রাজধানীর গণপরিবহনে নারীদের নিরাপত্তা, স্বাচ্ছন্দ্য ও চলাচলের সুযোগ বাড়াতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) ‘পিংক বাস’ সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। নারী চালক ও কন্ডাক্টর দিয়ে পরিচালিত এ বিশেষ বাস সার্ভিস শুধু নারীদের নিরাপদ যাতায়াতের একটি নতুন সুযোগ তৈরি করবে না, একই সঙ্গে পরিবহন খাতে নারীদের কর্মসংস্থান ও অংশগ্রহণও বাড়াবে। প্রাথমিকভাবে ঢাকাসহ দেশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রুটে এ সেবা চালু হওয়া তাই ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার যোগ্য।
বাংলাদেশের শহরগুলোতে গণপরিবহনে নারীদের নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। অতিরিক্ত ভিড়, বাসে ওঠানামার অসুবিধা, যৌন হয়রানি, অনিরাপদ পরিবেশ এবং অনেক ক্ষেত্রে চালক ও সহকারীদের অসৌজন্যমূলক আচরণ নারীদের গণপরিবহন ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করে। এর প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত চলাচলের ওপর পড়ে না, শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে নারীদের অংশগ্রহণও বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে নারীবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা নারী ক্ষমতায়নেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে ‘পিংক বাস’ চালু করাই যেন উদ্যোগের শেষ ধাপ না হয়। বরং এটি একটি বৃহত্তর নারীবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থার সূচনা হওয়া প্রয়োজন। বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত শহরে নারীর নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে গণপরিবহন ব্যবস্থায় নানা ধরনের ব্যবস্থা চালু রয়েছে। কোথাও বাস ও ট্রেনে পর্যাপ্ত আলো, সিসিটিভি ক্যামেরা ও জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা রয়েছে; কোথাও চালক ও কর্মীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। অনেক শহরে রাতে বাসস্টপে নিরাপত্তা বাড়ানো, নির্দিষ্ট অ্যাপ বা হটলাইনের মাধ্যমে অভিযোগ গ্রহণ এবং দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।
বাংলাদেশেও এসব অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। পিংক বাসে সিসিটিভি ক্যামেরা, জরুরি বাটন বা দ্রুত সহায়তা চাওয়ার ব্যবস্থা, জিপিএস ট্র্যাকিং এবং অভিযোগ জানানোর সহজ ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। প্রতিটি বাসের চালক ও কর্মীদের নারী ও শিশুদের সঙ্গে আচরণ, হয়রানি প্রতিরোধ এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাসস্টপগুলোও নিরাপদ করতে হবে। একটি নিরাপদ বাস যদি অন্ধকার, জনবিচ্ছিন্ন বা অনিরাপদ স্টপেজে থামে, তাহলে পুরো ব্যবস্থার উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময়সূচি ও নির্ভরযোগ্যতা। উন্নত নগর পরিবহনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো নির্দিষ্ট সময়সূচি, পর্যাপ্ত বাস এবং যাত্রীর প্রয়োজন অনুযায়ী রুট পরিকল্পনা। পিংক বাস যদি দীর্ঘ সময় পরপর আসে, নির্দিষ্ট সময় মেনে না চলে কিংবা অতিরিক্ত ভিড়ে পরিণত হয়, তাহলে এর কার্যকারিতা কমে যাবে। তাই যাত্রীসংখ্যা, অফিস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সময় এবং নগরীর ব্যস্ততার ধরন বিশ্লেষণ করে নিয়মিতভাবে রুট ও সময়সূচি পর্যালোচনা করা উচিত।
শুধু আলাদা বাস চালু করলেই নারীবান্ধব গণপরিবহন নিশ্চিত হবে না। ঢাকার সামগ্রিক গণপরিবহন ব্যবস্থাকেই নারীবান্ধব করতে হবে। সাধারণ বাস, মেট্রোরেল, রেল, লঞ্চ ও অন্যান্য গণপরিবহনেও নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ প্রতিদিনের যাতায়াতে একজন নারী কেবল পিংক বাসের ওপর নির্ভর করবেন না। তাকে বাসা থেকে বাসস্টপ, সেখান থেকে অন্য পরিবহন এবং শেষ গন্তব্য পর্যন্ত পুরো পথটিই নিরাপদে অতিক্রম করতে হবে। এখানে নারী চালক ও পরিবহনকর্মী নিয়োগের বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। পিংক বাসে নারী চালক ও কন্ডাক্টর নিয়োগ একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে। তবে নারীদের প্রশিক্ষণ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, ন্যায্য বেতন এবং ক্যারিয়ার উন্নয়নের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। শুধু নারীকে কর্মী হিসেবে নিয়োগ নয়, পরিবহন খাতে নারীর দীর্ঘমেয়াদি অংশগ্রহণের পথও তৈরি করতে হবে।
পিংক বাসের ভাড়া ও সেবার মানও সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে হবে। এটি যেন কেবল বিশেষ শ্রেণির নারীদের জন্য একটি সীমিত সেবা হয়ে না দাঁড়ায়। শিক্ষার্থী, কর্মজীবী নারী, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের নারীসহ বিভিন্ন শ্রেণির যাত্রী যাতে এ সেবা ব্যবহার করতে পারেন, সেদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজনে যাত্রীদের মতামত নিয়ে সেবার মান উন্নত করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই উদ্যোগের সাফল্য পরিমাপ করতে হবে বাস্তব ফলাফলের ভিত্তিতে। কতজন নারী নিয়মিত পিংক বাস ব্যবহার করছেন, যাত্রীরা কতটা নিরাপদ বোধ করছেন, সময়ানুবর্তিতা কেমন, অভিযোগের সংখ্যা কত এবং অভিযোগের সমাধান কত দ্রুত হচ্ছে, এসব বিষয়ে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ করা যেতে পারে। একটি শহর তখনই সত্যিকার অর্থে আধুনিক ও বাসযোগ্য হয়ে ওঠে, যখন সেখানে নারী নির্ভয়ে, স্বাচ্ছন্দ্যে ও মর্যাদার সঙ্গে চলাচল করতে পারেন। তাই পিংক বাসের যাত্রা সফল হোক, আরও রুটে বিস্তৃত হোক এবং এর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের গণপরিবহন ব্যবস্থা সামগ্রিকভাবে আরও নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও নারীবান্ধব হয়ে উঠুক। এটিই হওয়া উচিত এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।