পতিত আওয়ামী সরকারের দীর্ঘ সময় দেশের পুঁজিবাজারে নানাবিধ হতাশা ও অস্থিরতা থাকলেও নতুন সরকার ক্ষমতাগ্রহণের পর সংশ্লিষ্টরা বেশ আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন। আশা করা হয়েছিলো নতুন সরকারের আমলে পুঁজিবাজারের পূর্ণ সংস্কার ও বাজারকে বিনিয়োগবান্ধব করে গড়ে তোলা হবে। সরকার গঠনের পর বিগত ১৮০ দিনে পুঁজিবাজারে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এ প্রত্যাশার প্রাপ্তি যেমন রয়েছে, তেমনি কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কাজ করছে হতাশাও। ফলে সঙ্কটের আবর্তের ঘুরপাক খাচ্ছে দেশের পুঁজি বাজার।

বিগত ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার গঠন করা হলেও সংসদে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) আইন সংশোধন ও অন্যান্য কিছু কারণে বেশ কিছু সময় ব্যয় হয়। প্রায় সাড়ে তিন মাস পর গত ৪ জুন নতুন চেয়ারম্যান ও তার কমিশন দায়িত্ব নেন। এর পরই অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ক্রিয়াশীল কমিশনের বিভিন্ন সংস্কারমূলক কার্যক্রম ও ওই কমিশনের দ্বারা সংশোধিত বিভিন্ন বিধিবিধানকে আরো সহজ ও বিনিয়োগবান্ধব করার উদ্যোগ নেয় নতুন কমিশন। বড় মাপে তিনটি বিধিমালা যার মধ্যে ছিল আইপিও রুলস, মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা ও মার্জিন রুলস। বিধিমালা তিনটির সংশোধনের কাজ চলতে থাকে, যার সবগুলোই ছিল বেশ স্পর্শকাতর। ফলে জনমত যাচাই ও বিধিসংক্রান্ত নানা জটিলতায় এতে বেশ কিছু সময় পার হয়ে যায়। সম্প্রতি মার্জিন রুলস নিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি হলেও মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা ও আইপিও রুলস এখনো প্রকৃত আলোর মুখ দেখেনি। ফলে নতুন তালিকাভুক্তি যেমন থেমে আছে, তেমনি মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা নিয়েও বেশ কিছু ধোঁয়াশা রয়েছে। যা কোনভাবেই কাক্সিক্ষত মনে করছেন না বিনিয়োগাকারীরা।

এ দিকে নতুন সরকারের দায়িত্ব নেয়ার পর বিনিয়োগকারীরা অনেকটা আশাবাদী হয়ে উঠলেও তারা হতাশ হতে খুব একটা সময় লাগেনি। ১৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচকটি অবস্থান করছিল ৫ হাজার ৫৭০ দশমিক ৫৯ পয়েন্টে। ওই দিন দেশের প্রধান এ পুঁজিবাজারটিতে লেনদেন নিষ্পত্তি হয়েছিল এক হাজার ২২২ কোটি টাকা। কিন্তু এর মাত্র কয়েক দিন পরের চিত্র ছিলো হতাশাব্যঞ্জক। টানা পতনের শিকার হওয়ায় ৯ মার্চ ডিএসই লেনদেন নেমে আসে ৪১৬ কোটি টাকায়। আবার ৮ মার্চ বাজারটির প্রধান সূচক নেমেছিল ৫ হাজার ৮ দশমিক ৯৯ পয়েন্টে; অর্থাৎ সরকার গঠনের পর মাত্র ১২টি কর্মদিবসের মাথায় পুঁজিবাজারটি ৫৬০ পয়েন্টের বেশি সূচক হারায়। এ ছাড়া বাজারটির লেনদেন নেমে আসে এক হাজার ২২২ কোটি টাকা থেকে ৪১৬ কোটিতে। তবে ওই সময় এত স্বল্প সময়ের ব্যবধানে পুঁজিবাজারের এ হাল হওয়ার পেছনে দু’টি বিষয়ই বড় ভূমিকা রাখে। একটি ছিল হঠাৎ করে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরু আর অন্যটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ। এ প্রথম দেশে একজন ব্যবসায়ীকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগের বিষয়টিকে প্রথম দিকে আর্থিক খাতের কেউই ভালোভাবে নেয়নি। পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীরাও এর বাইরে নয়। আবার একই সময় মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরু হলে তা গোটা বিশ্বকে নাড়া দেয়। কারণ এ যুদ্ধের একটি পক্ষ ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধ একপর্যায়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে গেলে বৈশ্বিক পুজিবাজারে যে ধস নামে তার প্রভাবও ছিল দেশের পুঁজিবাজারে।

পরবর্তীতে পুঁজিবাজার নিয়ে সরকারের বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ বিশেষ করে নতুন অর্থবছরের বাজেটে পুঁজিবাজার নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বেশ কিছু নীতিসহায়তার ঘোষণা পুঁজিবাজারকে আবার সামনে এগোতে সাহায্য করে। গঠিত হয় নতুন কমিশন। বিনিয়োগকারীরা আবার বাজারে ফিরতে শুরু করেন। এরই মধ্যে বাজেট ঘোষণা বাজারের গতিকে বেশ প্রভাবিত করে। জুন মাসের প্রায় পুরোটাই ভালো কাটে পুঁজিবাজারের। ৭ জুন দীর্ঘসময় পর প্রথমবারের মতো দেড় হাজার কোটি টাকা অতিক্রম করে ডিএসইর লেনদেন। জুলাই মাসে এসে তা আরো বেগবান হয়। ১২ জুলাই বাজারটির লেনদেন পৌঁছে যায় এক হাজার ৬৬৯ কোটি টাকায়। ১৫ জুলাই ডিএসইর প্রধান সূচকটি ফের ৫ হাজার ৯২৬ দশমিক ২৭ পয়েন্টের ঘর অতিক্রম করে। সে হিসাবে ৮ মার্চ থেকে ১৫ জুলাই সময়ে ডিএসইর প্রধান সূচকের উন্নতি ঘটে প্রায় ৯২০ পয়েন্ট। জুলাই মাস একপ্রকার ভালো কাটলেও আগস্ট মাসের শুরু থেকেই আবার মন্দার কবলে পড়ে যায় পুঁজিবাজার। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সঙ্কটের কারণেই সম্প্রতি বাজার আচরণের এ পরিবর্তন মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তা ছাড়া বিভিন্ন কারণে দেশের অর্থনীতি এখন অনেকটা স্থবির সময় পার করছে। যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য মোটেই সুখবর নয়।

সার্বিক দিক বিবেচনায় মনে হচ্ছে, দেশের পুঁজিবাজার এখনও সঙ্কটের আবর্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে। কখনো উত্থান; আবার পরক্ষেণেই পতন। ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পুঁজিবাজারের প্রতি আস্থা কমতে শুরু করেছে। এমতাবস্থায় পুঁজিবাজারের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা ও স্থিতিশীলতা ফেরাতে ইতিবাচক সংস্কারের কোন বিকল্প নেই। সবার আগে বিনিয়োগকারী বিনিয়োগের শতভাগ নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে। এজন্য বিদ্যমান ব্যবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন দরকার। অন্যথায় পুঁজি বাজারে সঙ্কট কাটিয়ে ওঠা কোনভাবেই সম্ভব হবে না।