ভারতের সঙ্গে হওয়া চুক্তি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালকের পদ থেকে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের পদত্যাগের বিষয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, পলাতক ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার কন্যার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় নিয়োগটাই ছিল দুঃখজনক। মানে এ ধরনের একটি সংস্থায় এত উচ্চ পর্যায়ে নিয়োগ পাওয়ার মতো তার কোনো গ্রহণযোগ্য যোগ্যতা অভিজ্ঞতা বা দক্ষতা ছিল না। তিনি তার যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন।
গতকাল রোববার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি এসব কথা বলেন। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সরকারকে প্রতারক সরকার হিসেবে অভিহিত করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, একটি প্রতারক সরকার তো প্রতারকদেরই সামনে নিয়ে আসবে। এদের তো আপনি জানেন, এখন সব জায়গায় এদের দুর্নীতির থলি ধরা পড়ছে। তার ব্যাপারে এটা বিস্ময়কর কিছু না। এটা একটা জালিয়াতি ছিল... তার নিয়োগটাই ত্রুটিপূর্ণ ছিল। তারা অনেক কিছু লুকাচ্ছিল এবং সেখানে গিয়ে চাঁদাবাজি করে, ভোট দিয়ে কোনো রকম একটা... মানে জায়গা করে নিয়েছে। এগুলো তো বের হয়ে আসবেই। যখন আপনি দুর্নীতিতে পচে যাবেন, সেটা প্রকাশ পাবেই। মানে দুর্নীতির এই দুর্গন্ধ বের হয়ে আসবেই। এই দেখেন, শেখ মুজিব সাহেবের পরিবারের সব লোক এখন দুর্নীতির দুর্গন্ধের... মানুষ এখন তাদের চিনতে পারছে।
‘সুতরাং এটাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, কোনো গ্রহণযোগ্য যোগ্যতা বা দক্ষতা ছাড়া, শুধু অমুকের মেয়ে হওয়ার কারণে, ওই সময়ের তথাকথিত প্রধানমন্ত্রীর মতো একটা ত্রুটিপূর্ণ রেজিমের নেতার মেয়ে হওয়ার কারণে তাকে ওই নিয়োগটা দেওয়া হয়েছিল। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর জন্যও এটা লজ্জার বিষয় যে, শুধু পারিবারিক রেজিমের সাথে যুক্ত থাকার কারণে তাদের এমন লোকদের নিয়োগ দেওয়া উচিত নয়।’
হুমায়ুন কবির বলেন, বিশ্বের যেকোনো জায়গার জন্যই আমি মনে করি, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোরও তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও কঠোর করা উচিত। তারা শেখ হাসিনা পরিবারের সদস্যদের মতো দুর্নীতিগ্রস্ত ও দুর্গন্ধযুক্ত লোকদের বিভিন্ন পদে বসাতে পারে না, যা পরবর্তীতে সেই প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি নষ্ট করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা। এই যেমন আমরা কোভিডের ঘটনা দেখলাম, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে নিয়ে আপনি ছেলেখেলা করতে পারেন না। এই সংস্থাকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আপনার এমন মানুষ দরকার, যাদের এ বিষয়ে দক্ষতা আছে। আপনি যদি এই ধরনের পদে কোনো অভিযুক্ত প্রতারকদের বসিয়ে দেন, তাহলে এই অঞ্চল বা পুরো বিশ্বের জন্যই তার ফলাফল ভালো হবে না। তাই এ ধরনের নিয়োগের বিষয়ে আমাদের আরও সিরিয়াস হওয়া উচিত। তিনি বলেন, এই পদে আমরা একজন প্রার্থীকে সমর্থন করছি, মালদ্বীপের প্রার্থীকে, যার ভালো যোগ্যতা রয়েছে। তো আশা করছি, খুব শিগগিরই এটি যোগ্য হাতেই পৌঁছাবে।
ভারতের সঙ্গে হওয়া চুক্তি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগের সময়ে ভারতের সঙ্গে হওয়া চুক্তি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এটা সংসদীয় প্রক্রিয়ায় যাচাই-বাছাই চলছে। এক প্রশ্নের উত্তরে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, ভারতের সঙ্গে আমরা একটি ভালো কার্যকর সম্পর্ক চাই। তবে সেই সম্পর্ক গড়ে তুলতে হলে প্রথমে একটি দ্বিপক্ষীয় সফর হওয়াই ভালো। কোনো দেশের সঙ্গে ভালো কার্যকর সম্পর্ক তৈরি করার জন্য আমরা বহুপাক্ষিক ফোরামে বৈঠক করি না।
