ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর সৃষ্ট গ্যাস সরবরাহ সংকট দিন দিন আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় চট্টগ্রামজুড়ে আবাসিক, শিল্প, ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পরিবহন-সব খাতেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। নগরের অধিকাংশ এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় গ্যাস না থাকায় বহু পরিবার রান্না করতে পারছে না। অন্যদিকে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে দেখা দিয়েছে দীর্ঘ যানজট, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস পাচ্ছেন না চালকরা।
গতকাল রোববার চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কদমতলীর ফোর স্টার সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশন, মইজ্যারটেক কর্ণফুলী ফিলিং স্টেশন, শাহ আমানত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড এবং কামাল ব্রাদার্স সিএনজি স্টেশনসহ বিভিন্ন পাম্পে শতাধিক গ্যাসচালিত যানবাহনের দীর্ঘ সারি। কোথাও কোথাও গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে নির্ধারিত সময়ের আগেই বিক্রি বন্ধ করে দিতে হচ্ছে।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) সূত্র জানায়, গত ২১ জুলাই মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর থেকেই জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এর ফলে চট্টগ্রাম অঞ্চলে গ্যাসের চাপ হঠাৎ কমে যায় এবং পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হয়ে ওঠে।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন আবাসিক গ্রাহকরা। অনেক এলাকায় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চুলায় গ্যাসের দেখা মিলছে না। ফলে বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে রান্না করা খাবার কিনে খেতে হচ্ছে কিংবা বিকল্প হিসেবে এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে অনেক পরিবারকে।
নগরের জামালখান লেনের বাসিন্দা নন্দীতা রানি বলেন, “কয়েকদিন ধরে সকাল থেকেই গ্যাস থাকে না। রোববার সকাল সাতটার দিকে গ্যাস চলে যাওয়ার পর সন্ধ্যা পর্যন্ত আর ঠিকমতো আসেনি। রাত ১২টার দিকে সামান্য চাপ পাওয়া যায়।”
আসকার দিঘির পাড় এলাকার বাসিন্দা কামরুন্নাহার চৌধুরী বলেন, “সকালে যে পরিমাণ গ্যাস আসে, তা দিয়ে পরিবারের সবার জন্য রান্না করা সম্ভব হয় না। বাধ্য হয়ে এলপিজি সিলিন্ডার কিনেছি। অতিরিক্ত খরচ হলেও উপায় নেই।”
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন আগ্রাবাদ, হালিশহর, পতেঙ্গা, চান্দগাঁও, পাঁচলাইশ, মুরাদপুর, বাকলিয়া, চকবাজার, বহদ্দারহাট, অক্সিজেন ও ষোলশহর এলাকার বাসিন্দারাও। তাদের ভাষ্য, দিনে কয়েক ঘণ্টা গ্যাস থাকলেও চাপ এত কম থাকে যে রান্না সম্পন্ন করা যায় না। গ্যাস সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতেও। গ্যাসচালিত অটোরিকশা, মাইক্রোবাস ও ব্যক্তিগত গাড়ির চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন সময় নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে আয়ও কমে যাচ্ছে।
মইজ্যারটেক এলাকার শাহ আমানত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের সামনে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছিলেন চট্টগ্রাম-বদরখালী রুটের সিএনজি অটোরিকশা চালক মোহাম্মদ মিনহাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, “আগে ১০ থেকে ২০ মিনিটেই গ্যাস নিয়ে বের হতে পারতাম। এখন দুই ঘণ্টা ধরে রোদে দাঁড়িয়ে আছি। কখন গ্যাস পাবো তারও নিশ্চয়তা নেই। আবার সন্ধ্যা ছয়টার পর বিক্রি বন্ধ হয়ে গেলে খালি হাতেই ফিরে যেতে হবে।”
স্টেশন-সংশ্লিষ্টরা জানান, মূল লাইনে পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় অনেক পাম্পে স্বাভাবিকভাবে গ্যাস বিক্রি সম্ভব হচ্ছে না। কোথাও কোথাও কয়েক ঘণ্টা গ্যাস সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধও রাখতে হচ্ছে। এতে যেমন চালকদের ক্ষোভ বাড়ছে, তেমনি বিক্রি কমে যাওয়ায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন পাম্প মালিকরাও। দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষার সময় অনেক চালক ধৈর্য হারিয়ে ফেলছেন, ফলে কয়েকটি স্টেশনে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিও সৃষ্টি হচ্ছে।
গ্যাসের এই সংকট শিল্পকারখানার উৎপাদনেও প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে ক্যাপটিভ বিদ্যুৎনির্ভর শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন সংকট অব্যাহত থাকলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং রপ্তানিমুখী শিল্পেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
কেজিডিসিএলের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিস্ট্রিবিউশন) রফিক খান বলেন, “গত ১০ দিন ধরেই গ্যাস সংকট চলছে। তবে ছুটির দিনে চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য আরও খারাপ হওয়ায় পরিস্থিতি তীব্র হয়েছে। শনিবার রাত থেকে গ্যাসের চাপ অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় চট্টগ্রামের প্রায় সব এলাকাই সংকটে পড়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।”
জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকদের মতে, দেশের গ্যাস ব্যবস্থায় আমদানিনির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে। ফলে এলএনজি সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেই জাতীয় পর্যায়ে বড় ধরনের সংকট তৈরি হচ্ছে। তারা মনে করেন, স্থানীয় গ্যাসক্ষেত্রে নতুন অনুসন্ধান জোরদার, বিদ্যমান ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ছাড়া এ ধরনের সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
এদিকে গ্যাস সরবরাহ কবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে এখনও কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা জানানো হয়নি। ফলে নগরবাসী, পরিবহন শ্রমিক, শিল্প উদ্যোক্তা এবং সিএনজি স্টেশন-সংশ্লিষ্টদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।