স্টাফ রিপোর্টার

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ৯ জনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন শহীদ শাহরিয়ার হোসেন রোকনের বাবা মো. মনির হোসেন। এ মামলায় সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসসহ মোট আসামী ২৮ জন। ছেলেকে হত্যাসহ মোহাম্মদপুরের ঘটনার জন্য আসামীদের দায়ী করে বিস্তারিত বর্ণনা দেন তিনি।

গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে তার জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়।

প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর তারেক আবদুল্লাহ। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর সহিদুল ইসলাম সরদার, মামুনুর রশিদসহ অন্যান্য প্রসিকিউটর।

৫৪ বছর বয়সি মনির হোসেন বর্তমানে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে থাকেন। তিনি কাঁচামালের একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় শহীদ শাহরিয়ার হোসেন রোকন তার বড় ছেলে ছিলেন। তিনিও বাবার মতো ক্ষুদ্র ব্যবসা করতেন।

জবানবন্দীতে মনির হোসেন বলেন, চকবাজার থেকে মালামাল কিনে নিয়ে মোহাম্মদপুরে বিভিন্ন দোকানে সরবরাহ করতো রোকন। সরবরাহ করার পরদিন টাকা আনতে যেতো। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রোকনের সঙ্গে অনেক টাকা ছিল। ওই দিন নিজের বন্ধুবান্ধবসহ অনেক আন্দোলনকারীকেই মোহাম্মদপুরের ময়ূর ভিলা এলাকায় জমায়েত হতে দেখে রোকন। তখন পুলিশ ও হেলমেট পরা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে আন্দোলনকারীদের গুলী করছিলেন। একপর্যায়ে আমার দুই ভাগনে সোহেল ও আলামিন এসে আমাকে বলল যে, ‘মামা রোকনের গায়ে গুলী লেগেছে’। রোকন কোথায় আছে জানতে চাইলে মমতাজ ট্রমা হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে বলে তারা জানায়। আমি তড়িঘড়ি করে হাসপাতালে গিয়ে দেখি তাকে একটি স্ট্রেচারে শুয়ে রাখা হয়েছে।

ডাক্তাররা আমাকে বলেন যে, ‘আপনার ছেলের সারা শরীরে গুলীবিদ্ধ হয়েছে। তাকে এখানে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব নয়। দ্রুত সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।’ পরবর্তী সময়ে আমি, আমার ভাগনে আলামিন, সোহাগ ও আলম মিলে রোকনকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিই।

সাক্ষী বলেন, সোহরাওয়ার্দীতে নেওয়ার পর রোকনের মুখে একটি অক্সিজেন মাস্ক দেন চিকিৎসক। মুহূর্তেই মাস্কটি খুলে ফেলে ডাক্তাররা আমাকে বলেন, ‘আপনার ছেলে আর নেই’। এ পর্যায়ে ট্রাইব্যুনালে কান্নায় ভেঙে পড়েন মনির হোসেন।

তিনি বলেন, আমি ডাক্তারের কাছে রোকনের মৃত্যুর সনদপত্র চাই। ডাক্তার আমাকে ধমক দেন। মৃত্যুসনদ দিতেও অস্বীকার করেন তারা। এরপর ডাক্তাররা আমাকে একটি সাদা কাপড় ধরিয়ে দিয়ে রোকনের শরীর ঢেকে নিয়ে যেতে বলেন। তারা আরও বলেন, ‘পথে কেউ জিজ্ঞেস করলে রোকনের গুলীবিদ্ধ হওয়ার খবরটি বলবেন না’। এরপর রিকশায় করে রোকনের লাশ বাসায় নিয়ে আসি। শুক্রবার থাকায় লাশটি হাসপাতাল থেকে নিতে দেরি হয়েছিল।

রোকনের বাবা বলেন, রোকনকে বাসায় নিয়ে আসার সময় মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে আওয়ামী লীগের হেলমেটধারী লোকজনকে ব্যাপকহারে গুলী করতে দেখি। সেখানে অনেক লোকজন ছিলেন। কারও হাতে লাঠি, কারও হাতে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। রোকনকে গোসল করান আমাদের বাসার কাছের একজন হুজুর। জানাযার পর তাকে রায়ের বাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়।

তিনি বলেন, ১৯ জুলাই সারাদিনই মোহাম্মদপুর এলাকায় গোলাগুলী হয়। পুরো ঢাকা শহরে হতাহত হয়েছে। আমি এ ঘটনার জন্য আওয়ামী লীগকে দায়ী করি। শেখ হাসিনাই এসবের নির্দেশদাতা ছিলেন বলে বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পেরেছি। আমি আরও যাদের দায়ী করি, তাদের মধ্যে রয়েছেন তাপস, নানক, পুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমান, বিপ্লব, জোয়ার্দার, রানা, ইসমাইল, কমিশনার রাষ্ট্রন, আসিফ, সেন্টু, পলাশ ও নাইমুর রহমান রাসেলদের।

জবানবন্দী শেষে মনির হোসেনকে জেরা করেন গ্রেপ্তার ও পলাতক আসামীপক্ষের আইনজীবীরা।

মামলায় ২৮ আসামীর মধ্যে গ্রেপ্তার আছেন চারজন। তারা হলেনÑ নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মোহাম্মদপুর থানা শাখা সভাপতি নাঈমুল হাসান রাসেল, সহসভাপতি সাজ্জাদ হোসেন, আনসার সদস্য ওমর ফারুক ও যুবলীগকর্মী ফজলে রাব্বি।

পলাতক আসামীদের মধ্যে রয়েছেনÑ সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক অ্যাডিশনাল ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ারদার, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার, এডিসি রওশুনুল হক, এমএ সাত্তার, তোফায়েল, তারেকুজ্জামান, আরিফুর রহমান তুহিন, আহাদ হোসাইন, মো. ইউনূস, মোল্লা রুবেল, আজিজুল হক, রিয়াজ মাহমুদ, হৃদয়, মাইনুল ইসলাম, শেখ বজলুর রহমান, জহির উদ্দিন, আয়মান, সেন্টু মিয়া ও ডিএনসিসির ৩২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর সৈয়দ হাসান নূর ইসলাম রাষ্ট্রন।