- জ্বালানি খাতে আমদানি ব্যয় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বাড়তে পারে
এলএনজি আমদানির জন্য তিন দফায় বিজ্ঞপ্তি দিয়েও কোন দরদাতা পাওয়া যায়নি। রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি (আরপিজিসিএল) গত বুধবার দরপত্র আহ্বান করলেও কোন প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখায়নি। প্রতিষ্ঠানটির শর্টলিস্টে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে ২৯টি কোম্পানি রয়েছে।
চলতি মাসে ১০ কার্গো এলএনজি আমদানি করা হবে, এগুলো ৮ সেপ্টেম্বর সরবরাহের তালিকায় রয়েছে। কার্গো পাওয়া না গেলে চলমান গ্যাস সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে, ইতোমধ্যেই সরবরাহ খানিকটা কমিয়ে রাখা হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ দেওয়া হলেও বুধবার দেওয়া হয়েছে ৭০৮ মিলিয়ন। যাতে করে হঠাৎ করে একবারে বন্ধ না হয়ে যায়।
সূত্র জানায়, ইরান যুদ্ধের পর এমনিতেই সংকটের মধ্যদিয়ে যাচ্ছিল গ্যাস খাত। ২১ জুলাই মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির এফএসআরইউ (ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল)-এ অগ্নিকান্ডের ঘটনায় সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করে। কয়েক সপ্তাহ পরে এফএসআরইউ মেরামত হলে শুরু হয় কার্গো সংকট। সেই সংকট থেকে বের হতে পারছে না বাংলাদেশ।
এলএনজির নির্ভরযোগ্য উৎস ছিল কাতার এবং ওমান থেকে জিটুজি ভিত্তিতে আমদানি। হরমুজ প্রণালি বন্ধের কারণে কাতার ও ওমান থেকে এলএনজি পাওয়া যাচ্ছে না। যে কারণে স্পট মার্কেট থেকে দ্বিগুন দামে কিনতে হচ্ছে।
আগস্টে ডিপিএম পদ্ধতিকে ৪ কার্গো এলএনজি আমদানির আদেশ দেওয়া হয়। যেগুলো কোনটাই দেশে আসেনি, যে কারণে মারাত্মক গ্যাস সংকট চলছে। এতে করে শিল্প থেকে শুরু করে, আবাসিক, সার ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ভয়াবহ ঘাটতি বিরাজ করছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে ২ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে ৭০০ থেকে ৯০০ মিলিয়নের মতো। এ কারণে বিদ্যুতের ভয়াবহ লোডশেডিং শুরু হয়েছে দেশজুড়ে।
সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়। কার্গো না পাওয়ায় প্রচেষ্টায় বড় ধাক্কা বলে মনে করা হচ্ছে। মতান্তরে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে ২ সেপ্টেম্বর দেশীয় উৎস থেকে ১ হাজার ৬২৫ মিলিয়ন ঘনফুট এবং আমদানিকৃত এলএনজি থেকে ৭১৪ মিলিয়ন ঘনফুট মিলে ২ হাজার ৩৩৯ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হয়েছে।
সেপ্টেম্বর আমদানিতে থেকে ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে পেট্রোবাংলা। এ জন্য ১০ কার্গো এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ৮ কার্গো এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত হয়েছে। আরও ২ কার্গো আমদানির জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। একটি ৮ সেপ্টেম্বর, অপরটি ২৫ সেপ্টেম্বরের তালিকায় রাখার কথা জানিয়েছে পেট্রোবাংলা।
আরপিজিসিএল সূত্র জানিয়েছে, সরবরাহ নিশ্চিত করতে সবগুলো চড়াদামে আমদানি করতে হচ্ছে। ইতোমধ্যে নিশ্চিত করা ৮ কার্গোর মধ্যে ২ সেপ্টেম্বর সৌদি আরামকো (প্রতি এমএমবিটিইউ ২৩.৯৩ ডলার) ৪ সেপ্টেম্বর বিটিশ পেট্রোলিয়াম (২১.৭৭ ডলার) ১০ সেপ্টেম্বর আরামকো (২৪.৩৫ ডলার), ১৩ সেপ্টেম্বর কোরিয়ান কোম্পানি পসকো ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন (২৪.৬২ ডলার), মার্কিন কোম্পানি গানভর (২৪.২৯ ডলার) ১৯ সেপ্টম্বর আরামকো (২৪.৩৩ ডলার) যুক্তরাজ্যের টোটাল এনার্জিস গ্যাস অ্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড (২৪.২৫ ডলার), আর ২৯ সেপ্টেম্বর গানভর (২৪.২৯ ডলার) এক কার্গো সরবরাহ দেবে।
