২০ আগস্ট ছিল বিশ্ব মশা দিবস। এ দিবস আমাদের তেমন কোনো সুসংবাদ দিতে পারেনি। তবে সতর্কতা ও নজরদারির পরামর্শ দিয়েছে। একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বহুল ব্যবহৃত এডিস মশা মারার ওষুধের (মশানাশক) বেশিরভাগেই আর কাজ হচ্ছে না। এসব ওষুধে প্রতিরোধী হয়ে উঠছে ডেঙ্গুর জীবাণাবাহী এডিস। ঢাকা ও চট্টগ্রামে তিন শ্রেণীর ছয়টি মশানাশক পরীক্ষা করে পাঁচটির বিরুদ্ধেই প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রমাণ পেয়েছেন গবেষকরা। কোনো কোনো মশানাশকের মাত্রা ১০ গুণ বাড়ানোর পরও ৮৪ শতাংশ পর্যন্ত এডিস মশা বেঁচে ছিল। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশারের নেতৃত্বে জাপানের ইনস্টিটিউট অব হেলথ সিকিউরিটিস গবেষকদের সহযোগিতায় পরিচালিত এক গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে। গবেষকেরা মশার শরীরে কীটনাশক প্রতিরোধের সঙ্গে যুক্ত দু’টি জিনগত পরিবর্তনও শনাক্ত করেছেন।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও বিশিষ্ট কীটতত্ত্ববিদ তৌহিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, মশানাশকগুলোর এডিস-প্রতিরোধী হয়ে ওঠা মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। এখন নতুন কোনো ওষুধ প্রয়োগ করলে সেটাও অকার্যকর হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিজ্ঞানে একে ‘ক্রস রেজিস্ট্যাম্প’ বলা হয়। ডেঙ্গুর মারাত্মক সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে এ পরিস্থিতি। গবেষণায় পাইরেথ্রয়েড, কার্বামেট ও অর্গানো ফসফেটÑএই তিন শ্রেণীর ছয়টি মশানাশক পরীক্ষা করা হয়। পাইরেথ্রয়েড শ্রেণীর ডেল্টামেথ্রিন, আলফা-সাইপারমেথ্রিন, পারমেথ্রিন ও ইটোফেনপ্রক্সÑএই চারটির বিরুদ্ধেই এডিস ইজিপ্টির প্রতিরোধ পাওয়া গেছে। এসব ওষুধে মশা মরছে না। কার্বামেট শ্রেণীর বেন্ডিওকার্বেরও একই অবস্থা। শুধু অর্গানোফসফেট শ্রেণীর ম্যালথিয়নের প্রতি মশা এখনো সংবেদনশীল। গবেষণার উপসংহারে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে এডিস ইজিপ্টি মশার মধ্যে পাইরেথ্রয়েড ও বেন্ডিওকার্ব প্রতিরোধ পাওয়া গেছে। বিপরীতে ম্যালাথিয়ন এখনো কার্যকর।

জানা গেল, পরীক্ষিত ছয়টি মশানাশকের মধ্যে সবচেয়ে ভালো ফল দিয়েছে ম্যালাথিয়ন। ৫ শতাংশ ঘনত্বের ম্যালাথিয়ন প্রয়োগের ২৪ ঘণ্টা পর ঢাকা ও চট্টগ্রাম-এই দুই শহরেই মাঠ থেকে সংগ্রহ করা ৯৮ শতাংশ মশা মারা যায়। মাঠের মশা থেকে গবেষণাগারে জন্মানো পরবর্তী প্রজন্মের ওপর পরীক্ষায় মৃত্যুহার ছিল ৯৯ শতাংশ। তবে একটি রাসায়নিক এখনো কার্যকরÑএ কারণে সেটির ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা নিরাপদ নয়। আর একই রাসায়নিক একটানা ও নির্বিচারভাবে ব্যবহার করলে ভবিষ্যতে সেটির বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ তৈরি হতে পারে মনে করেন গবেষকরা। এই গবেষণাকে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেন জনসবাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, এখন মশা নিধনে শুধু রাসায়নিকে কাজ হবে না। এর পাশাপাশি প্রয়োজন জৈবপ্রযুক্তি। বেশি দরকার মশা, রোগী ও ওষুধে মশার প্রতিরোধী হয়ে ওঠার বিষয়ে নজরদারি। এটা অনুপস্থিত। এ বিষয়ে সতর্ক থাকলে ডেঙ্গু প্রতিরোধ অনেকটাই সহজ হয়ে উঠতে পারে। গবেষকদের গবেষণায় আমরা উপলব্ধি করলাম, ডেঙ্গু প্রতিরোধের কাজটি কোনো সহজ কাজ নয়। আমাদের চাওয়া বা রাজনৈকি বয়ানের কারণে মশারা সুবোধ হয়ে যাবে না। ওরা ওদের বিকাশে সক্রিয়া আছে। ওরা মশানাশকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হয়ে উঠছে। আসলে এখানে প্রতিযোগিতার একটা চিত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যে যোগ্যতার প্রমাণ দেবে তারই হবে বিজয়। ডেঙ্গু এখন আমাদের জন্য এক বড় পরীক্ষার বিষয় হয়ে উঠেছে।