কৃষকের হাতে যখন ফসল, তখন দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে আমরা স্বস্তির কথা বলি। কিন্তু সে কৃষকই যখন প্রয়োজনের সময়ে সার না পেয়ে রাস্তায় দাঁড়ান, বিক্ষোভ করেন, তখন আমাদের কৃষিব্যবস্থার বাস্তব চিত্রটি সামনে আসে। দেশের বিভিন্ন স্থানে সার সংকটের খবর এবং কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে সারের দাবিতে কৃষকদের বিক্ষোভের খবর দৈনিক সংগ্রামসহ পত্রিকান্তরে প্রকাশিত হয়েছে। খবরে বলা হয়, কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে সারের দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন কৃষকেরা। গত বুধবার সকালে উপজেলার সোনাহাট বাজারে বিএডিসি অনুমোদিত সার ডিলার পয়েন্ট মেসার্স রাকিবুল ট্রেডার্সে সার নিতে এসে কৃষকরা জানতে পারেন, ওই দিন সার বিতরণের কথা নেই। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে শতাধিক কৃষক ডিলার পয়েন্টের সামনে সোনাহাট স্থলবন্দর সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। ফলে সড়কের উভয় পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে উপজেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে সার বিতরণের আশ্বাস পেয়ে অবরোধ তুলে নেন তারা। এরপর পুলিশ, বিজিবি ও আনসার সদস্যদের উপস্থিতিতে কৃষকদের মধ্যে সার বিতরণ করা হয়। এর আগেও সার বিতরণ নিয়ে বিভিন্নস্থানে কৃষকদের বিক্ষোভের, অসন্তোষের খবর পাওয়া গেছে। এটি কৃষকের অসন্তোষের পাশাপাশি সার সরবরাহ ও বিতরণব্যবস্থার দুর্বলতারও একটি স্পষ্ট সংকেত।

ধানসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন নির্ভর করে সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার প্রয়োগের ওপর। কৃষক জমি প্রস্তুত করেন, বীজ কেনেন, সেচ দেন, শ্রমিকের মজুরি দেন— সবশেষে নির্দিষ্ট সময়ে সার প্রয়োগ করতে না পারলে আগের বিনিয়োগও ঝুঁকিতে পড়ে। ফলে সার সংকটের অর্থ শুধু বাজারে একটি পণ্য না পাওয়া নয়; এর অর্থ কৃষকের উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা। আর এখানেই প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ— দেশে পর্যাপ্ত সার থাকার পরও মাঠপর্যায়ে সংকট তৈরি হয় কেন? সরকারের পক্ষ থেকে প্রায়ই বলা হয়, দেশে সারের মজুত পর্যাপ্ত, সার সংকট নেই। গত বুধবারও সংসদে কৃষিমন্ত্রী বলেছেন, সার সংকট নেই। বিরোধীদলীয় একজন সদস্য বলেছেন, গুদামে থাকলেও মাঠে নেই, বাড়তি দামে কৃষক সার কিনছে।

জাতীয় পর্যায়ের মজুত আর কৃষকের হাতে সময়মতো সার পৌঁছানো এক বিষয় নয়। গুদামে সার পড়ে থাকলেই কৃষকের সমস্যার সমাধান হয় না। ইউনিয়ন, উপজেলা ও ডিলার পর্যায়ে সঠিকভাবে সরবরাহ নিশ্চিত করাই মূল বিষয়। কোথাও যদি কৃষক ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও সার না পান, অথচ অন্যত্র বেশি দামে সার পাওয়া যায়, তাহলে সরবরাহ ব্যবস্থার কোথাও না কোথাও অনিয়ম বা দুর্বলতা রয়েছে—এটি অস্বীকার করার উপায় নেই।

সার সংকটের সুযোগ নিয়ে একটি অসাধু চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে— এমন অভিযোগও নতুন নয়। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, অতিরিক্ত মজুত, নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি কিংবা কৃষকের পরিবর্তে অন্যত্র সার সরিয়ে দেওয়ার মতো অনিয়ম ঘটলে তার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক। তাই সার বিতরণব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন জরুরি। কোন এলাকায় কত জমিতে কোন ফসল হচ্ছে, সে অনুযায়ী সারের চাহিদা কত এবং বরাদ্দকৃত সার কোথায় যাচ্ছে— এসব তথ্যের ভিত্তিতে কার্যকর সরবরাহ পরিকল্পনা করতে হবে। শুধু ডিলার নিয়োগ করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; ডিলাররা যথাযথভাবে সার বিক্রি করছেন কি না, তাঁদের মজুত কত, কত দামে বিক্রি করছেন— এসব নিয়মিত নজরদারির আওতায় আনতে হবে।

কৃষকের অভিযোগকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কৃষকদের বিক্ষোভকে যদি শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখা হয়, তাহলে মূল সমস্যাটি আড়ালে থেকে যাবে। কৃষক কেন বিক্ষোভে নামলেন— এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। দেশের বিভিন্ন স্থানের সার সংকটকে তাই সরকারের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা উচিত। ডিলার পর্যায়ে জবাবদিহি বাড়াতে হবে, বাজার তদারকি জোরদার করতে হবে এবং কৃষকের কাছে নির্ধারিত দামে সার পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে। কৃষক যেন সারের জন্য বিক্ষোভ করতে বাধ্য না হন— এটাই হওয়া উচিত সরকারের প্রথম লক্ষ্য। কৃষকের হাতে সার পৌঁছানো মানেই দেশের খাদ্যনিরাপত্তার ভিত শক্ত করা।