এলএনজি পাওয়া নিয়ে যখন সংকট, তখন আকাশচুম্বি দর মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে বাংলাদেশকে। জিটুজি ভিত্তিতে কমবেশি ১০ ডলারে আমদানি হতো, সেই এলএনজি এখন ২১ থেকে ২৮ ডলার দিয়ে কিনতে হচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাস (জুন-মার্চ) গড় ক্রয়মূল্য পড়েছে ২৭.৬৪ টাকা। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর (এপ্রিল-জুন ২০২৬) গড় ক্রয়মূল্য উঠেছে ৪৫.৭৯ টাকায়। ওই ৩ মাস গড় বিক্রয়মূল্য ২৩.৬৩ টাকায় বিক্রি করায় প্রতি ঘনমিটারে ঘাটতি হয়েছে ২১.৮২ টাকা। এতে করে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পেট্রোবাংলার ঘাটতি হয়েছে প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। বাড়তি দামে আমদানির কারণে চলতি অর্থবছরে ভর্তুকি কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে ৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ থাকলেও প্রথম ২ মাসে ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, গ্যাস ও কয়লার দাম বর্তমান পর্যায়ে থাকলে ২০২৬ সালে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে আমদানি ব্যয় গত বছরের (২০২৫ সালের) তুলনায় সর্বোচ্চ ২৮০ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বাড়তে পারে। এতে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি, মূল্যস্ফীতি ও টাকার ওপর চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। মূলত এলএনজি আমদানি নির্ভরতার কারণে এ সংকট ঘনীভূত হয়েছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা জিরো কার্বন অ্যানালিটিকস (জেডসিএ)-এর এক বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সংস্থাটির হিসাবে, চলতি বছর জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি ব্যয় ২০২৫ সালের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি হতে পারে। বাড়তি এই ব্যয় বাংলাদেশের মোট বাণিজ্য ঘাটতির প্রায় ১০ শতাংশের সমান।
জেডসিএ বলছে, জ্বালানির বর্তমান দাম অব্যাহত থাকলে আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতা কমে বাংলাদেশের আমদানি কভার ৫ দশমিক ৭ মাস থেকে ৫ দশমিক ২ মাসে নেমে আসতে পারে।
সংস্থাটির বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত যে অর্থ ব্যয় হতে পারে, তা দিয়ে প্রায় ৮ গিগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা সম্ভব। এই পরিমাণ সৌরবিদ্যুৎ দেশের বর্তমান প্রায় ৩২ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার সঙ্গে আরও প্রায় ২৫ শতাংশ সক্ষমতা যোগ করতে পারে।
এলএনজি আমদানি কমেছে, ব্যয় কমেনি
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশের এলএনজি আমদানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ কমেছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে জুলাই ও আগস্টে। এ সময়ে হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ বিঘ্নের কারণে এলএনজি আমদানি প্রায় ৮৩ শতাংশ কমে যায়।
জেডসিএর তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে বাংলাদেশ প্রায় ৬ লাখ ৩০ হাজার টন এলএনজি আমদানি করলেও আগস্টে তা নেমে আসে ১ লাখ ১০ হাজার টনে।
তবে আমদানি কমলেও জ্বালানি ব্যয় কমেনি। বরং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেশি থাকায় সামগ্রিক আমদানি ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৬৪ শতাংশ গ্যাসনির্ভর। ফলে এলএনজি সরবরাহে কোনো ধরনের বিঘ্ন হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও তার সরাসরি প্রভাব পড়ে। গত ১১ আগস্ট দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ ঘাটতি ৩ হাজার ৫৯২ মেগাওয়াটে পৌঁছেছিল, যা ওই সময়ের মোট চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ।