দৈনিক সংগ্রামের গত ২৯ আগস্ট সংখ্যায় শিরোনামীয় বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানী সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত সংবাদটি নানা কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে বর্তমানে সবচেয়ে জটিল সমস্যা হিসেবে বিরাজ করছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি। চার বছরেরও বেশি সময় ধরে আমাদের অর্থনীতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। মূল্যস্ফীতির হার সাড়ে ৮ থেকে ১০ শতাংশের কাছাকাছি উঠানামা করছে। করোনা উত্তর বিশ^ অর্থনীতি যখন উত্তরণের পর্যায়ে ছিল তখন ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয়। এতে বিশ^ব্যাপী সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ে। ফলে বিশ^ব্যাপী উচ্চ মূল্যস্ফীতি প্রবণতা দেখা দেয়। বিভিন্ন দেশ নানা প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে সক্ষম হলেও বাংলাদেশ এক্ষেত্রে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শ্রীলঙ্কা যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে তা স্মরণীয় হয়ে আছে। ২০২২ সালে সেপ্টেম্বর মাসে দেশটির মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছিল ৬৯ দশমিক ৮ শতাংশ, যা গত জুলাই মাসে ৭ দশমিক ২ শতাংশে নেমে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ভুল নীতির কারণে মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশিত মাত্রায় না কমে বরং আরো বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য পলিসি রেট বারবার বাড়িয়েছে। কিন্তু ব্যাংক ঋণের সুদের সর্বোচ্চ হার দীর্ঘদিন পর্যন্ত ৯ শতাংশে ফিক্সড করে রেখেছিল। ফলে বাজারে অর্থ প্রবাহ অপ্রত্যাশিতভাবে বেড়ে যায়, যা মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেয়। অর্থনীতিবিদগণ অবশ্য মনে করেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতি অর্থনীতির সাধারণ নিয়ম মেনে চলে না। তাই শুধু সংকোচমূলক মুদ্রানীতি প্রয়োগ করে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। আমাদের মূল্যস্ফীতির প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করে তা নিরসনের জন্য চেষ্টা চালাতে হবে।
বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির প্রকৃত কারণ হচ্ছে বাজারে তৎপর ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। বাংলাদেশ তার নিত্য ব্যবহার্য পণ্যের ২৫ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে থাকে। অবশিষ্ট ৭৫ শতাংশ পণ্য অভ্যন্তরীণভাবে উৎপাদিত এবং যোগান দেয়া হয়। কিন্তু পণ্য যোগান বা সাপ্লাই ব্যবস্থা মোটেও প্রতিবন্ধকতাহীন নয়। তৃণমূল পর্যায়ের একজন উৎপাদক পণ্য উৎপাদনের পর নানা কারণেই তা সরাসরি ভোক্তার নিকট উপস্থাপন করতে পারেন না। তারা উৎপাদিত পণ্য সংরক্ষণও করতে পারেন না। উৎপাদনের পর পরই তারা পণ্যটি বিক্রি করে দেন। মধ্যস্বত্বভোগীরা তৃণমূল পর্যায়ের উৎপাদকদের নিকট থেকে পণ্যটি ন্যূনতম মূল্যে কিনে এনে ভোক্তা পর্যায়ে দ্বিগুণ তিনগুণ মূল্যে বিক্রি করে থাকেন। যে পণ্যটি হয়তো গ্রাম পর্যায়ে একজন উৎপাদক ১০ টাকায় বিক্রি করেন সে পণ্যটিই বাজারে এসে ভোক্তা পর্যায়ে ৩০ বা ৪০ টাকায় বিক্রি হয়। বিদ্যমান ব্যবস্থায় তৃণমূল পর্যায়ের উৎপাদক তার উৎপাদিত পণ্যের সঠিক মূল্যপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হন। আর ভোক্তা প্রত্যাশিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যে পণ্য ক্রয় করতে বাধ্য হন। বাজারে যারা ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট হিসেবে কাজ করেন তারা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং ঐক্যবদ্ধ। তারা সব সময়ই সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে চলেন। যে কারণে সরকার পরিবর্তন হলেও তাদের কর্মকা-ে কোন অসুবিধা হয় না।
লোকবল সঙ্কটের কারণে সরকারের পক্ষে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। ভোক্তা অধিদপ্তরে লোকবল বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে শক্তিশালী করা যেতে পারে। বাজারে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদে তৃণমূল পর্যায়ের উৎপাদকদের নিকট থেকে সমবায়ের ভিত্তিতে সরাসরি পণ্য ক্রয় করে বাজারকরণের ব্যবস্থা করা হলে বাজারে তৎপর সিন্ডিকেটের দাপট কমে যেতে পারে। ব্যবস্থাটি এ রকম হতে পারে- উপজেলা পর্যায়ে এক বা একাধিক নির্দিষ্ট পয়েন্ট বা বাজার নির্ধারণ করা হবে। তৃণমূল পর্যায়ের উৎপাদকগণ তাদের উৎপাদিত পণ্য সেই বাজারে নিয়ে আসবে এবং সরকার নিয়োজিত প্রতিনিধিদের নিকট নির্ধারিত মূল্যে তাদের পণ্য বিক্রি করবে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় ক্রয়কৃত পণ্য সরাসরি দেশের বিভিন্ন শহরে পৌঁছে দেয়া হবে। এটা করা হলে বিদ্যমান সমস্যা অনেকটাই সমাধান হতে পারে।
দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় দীর্ঘদিন উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজমান থাকায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। তারা কোনভাবেই পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না। অনেকেই আছেন যারা পরিস্থিতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কুলিয়ে উঠতে না পেরে শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যাচ্ছেন। এটা কোনভাবেই কাম্য হতে পারে না। বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ৪ থেকে ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি গ্রহণীয় হতে পারে। অবস্থা স্বাভাবিক করার জন্য মূল্যস্ফীতির প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করে তা সমাধানের জন্য ব্যবস্থা করতে হবে। উল্লেখ্য, মূল্যস্ফীতি হচ্ছে, ‘নিঃশব্দ ঘাতকের মতো, যা একটি জনপ্রিয় সরকারকেও অজনপ্রিয় করে তুলতে পারে। তাই সময় থাকতে সাবধান হওয়াই বাঞ্ছনীয়।