স্টাফ রিপোর্টার

“জুলাই আন্দোলনের বিরুদ্ধে দেশের ভেতরে বা বাইরে কোনো ষড়যন্ত্র হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমরা তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াব” বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন।

গতকাল শনিবার বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রচিত বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রকাশনা বিভাগ আইসিএস পাবলিকেশনসের আয়োজনে আটটি গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, “জুলাইকে ঘিরে ষড়যন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছে। বিভিন্নভাবে জুলাইয়ের চেতনাকে আন্ডারমাইন করার চেষ্টা চলছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অপচেষ্টা হলো জুলাই আন্দোলনকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড় করানো। এ ধরনের বিভাজনমূলক রাজনীতি দেশের জন্য কল্যাণকর নয়।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে বৈষম্য, বঞ্চনা ও অন্যায়ের কোনো স্থান থাকবে না। জুলাইয়ের চেতনাকে ধারণ করেই একটি ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।”

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, “আমরা শহীদ আবু সাঈদ, শহীদ মুগ্ধ, শহীদ ওয়াসিম এবং জুলাই আন্দোলনে জীবন উৎসর্গকারী সকল শহীদকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। একই সঙ্গে অতীতের বিভিন্ন ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই।”

তিনি বলেন, “আজকের এই আয়োজনের উদ্দেশ্য হলো সঠিক তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে জুলাই আন্দোলনের ইতিহাস জাতির সামনে তুলে ধরা। গবেষণা, সাহিত্য, গল্প-উপন্যাস ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মাধ্যমে আগামী প্রজন্মের কাছে জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি ও চেতনা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।”

ছাত্রশিবিরের গবেষণা কার্যক্রমের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, “জুলাই আন্দোলন নিয়ে গবেষণা, প্রকাশনা, শিশু-কিশোরদের জন্য গল্প-উপন্যাস এবং সারাদেশে স্মৃতিলেখন প্রতিযোগিতার মাধ্যমে জুলাইয়ের স্মৃতি সংরক্ষণের কাজ করা হয়েছে। যারা জুলাইয়ের গুরুত্ব বা স্মৃতিকে ম্লান করার চেষ্টা করছেন, তাদের আমরা ধিক্কার জানাই।”

তিনি আরও বলেন, “জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসে যদি কেউ মনে করে ক্ষমতা চিরস্থায়ী হয়ে গেছে, তবে সেটি ভুল ধারণা। জনগণের রায় উপেক্ষা করে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয়করণের চেষ্টা হলে দেশের জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমরা গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণভাবে রাজপথে থাকব।”

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য হাফেজ রাশেদুল ইসলাম বলেন, “জুলাইকে বাদ দিয়ে আমাদের পথচলা যেন না হয়। জুলাইকে সঙ্গে নিয়েই আমরা এগিয়ে যেতে চাই। আন্দোলনের প্রথম দিন থেকেই ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে পরীক্ষা বর্জনের কর্মসূচির মাধ্যমে ইসলামী ছাত্রশিবির জুলাই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে মাঠে নেমেছিল।”

তিনি বলেন, “ছাত্রশিবির যেহেতু শুরু থেকেই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, তাই ভবিষ্যতেও সংগঠনটির আরও দায়িত্বশীল ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করা উচিত।” তিনি জুলাইয়ের ইতিহাস ও চেতনাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে লেখক, সাহিত্যিক ও প্রকাশকদের উদ্যোগেরও প্রশংসা করেন।

ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, একটি জাতির ইতিহাস শুধু ইতিহাসগ্রন্থে নয়, উপন্যাস, নাটক, শিল্প ও সাহিত্যেও স্থান পাওয়া উচিত। তিনি বলেন, জুলাইয়ের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের দুঃশাসনের চিত্র এবং জুলাই থেকে জন্ম নেওয়া জনগণের দাবি-আকাঙ্ক্ষাও সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে তুলে ধরতে হবে।

তিনি বলেন, “জুলাই কোনো একক সংগঠনের আন্দোলন ছিল না। বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন এতে অংশগ্রহণ করেছে এবং অসংখ্য মানুষ আত্মত্যাগ করেছেন। তাই জুলাইয়ের চেতনাকে সব রাজনৈতিক শক্তির ধারণ করা উচিত।”

মঞ্জুরুল ইসলাম আরও বলেন, “যদি জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে আমরা ব্যর্থ হই এবং যে কারণগুলো থেকে জুলাইয়ের সৃষ্টি হয়েছিল, সেগুলো আবার ফিরে আসে, তাহলে জুলাইয়ের চেয়েও ভয়াবহ অভ্যুত্থান হতে পারে। তাই জুলাইকে বাদ দিয়ে নয়, জুলাইকে সঙ্গে নিয়েই আমাদের পথ চলতে হবে।”

তিনি আন্দোলনের শুরু থেকেই ইসলামী ছাত্রশিবিরের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে বলেন, প্রথম দিনথেকেই পরীক্ষা বর্জনসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে সংগঠনটি আন্দোলনে সক্রিয় ছিল এবং ভবিষ্যতেও আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট কবি, কথাসাহিত্যিক ও গবেষক ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ, বিশিষ্ট লেখক, শিক্ষক ও গবেষক অধ্যাপক সাইফুল আরেফিন লেনিন, বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক কবি সোলায়মান আহসান, লেখক জুয়ায়ের হুসাইন এবং জুলাই শহীদ নাসির হাসান রিয়ানের পিতা মো. গোলাম রাজ্জাকসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।