- চুক্তির শর্ত অনুযায়ী মালয়েশিয়া সরকারের সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় বাংলাদেশ
আশার বার্তা দিয়েও কোনো আলোর মুখ দেখতে পাচ্ছেন না বিদেশে কর্মসংস্থানপ্রত্যাশী হাজার হাজার তরুণ। সরকারের একাধিক সফর, দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং বহুপ্রতীক্ষিত সমঝোতার পরও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ঘিরে থাকা চরম অনিশ্চয়তা ও হতাশা কাটেনি। ২০২৬ সালের জুনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরের পর শ্রমবাজার আবার নতুন করে চালু হওয়ার স্বপ্ন দেখছিল সাধারণ মানুষ। তবে সফরের কয়েক মাস পার হতে চললেও কর্মী নিয়োগের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা, কার্যপদ্ধতি কিংবা স্বচ্ছ খরচের কাঠামো প্রকাশ না হওয়ায় পুরো প্রক্রিয়াটি এখন তীব্র ধোঁয়াশার মধ্যে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানায়ায়, চুক্তি স্বাক্ষরের প্রায় তিন মাস পার হলেও এর বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো রূপরেখা তৈরি হয়নি। মালয়েশিয়া সরকারের কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কাজের আদেশ বা ডিমান্ড লেটার না আসায় চুক্তির বাস্তবায়ন একপ্রকার স্থবির অবস্থায় রয়েছে। যদিও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে আলোচনা চলমান আছে, যে কোনো সময় শ্রমবাজার চালু হবে।
মালয়েশিয়ার সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২৫টি বাংলাদেশী রিক্রুটিং এজেন্সিকে সরাসরি নির্বাচিত করা এবং আরও ৩১২টি এজেন্সিকে অ্যাসোসিয়েট রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার যে সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে, তা নিয়ে দেশে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়াটি কীভাবে পরিচালিত হবে এবং সাধারণ প্রার্থীরা সিন্ডিকেটের খপ্পর থেকে রেহাই পাবেন কি না—তার কোনো স্পষ্ট উত্তর এখনও মেলেনি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানাযায়, ২০২৬ সালের জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত শ্রম অংশীদারত্ব ও অভিবাসন ব্যবস্থাপনা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির প্রধান প্রধান শর্তগুলো ছিল: ১. কোনো একক গোষ্ঠী বা সীমিত গোষ্ঠীর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বা ‘সিন্ডিকেট’ রোধ করে উন্মুক্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় কর্মী পাঠানো। ২. নিয়োগকর্তা কর্তৃক জিরো কস্ট বা বিনামূল্যে অভিবাসন নিশ্চিত করা। ৩. অনলাইন ডাটাবেজ তৈরিতে উভয় দেশের কেন্দ্রীয় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সরাসরি কর্মী বাছাই। ৪. মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশি কর্মীদের জীবনমান, সঠিক বেতন ও বীমা সুবিধা বা শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা ।
এদিকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় গত ২৮ আগস্ট এক বিবৃতিতে জানায়, বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ১০ হাজার বাংলাদেশী কর্মীকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বা ‘জিরো কস্টে’ নেওয়ার বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বিকেলেই সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড’ (বোয়েসেল)-এর মাধ্যমে চার্টার্ড ফ্লাইটে এই কর্মীদের প্রথম বহর পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। ফ্যাসিবাদী আমলের অনিয়ম দূর করে এই বাজার সচল করা হচ্ছে বলে মন্ত্রণালয় দাবি করেছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ও শামা ওবায়েদ ইসলাম যৌথভাবে সাংবাদিকদের জানান, অন্তর্বর্তীকালীন ও বর্তমান সরকারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় মালয়েশিয়া বিশেষ বিবেচনায় বাংলাদেশকে এই সুযোগ দিয়েছে। তবে মন্ত্রী স্বীকার করেন যে, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী নিয়মিত ও বিপুল সংখ্যক কর্মী পাঠানোর আনুষ্ঠানিক সূচনা এখনো মালয়েশিয়া সরকারের সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় রয়েছে।
কুয়ালালামপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, যৌথ কমিটির অনুমোদিত ৩৩৮টি এজেন্সির তালিকা তারা পেলেও নিয়োগের আসল কাজ শুরু হবে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে আনুষ্ঠানিক ক্লিয়ারেন্স আসার পর। হাইকমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কূটনৈকদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে। কিন্তু মালয়েশিয়ার অভ্যন্তরীণ আইন ও শ্রমনীতির পরিবর্তন এবং নতুন অনলাইন ব্যবস্থার কারণে চূড়ান্ত প্রক্রিয়া কিছুটা দীর্ঘায়িত হচ্ছে। সাধারণ কর্মীদের কোনো প্রকার মধ্যস্বত্বভোগী বা দালাল চক্রের কাছে লেনদেন না করার জন্য সতর্ক করেছে হাইকমিশন।
বিদেশী কর্মী কমানোর নীতি মালয়েশিয়ার: মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র ও মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, তাদের দেশে বিদেশী কর্মী নিয়োগ নীতিতে আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে। মালয়েশিয়ার সরকার তাদের মূল বক্তব্য ও নীতিতে অনড়। দেশটি তাদের শ্রমবাজারে নিজস্ব নাগরিকদের অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তারা লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে যে ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশের মোট শ্রমশক্তির মধ্যে বিদেশী কর্মীর অনুপাত মাত্র ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। প্ল্যান্টেশন, কৃষি ও নির্মাণ খাতের নির্দিষ্ট কিছু কাজ ছাড়া নতুন করে অনভিজ্ঞ বা কম দক্ষ শ্রমিক ঢালাওভাবে নেওয়া হবে না। সম্প্রতি বাংলাদেশের সরকারের এক বক্তব্য কেন্দ্র করে যে জল্পনা তৈরি হয়েছিল, পরদিনই মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী তা সংশোধন করে জানান যে, ১০ হাজার কর্মী নেওয়ার বিষয়টি একটি বিশেষ পাইলট প্রকল্প—এটি ঢালাওভাবে পুরো বাজার চালুর লক্ষণ নয়।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশী কর্মীদের নিয়োগ থমকে থাকার পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। কারণগুলো হলো: ১. বাংলাদেশে আড়াই হাজারের বেশি নিবন্ধিত রিক্রুটিং এজেন্সি রয়েছে। কিন্তু সেখান থেকে মাত্র ২৫টি সরাসরি ও ৩১২টি সহযোগী এজেন্সিকে বেছে নেওয়া হয়েছে। এতে বাকি প্রায় ২,০০০ এর বেশি এজেন্সি কাজ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং এটি পুরোনো ‘২৫ জনের সিন্ডিকেট’ ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি ঘটানোর আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। ২. নির্বাচিত ৩৩৮টি এজেন্সি কীভাবে কাজ করবে, কর্মী বাছাই করবে এবং খরচের সীমা কী হবে—তার কোনো নোটিফিকেশন দেওয়া হয়নি। ৩. মালয়েশিয়ার ব্যবহৃত এফডব্লিউসিএমএস প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের মধ্যকার জটিলতা দূর হয়নি। ৪. চুক্তি কাগজে-কলমে ‘জিরো কস্ট’ থাকলেও অতীতে মালয়েশিয়া যেতে কর্মীদের আড়াই থেকে চার লাখ টাকা পর্যন্ত গুণতে হয়েছে। এই দুর্নীতির লাগাম কীভাবে টানা হবে তার কোনো রূপরেখা নেই। ৫. মালয়েশিয়া কেবল বাংলাদেশ নয়, বরং ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, ভিয়েতনাম, মিয়ানমারসহ ১৫টি দেশ থেকে কর্মী সংগ্রহ করে। অন্য দেশগুলোর সাথে প্রতিযোগিতা এবং মালয়েশিয়ার নিজস্ব আইনি বাধ্যবাধকতা এই জটিলতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
মালয়েশিয়া শ্রমবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক হাসানুজ্জামান হাসান বলেন, “আগেও আমরা ১ হাজার ৪০০ রিক্রুটিং এজেন্সির নাম এফডব্লিউসিএমএসে পেয়েছি, কিন্তু বাস্তবে কাজ পেয়েছে মাত্র ২৫টি এজেন্সি। এবারও সেই পুরোনো পদ্ধতিকে নতুন মোড়কে হাজির করা হয়েছে। আমরা চাই বায়রার তালিকাভুক্ত সব বৈধ এজেন্সি সমান সুযোগ পাক। সুনির্দিষ্ট রূপরেখা প্রকাশ না করা পর্যন্ত সবার মধ্যেই অসন্তোষ ও অনিশ্চয়তা থাকবে।”
অভিবাসন ও শরণার্থীবিষয়ক বিশেষজ্ঞ শরিফুল ইসলাম বলেন, মূলত অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণেই বারবার মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। মূল দুর্নীতি নির্মূল না করে আবার রাজনৈতিক চাপ দিয়ে এই শ্রমবাজার চালু করা হলে তা কিছুদিন পর আবারও মুখ থুবড়ে পড়বে। উভয় দেশের উচ্চপদস্থ চক্র ও অসধুপায় অবলম্বনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিতে পারলে সাধারণ কর্মীদের ভাগ্য পরিবর্তন হবে না। আর বৈধ পথে শ্রমবাজার চালু না থাকলে অবৈধ পথে শ্রমিক যেতে পারে মালয়েশিয়ায়, যার ফলে দেশের সুনাম নষ্ট হবে।
সাবেক সিরিয়র কূটনীতিক ও রাষ্ট্রদূত সাকিব আলী বলেন, মালয়েশিয়ায় নতুন প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের সমন্বিত কূটনৈতিক তৎপরতায় সম্পর্কের বরফ কিছুটা গললেও বাস্তব চিত্র খুব একটা বদলায়নি। বোয়েসেলের মাধ্যমে ১০ হাজার কর্মীর ‘জিরো কস্টে’ যাওয়া এক আশার আলো তৈরি করলেও লাখ লাখ সাধারণ প্রার্থীর জন্য নিয়মিত শ্রমবাজারের দুয়ার এখনো খোলে রাখা সম্ভব হয়নি। এখানে সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতার ঘাটতি আছে। কারণ চুক্তি হওয়ার পরও শ্রমবাজার না খোলা হতাশাজনক।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে নিবন্ধিত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর জন্য স্বচ্ছ ও সমান সুযোগ তৈরি করা, কর্মী অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনা এবং মালয়েশিয়া সরকারের নীতিমালার সাথে সামঞ্জস্য রেখে অবিলম্বে কাজের রূপরেখা প্রকাশ করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। অন্যথায় আশার আলো বারবার হতাশাতেই পর্যবসিত হতে থাকবে।