দেশে চলমান ভয়াবহ গ্যাস সংকট আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে। মহেশখালিতে ক্ষতিগ্রস্ত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) আংশিক চালুর বিষয় এখনও নিশ্চিত করে বলতে পারছে না কেউই। অগ্নিকান্ডে ক্ষতিগ্রস্ত এফএসআরইউটি গত ১ আগস্ট আংশিক চালুর আশার কথা বলা হলেও তা সম্ভব হয়নি। আরও দুই-তিন দিনের মতো সময় লাগতে পারে বলে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি (আরপিজিসিএল) সুত্র জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, এফএসআরইউ চালু না হওয়া পর্যন্ত গ্যাস সংকট কমার কোন সুযোগ নেই। এফএসআরইউটি পুরোপুরি চালু হতে আরও বেশ কয়েকদিন সময় লাগতে পারে। আবার তা কয়েক সপ্তাহ গড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যান্ত্রিক ত্রুটি সারানোর বিষয়ে নিশ্চিত করে সময় বলা কঠিন। এক্সিলারেট এনার্জির দেওয়া প্রথম আভাস ইতোমধ্যেই ব্যর্থ হওয়ায় শঙ্কা আরও বেড়েছে।
এদিকে মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস আমদানির প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির আওতায় দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি সহযোগিতা বাড়াতে চায় সরকার। গতকাল রোববার সচিবালয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত উ কিয়াও সোয়ে মোয়ের বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। তাই মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস আমদানিতে বাংলাদেশ আগ্রহী। জবাবে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত এ বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেন। পাশাপাশি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আকারেও গ্যাস সরবরাহের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন তিনি।
বৈঠকে মিয়ানমার থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের পুরোনো প্রস্তাবও নতুন করে আলোচনায় আসে। জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, ২০০৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া পাইপলাইনের মাধ্যমে মিয়ানমার থেকে গ্যাস আমদানির প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সেই উদ্যোগ আবারও বিবেচনায় আনা যেতে পারে।
বিষয়টি এগিয়ে নিতে দুই দেশের জ্বালানিমন্ত্রী পর্যায়ে বৈঠকের প্রস্তাব দেন ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি মিয়ানমারের জ্বালানিমন্ত্রীকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। প্রয়োজনে নিজেও মিয়ানমার সফরে যাওয়ার আগ্রহের কথা জানান।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের কথা স্মরণ করিয়ে মন্ত্রী বলেন, চীন মিয়ানমার বাংলাদেশ করিডোর করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ করিডোর বাস্তবায়িত হলে জ্বালানি ও বাণিজ্য সহযোগিতা আরও জোরদার করা সম্ভব হবে বলে মত দেন জ্বালানিমন্ত্রী।
মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশ-মিয়ানমার যৌথ কারিগরি কমিটির বৈঠক পুনরায় শুরু করে এ বিষয়ে পর্যালোচনা করা যেতে পারে। বৈঠকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, জ্বালানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
গত ২৭ জুলাই বিদ্যুৎ,জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছিলেন, গ্যাস সংকট পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগতে পারে। পনের দিন ধরলে আগস্টের ১১ তারিখ চলে আসে। তবে সবটাই আশাবাদ,নিশ্চিত করে কারো পক্ষেই বলা সম্ভব নয়।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপরেশন এন্ড মাইন্স) প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম বলেছেন, এক্সিলারেটের পক্ষ থেকে ১ আগস্ট আংশিক চালুর আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছিল। সেই সময়ে চালু করা সম্ভব হয়নি। এখন আরও এক-দুই দিন লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এফএসআরইউ বিকলের কারণে ইতোমধ্যে দু’টি এলএনজিবাহী কার্গো ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে। এর একটি সমঝোতার মাধ্যমে ফেরৎ গেছে, আরেকটির জন্য জরিমানা গুণতে হতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে। ১ আগস্ট চালু হবে আশায় নতুন করে আরেকটি জাহাজ বাংলাদেশে এসেছে, কালক্ষেপন হলে সেই জাহাজের জন্য জরিমানা গুণতে হতে পারে বাংলাদেশকে। সে কারণে উভয় সংকটে রয়েছে বাংলাদেশ। মেরামত নিশ্চিত হওয়ার পর জাহাজ আনতে গেলে সংকট আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে পেট্রোবাংলা সুত্র জানিয়েছে।
২১ জুলাই থেকে সারাদেশে নজিরবিহীন গ্যাস সংকট চলছে। অনেক এলাকায় ওই দিন থেকেই আর গ্যাসের দেখা মিলছে না। এতে করে গ্যাসে চালিত শিল্প থেকে শুরু করে যানবাহন এবং আবাসিকে ভয়াবহ সংকট চলছে। ভুক্তভোগিরা নানা রকম প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন প্রতিদিনেই। সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে সিএনজি চালিত অটোরিকশার চালকরা। বিভিন্ন পাম্প ঘুরে গ্যাস পেতেই দিনের বড় একটি সময় চলে যাচ্ছে। এতে করে যে আয় হচ্ছে সেই দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস পেতে তাদের পক্ষ থেকেও মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে। চালকেরা বলছেন, গ্যাস পেতে লাইনে তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক কম যাত্রী পরিবহন করতে পারছেন। কিন্তু গাড়ির জমা, খাবার ও অন্যান্য খরচ আগের মতোই দিতে হচ্ছে।
দৈনিক গ্যাসের চাহিদা বিবেচনা করা হয় প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। আর সরবরাহ দেওয়া হতো প্রায় ২৭০০ মিলিয়নের মতো। এরমধ্যে দেশীয় উৎস থেকে পাওয়া ১৬৫০ মিলিয়ন এবং আমদানি প্রায় ১১০০ মিলিয়ন ঘনফুটের মতো। মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত এফএসআরইউ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ ২১০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে।
এক সময়ে দেশীয় গ্যাস ফিল্ডগুলো থেকে দৈনিক ২৮০০ মিলিয়নের মতো গ্যাস উৎপাদিত হলেও এখন ১৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। মজুদ কমে যাওয়ায় প্রতিনিয়ত কমে আসছে উৎপাদন। ঘাটতি সামাল দিতে ২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি শুরু করা হয়। এ জন্য দু’টি এফএসআরইউ স্থাপন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১১’শ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব। একটি বন্ধ থাকায় প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে গেছে।
বাংলাদেশে বাড়ন্ত চাহিদার বিপরীতে প্রতিদিনই কমছে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন। চাইলেও সহসা আমদানি বাড়ানোর সুযোগ নেই। আমদানি বাড়াতে হলে নতুন এলএনজি টার্মিনাল ও পাইপলাইন স্থাপন করতে হবে, যা খুবই সময় সাপেক্ষ। যে কারনে আসছে ২০২৭ ও ২০২৮ সালে গ্যাস সংকট আরও প্রকট হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ওই সংকট দূর করতে আরও একটি এফএসআরইউ স্থাপন করতে চায় বাংলাদেশ। গত সপ্তাহে ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরের দিন থেকে ১৮ মাস সময় প্রয়োজন পবে। অন্যদিকে মালয়েশিয়া থেকে আইএসও কন্টেইনারে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানি করতে চায় বাংলাদেশ। ভয়াবহ গ্যাস সংকট দূর করতে এটাই একমাত্র তড়িৎ বিকল্প মনে করছেন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।