তিনি বলেন, একটি সমস্যাগ্রস্ত, ত্রুটিপূর্ণ ও লুটেরা স্বৈরাচার সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ছিল ১৫ বছরের। এখন সেই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আমরা একটি নতুন সম্পর্কের দিকে যেতে চাই। আর সেটি দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই হওয়া উচিত। আমাদের একটি দ্বিপক্ষীয় সফর প্রয়োজন, কোনো বহুপাক্ষিক ফোরামের মাধ্যমে নয়। এর অর্থ এই নয় যে, কোনো বহুপাক্ষিক ফোরামে গেলে আমরা সাইডলাইনে ভারতের সঙ্গে বৈঠক করব না। এমন কথা কখনো বলা হয়নি। বিষয়টি এমন নয়।
সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিলো- তাহলে কি আমরা ধরে নেব, জাতিসংঘ যেহেতু একটি বহুপাক্ষিক ফোরাম, সেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাইডলাইনে বৈঠক হবে না? এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আরে ভাই, ভারতের প্রতি এই অতিরিক্ত আগ্রহ থেকে বের হয়ে আসুন! ভারত শুধুই আরেকটি দেশ, যার সঙ্গে আমরা একটি ভালো কার্যকর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক চাই। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে নাশতায় ভারত, দুপুরের খাবারে ভারত, রাতের খাবারেও ভারত—তাহলে নিজের দেশের খাবার খাবেন কখন? নিজের দেশের চিন্তা করুন।
তিনি বলেন, যার সঙ্গে যখন আমাদের দ্বিপক্ষীয় আলোচনা প্রয়োজন হবে, বহুপাক্ষিক ফোরামে গিয়ে কথা বলার সুযোগ থাকলে আমরা সেটিও করব। অবশ্যই, যেখানে যে সুযোগ থাকবে, সেটি কাজে লাগানো হবে। একজন নেতা সবার সঙ্গে দেখা করতে পারেন না। সেখানে অনেক আমন্ত্রণ থাকে, অনেক বৈঠকের সুযোগ থাকে। তিনি সেগুলো অনুযায়ী যোগাযোগ করবেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের মূল লক্ষ্য হলো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়া। সাইডলাইনের বৈঠকগুলো এ ধরনের সফরে হয়ে থাকে। শেষ মুহূর্তেও অনেক কিছু যুক্ত হয়। বহুপাক্ষিক ফোরামগুলো এভাবেই কাজ করে। যার সঙ্গেই বৈঠক হবে, আপনাদেরকেই তো জানানো হবে। দেশের মানুষকে জানাতে হবে না কার সঙ্গে বৈঠক হচ্ছে? আপনাদের মাধ্যমেই জানানো হবে। তাই আপনারাই সবার আগে জানতে পারবেন।
জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর ভিশন তুলে ধরবেন: আসন্ন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর ভিশন তুলে ধরবেন বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক রূপান্তর এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নতুন সরকারের লক্ষ্য ও অগ্রাধিকার বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরা হবে। প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রী আগামী ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়বেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে তার এই সফর। সরকারপ্রধান হিসেবে এটি হবে জাতিসংঘে তার প্রথম ভাষণ। ২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। হুমায়ুন কবির বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচি অত্যন্ত ব্যস্ত থাকবে। তার বক্তব্যে বিশ্বশান্তি, টেকসই উন্নয়ন, সংঘাত নিরসন, দারিদ্র্য বিমোচন, স্থানীয় অর্থনীতি এবং বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তন ও জলবায়ু অর্থায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নেতৃত্বের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। সংকটটির প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আরও জোরালোভাবে আকর্ষণ করতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সাইডলাইনে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা ও বিভিন্ন বৈঠকে বিষয়টি তুলে ধরা হবে। এদিকে প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফর শেষে সানফ্রান্সিসকো যাওয়ার কথা রয়েছে। তাই ২৬ সেপ্টেম্বর দেশে ফিরবেন-এ তথ্যটি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তা প্রতিবেদনে উল্লেখ না করাই নিরাপদ।
সীমান্ত হত্যা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে এসব বিষয় সমাধান করব। আন্তর্জাতিক আইন, বর্ডার প্রোটোকল এবং দুই দেশের চুক্তি মেনে আমাদের সরকার ভারতের সঙ্গে প্রতিটা স্তরে এই উদ্বেগগুলো তুলবে এবং কূটনৈতিক চ্যানেলে আলোচনা চালিয়ে যাবে। ভারতের সঙ্গে সম্পাদিত সকল চুক্তি বাংলাদেশ পর্যালোচনা করছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।