দেশে হাম ও ডেঙ্গু পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক। সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, দু’টি রোগের কোনোটিই নিয়ন্ত্রণে আসেনি। সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয়, হামে আক্রান্ত ও মৃতদের বড় একটি অংশ শিশু। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ২৩২ জন হাম বা হামের উপসর্গ নিয়ে শনাক্ত হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে ২৪ আগস্ট পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৫০ হাজার ৬৫২। এ সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে ৮৩৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। নিশ্চিত হামে মারা গেছে আরও ৯৯ জন। সব মিলিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৩৮। এ পরিসংখ্যান নিঃসন্দেহে অত্যন্ত ভয়াবহ। কারণ হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ এবং এর কার্যকর টিকা রয়েছে। এরপরও যদি কয়েক মাসে শত শত শিশুর মৃত্যু হয়, তাহলে টিকাদান কর্মসূচি, রোগ শনাক্তকরণ এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। শুধু আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসা দেওয়ার মাধ্যমে হাম নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। যেসব শিশু টিকার আওতার বাইরে রয়েছে, তাদের চিহ্নিত করে দ্রুত টিকাদানের আওতায় আনতে হবে।
অন্যদিকে ডেঙ্গুর চিত্রও স্বস্তিদায়ক নয়। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৯৯৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। চলতি বছর এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ৮৫ জনের এবং আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ২ হাজার ৮০ জন। গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানও দেখায়, ডেঙ্গু এখন আর কেবল মৌসুমি সমস্যা নয়। ২০২৫ সালে ১ লাখের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত এবং ৪১৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০২৪ সালে মৃত্যু হয়েছিল ৫৭৫ জনের। ২০২৩ সালে পরিস্থিতি ছিল আরও ভয়াবহ, সে বছর ডেঙ্গুতে মারা যায় ১ হাজার ৭০৫ জন।
হাম ও ডেঙ্গু দুটি ভিন্ন রোগ হলেও উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। হামের ক্ষেত্রে ব্যাপক ও কার্যকর টিকাদান, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং আক্রান্তদের যথাযথ ব্যবস্থাপনা জরুরি। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং কার্যকর মশকনিয়ন্ত্রণের কোনো বিকল্প নেই। দুঃখজনকভাবে আমাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় রোগ প্রতিরোধের চেয়ে রোগ ছড়িয়ে পড়ার পর প্রতিকারের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লে অভিযান শুরু হয়, হাসপাতালে চাপ বাড়লে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অথচ জনস্বাস্থ্যের মূলনীতি হওয়া উচিত রোগ হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করা।
ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের দায়িত্ব কেবল সিটি করপোরেশন বা স্থানীয় প্রশাসনের ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। বাড়ি, নির্মাণাধীন ভবন, অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং সরকারি-বেসরকারি স্থাপনায় জমে থাকা পানি নিয়মিত অপসারণ করতে হবে। একই সঙ্গে মশকনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে লোক দেখানো অভিযান থেকে বের করে বৈজ্ঞানিক, নিয়মিত ও ফলাফলভিত্তিক ব্যবস্থায় নিতে হবে। অন্যদিকে, হামের ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি হলো টিকাদানের ঘাটতি কোথায় রয়েছে তা দ্রুত শনাক্ত করা। যেসব শিশু নিয়মিত টিকার আওতায় আসেনি, তাদের খুঁজে বের করে বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে টিকা দিতে হবে। প্রত্যন্ত এলাকা, দরিদ্র পরিবার এবং স্বাস্থ্যসেবা থেকে দূরে থাকা জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি হামের উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় আইসোলেশনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দকে শুধু হাসপাতাল, অবকাঠামো ও চিকিৎসা সরঞ্জামের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করতে হবে। টিকা, রোগ নজরদারি, কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী, মশকনিয়ন্ত্রণ, জনসচেতনতা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা ছাড়া সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে স্থায়ী সাফল্য অর্জন কঠিন। বিশেষ করে শিশু মৃত্যুর বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। একটি শিশুর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়; এটি স্বাস্থ্যব্যবস্থার ব্যর্থতারও প্রতিচ্ছবি হতে পারে। সরকারকে তাই হাম ও ডেঙ্গু মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা নিতে হবে। টিকাদান কর্মসূচির দুর্বলতা চিহ্নিত করতে হবে, মশকনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে হবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা ও রোগ নজরদারি জোরদার করতে হবে। একইসঙ্গে হামে মৃত প্রতিটি শিশুর মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতে এমন মৃত্যু ঠেকাতে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একদিনে পাঁচ শিশুর মৃত্যু এবং প্রায় এক হাজার ডেঙ্গু রোগীর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনা কোনোভাবেই স্বাভাবিক পরিস্থিতির লক্ষণ নয়। পরিসংখ্যানই বলছে, হাম ও ডেঙ্গু পরিস্থিতির এখনও উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। এখন প্রয়োজন আত্মতুষ্টি নয়, বরং দ্রুত, কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।