং চীন-যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিমুখী কৌশলগত প্রতিযোগিতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। ফলে এই সফরটি দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভবিষ্যৎ কূটনীতির জন্যও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা বহন করছে। ঢাকায় অবস্থানকালে সার্জিও গোর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে মিলিত হন। এছাড়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও তাঁর ধারাবাহিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত অংশীদারত্ব, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, সামুদ্রিক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ দমন, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলভিত্তিক স্বার্থ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

সূত্রে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে একটি স্থিতিশীল, অর্থনৈতিকভাবে সামর্থ্যবান এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখার বার্তা দেওয়া হলেও বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাস্তবিক চ্যালেঞ্জ এখনো বিদ্যমান। প্রস্তাবিত সামরিক সহযোগিতা এবং আকসা ও সোফিয়া’র মতো নিরাপত্তা সংক্রান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনার ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণে মার্কিন শুল্কনীতি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিই মূল নিয়ন্ত্রক। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাব সম্পর্কে সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী জানান, কেবল কূটনৈতিক সফর দিয়ে বড় ধরনের বিনিয়োগ আসবে না। কারণ আমেরিকান বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগের লাভ এবং স্থিতিশীল ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করতেই অগ্রাধিকার দেন। সাবেক রাষ্ট্রদূত সাকিব আলী দৈনিক সংগ্রামকে আরও বলেন, সার্জিও গোরের এই ঢাকা সফর কেবল কোনো প্রথাগত সফর নয়। আগামী দিনে উভয় দেশের সম্পর্ক কতটা নিবিড় হবে, তা নির্ভর করবে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সুবিধা সম্প্রসারণ, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাক ও অন্যান্য পণ্যের অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার, জলবায়ু অর্থায়ন, উচ্চপ্রযুক্তি হস্তান্তর এবং মানবাধিকার ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির সংবেদনশীলতার যথাযথ ব্যবস্থাপনার ওপর।

এদিকে বাংলাদেশ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অন্যতম বড় তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হলেও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের বৈচিত্র্যায়ন এখন সময়ের দাবি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানান, সার্জিও গোরের সফরের ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্রের ২৫টি শীর্ষ সামরিক ও বেসামরিক শিল্প প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল ঢাকায় আসছে। তাঁরা বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যৌথ বৈঠকে অংশ নিয়ে অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তি ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ সম্ভাব্যতা পর্যালোচনা করবেন।

যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূতের এই সফর নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পক্ষ থেকে একটি স্পষ্ট বক্তব্য প্রদান করা হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, “বাংলাদেশ সর্বদাই একটি ভারসাম্যপূর্ণ, স্বাধীন এবং জাতীয় স্বার্থনির্ভর পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে আসছে। মার্কিন বিশেষ দূতের সঙ্গে আলোচনায় বাণিজ্য বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক সাহায্য এবং সমুদ্রসীমার নিরাপত্তার বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে। বঙ্গোপসাগরে নিরাপদ নৌপথ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা আমাদের অগ্রাধিকার। আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর করতে চাই, তবে একই সঙ্গে প্রতিবেশী এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গেও আমাদের সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় থাকবে।”

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, বঙ্গোপসাগর কেন্দ্রিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা, মানবপাচার রোধ, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা এবং সাইবার নিরাপত্তায় পারস্পরিক অংশীদারত্ব বৃদ্ধিতে উভয় পক্ষ সম্মতি প্রকাশ করেছে।

রোহিঙ্গা সংকট ও অর্থ বরাদ্দের নিশ্চয়তা: গত প্রায় এক দশক ধরে ১০ লাখেরও বেশি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তবে এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট বাংলাদেশের অর্থনীতি, স্থানীয় পরিবেশ এবং সার্বিক নিরাপত্তায় মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে। সফরে রোহিঙ্গা সংকট ও এর মানবিক সহায়তার অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করার বিষয়ে বিস্তর কথা হলেও দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক সমাধান নিয়ে সংশয় রয়েই গেছে।

কূটনীতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বা সমস্যার সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক সমাধানে যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের সরাসরি জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা কম। এই সংকট সমাধানের পথ বাংলাদেশকে নিজস্ব দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বিচক্ষণ কূটনৈতিক সক্ষমতা দিয়েই খুঁজতে হবে। রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অর্থ সাহায্য অব্যাহত থাকলেও মিয়ানমারের ওপর কার্যকর চাপ প্রয়োগে সুনির্দিষ্ট মার্কিন ব্লু-প্রিন্ট দৃশ্যমান নয়। মানবিক সাহায্য প্রবাহ সচল রাখার ক্ষেত্রে ইতিবাচক মার্কিন প্রতিশ্রুতি থাকলেও টেকসই প্রত্যাবাসন রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে।

ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা জানা যায়, দক্ষিণ এশিয়া ও ভূ-কৌশলগত বঙ্গোপসাগরের অববাহিকায় বাংলাদেশের গুরুত্ব এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের ‘মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক’ কৌশলে বাংলাদেশকে সংযুক্ত করা ওয়াশিংটনের অন্যতম মূল লক্ষ্য। প্রতিরক্ষা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের মাধ্যমে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজস্ব প্রভাব বজায় রাখতে চায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ৮০-র দশকের প্রেক্ষাপটের সাথে তুলনা করলে বর্তমান বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বহুগুণে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত চীন যখন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (ইজও) এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক করিডোরের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে নিজস্ব প্রবেশাধিকার সম্প্রসারিত করছে, তখন ওয়াশিংটন ঢাকার সঙ্গে সামরিক ও নীতিগত সংযোগ গভীর করতে সচেষ্ট।

চীন, ভারত, পাকিস্তান ও তুরস্ক প্রসঙ্গে মার্কিন পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে এই অঞ্চলের বহুপক্ষীয় আঞ্চলিক সম্পর্ক নিয়ে ওয়াশিংটনের নিজস্ব পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত স্পষ্ট। বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান অবকাঠামোগত ও অর্থনৈতিক চুক্তি নিয়ে ওয়াশিংটনের গভীর নজর রয়েছে। সাম্প্রতিক চীন সফরে বাংলাদেশ কী ধরনের কৌশলগত ও আর্থিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সার্জিও গোরের আলোচনায় সেই বার্তাটি বোঝার স্পষ্ট চেষ্টা ছিল। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে প্রধান কৌশলগত মিত্র হিসেবে বিবেচনা করলেও, বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা ওয়াশিংটনের আলাদা পর্যবেক্ষণে থাকে। নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটনের পারস্পরিক সম্পর্কের সমীকরণ বাংলাদেশকে প্রভাবিত করলেও ঢাকা তার নিজস্ব স্বতন্ত্র অবস্থান ধরে রাখতে চায়। দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতিরক্ষা খাতের ভারসাম্য এবং মধ্যপ্রাচ্য-ইউরেশীয় রাজনীতিতে তুরস্ক ও পাকিস্তানের ভূমিকা যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করে। বাংলাদেশ যদি তুরস্কের কাছ থেকে আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় করে কিংবা পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক দূরত্বের বরফ গলায়, তবে ওয়াশিংটন তা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে আঞ্চলিক প্রভাবের সমীকরণ হিসেবে বিবেচনা করে।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ব্রি. জে. অব. মো. হাসান নাসির বলেন, বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের কারণে ওয়াশিংটন ঢাকাকে পাশে পেতে আগ্রহী। তবে জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে দক্ষিণ এশিয়ার প্রভাবশালী দেশসহ দুই বৃহৎ শক্তি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের মাঝে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান পরীক্ষা। সার্জিও গোরের সফরের প্রতিশ্রুতিগুলো কত দ্রুত বাস্তব রূপ নেয়, তা-ই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের আগামী দিনের গতিপথ।