সভ্যতা পথ হারালে শাসকরা পথ দেখাবেন কেমন করে? সাম্প্রতিককালে শাসকদের রোজনামচাও ভালো নয়। ডায়েরিতে তাদের জন্য তেমন কোনো উজ্জ্বল দিন নেই। দিনকে অন্ধকার করার মতো অনেক কিছুই আছে তাদের আমলনামায়। তবে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় শক্তি ও প্রতাপের কথা। এক সময় বিদ্বজ্জনরা বলতেনÑকোনো কিছুর ভিত্তিতে সত্য ও ন্যায় না থাকলে, তা টিকে থাকতে পারে না। তবে বর্তমান সভ্যতায় এই নীতিকথাকে অস্বীকার করার প্রবণতা বেশ প্রবল। শক্তি ও প্রতাপকে সবকিছুর নিয়ামক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছেন সভ্যতার শাসকরা। নন ইস্যুকে তারা ইস্যু করছেন এবং প্রকৃত ইস্যুকে চাইছেন কবর দিতে। তাদের এমন দানবীয় প্রবণতায় বিশ্বের অশান্তি ও অস্থিরতার মাত্রা বেড়েই চলেছে। তারপরও দাম্ভিক ও অস্ত্রবাজ নেতারা আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছেন শান্তি ও সমৃদ্ধির বয়ান ঝাড়তে।
ইরান যুদ্ধের প্রভাব শুধু তিনদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অন্যান্য দেশেও তার প্রভাব পড়ছে। জ¦ালানি সংকটের কারণে দেশে দেশে বেড়ে চলেছে নিত্যপণ্যের দাম। এতে কষ্টে পড়েছে বিশ্বের কোটি কোটি সাধারণ মানুষ। তাতে দাম্ভিক শাসকদের কি আসে যায়। তারা তো শক্তি ও প্রতাপ নিয়ে মশগুল। যুদ্ধের পরিবেশ থেকে ফিরে আসাটা যেন তাদের জন্য লজ্জার বিষয়। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যুদ্ধকৌশল সাফল্যের মুখ দেখতে সমর্থ হচ্ছে না। ফক্স নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন সামরিক বাহিনীর সীমিত বিমান হামলার কৌশল পরিস্থিতি পরিবর্তনে সমর্থ হয়নি। ইরানকে পৃথিবীর বুক থেকে মুছে ফেলার বিষয়ে ট্রাম্পের হুমকিও কোনো কাজে আসেনি। কূটনৈতিক আলোচনায় যখনই কোনো আশার আলো দেখা দেয়, তখনই কোনো না কোনো প্রতিবন্ধকতা এসে অগ্রগতি থামিয়ে দেয়। এখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার নজর ঘুরিয়েছেন অর্থনৈতিক যুদ্ধের দিকে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপের মুখে তাদের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সামরিক হামলা জোরদারের কৌশল নিচ্ছে ইরান। অর্থাৎ শক্তি ও প্রতাপের বলয় থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না সভ্যতা। ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ালে দেশটি নতি স্বীকার করবে বলে মনে করছেন ট্রাম্প। হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার আশায় ইরানিদের আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করতে অর্থনীতি পঙ্গু করে দেওয়ার মতো কঠোর নিষেধাজ্ঞা ছাড়াও মার্কিন নৌ-অবরোধের ওপর নির্ভর করতে চাইছেন ট্রাম্প। তার প্রশাসনের আশা, মাসের পর মাস ধরে চলা বোমাবর্ষণ ইরানের অর্থনীতিকে এমন এক অবস্থায় পৌঁছে দিয়েছে যে, যা দেশটির নেতৃত্বকে পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করার এবং হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুুলে দেওয়ার দাবি মেনে নিতে বাধ্য করবে। ট্রাম্প বলতে চাইছেন, ইরান এখন অর্থনৈতিক পতনের দ্বারপ্রান্তে। অথচ দেশটি ইতিমধ্যেই কয়েক দশকের আর্থিক নিষেধাজ্ঞার মধ্য দিয়ে গেছে এবং তা দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হিসেবেই বেশি কাজ করেছে। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়া এবং থেমে থেমে চলা আলোচনা আবারও স্থবির হয়ে পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে কৌশল পরিবর্তনের বিষয়টি সামনে এলো।
লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপের পরও বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। আর্থিক নিষেধাজ্ঞার কৌশলে ইরান ভয় পেয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। এ বিষয়টি তো তাদের কাছে নতুন কিছু নয়। এদিকে হরমুজ প্রণালিতে আরও দু’টি জাহাজে হামলা এবং ইরানকে অনির্দিষ্টকালের জন্য নৌ-অবরুদ্ধ করে রাখার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণার পর শুক্রবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বর্ধিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে সামরিক হামলা চালাতে পারে ইরান, এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। পারস্য উপসাগরে মার্কিন সেনা সমাবেশকে নিজেদের সুবিধার্থে ব্যবহার করতে ইরানি বাহিনী গেরিলা ধাঁচের ‘হিট অ্যান্ড রান’ আক্রমণের দিকে ঝুঁকতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজ-এর জ্যেষ্ঠ ফেলো বেহনাম বেন তালেবলু ফক্স নিউজ ডিজিটালকে বলেছেন, ওয়াশিংটন নিষেধাজ্ঞা জোরদার করায় তেহরান সামরিক চাপ বৃদ্ধি করতে পারে। উপলব্ধি করা যায়, শক্তি ও প্রতাপের পাটাতনে দাঁড়িয়ে ট্রাম্প প্রশাসন হরেক রকম কৌশল অবলম্বন করলেও তা সাফল্যের মুখ দেখছে না, এতে বরং ক্ষতি হচ্ছে উভয় দেশের। আর রাজনৈতিক বিবেচনায় বেশি ক্ষতি হচ্ছে ট্রাম্পের। জ¦ালানি ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে ট্রাম্পের জনসমর্থন হ্রাস পাচ্ছে। যুদ্ধবাজ নেতানিয়াহুর ফাঁদে পা দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ছাত্র-জনতা এখন ট্রাম্পের পাশাপাশি নেতানিয়াহুর ওপরও বেশ বিরক্ত। বিরক্তির মাত্রা ক্রমেই বাড়ছে বলে জানান দিয়েছে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান।
শক্তি ও প্রতাপের যে রাজনীতি এবং বিশ্বব্যবস্থা, তাতে চিড় ধরতে শুরু করেছে পাশ্চাত্যে; আমাদের সার্ক অঞ্চলেও তা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ছাত্র-জনতা, বিশেষ করে তরুণরা শক্তি ও প্রতাপের যে আধিপত্যবাদ, তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালের পর এখন তা লক্ষ্য করা যাচ্ছে এ অঞ্চলের বড় দেশ ভারতেও। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের ওপর ‘জেন-জিদের রাগ কিছুতেই কমছে না। কেন যে তিনি বেকার যুবকদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে ‘তেলাপোকা ও পরজীবী’ বলতে গেলেন। হায়দরাবাদের ন্যাশনাল একাডেমি অব লিগ্যাল স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চের (নালসার) বার্ষিক সমাবর্তনে সূর্য কান্তকে প্রধান অতিথি করার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছেন সেই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। সেই সিদ্ধান্ত ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে নতুন বিতর্ক ও জটিলতা। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা ও রাষ্ট্রীয় আহ্বায়ক অভিজিৎ দিপকে সেই বিতর্কে ঢুকে প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে বলেছেন, ‘আইন পেশার সব তেলাপোকা একত্র হলে কী হবে?’ এই অবস্থায় পিছু হটছে নালসার কর্তৃপক্ষ। প্রধান বিচারপতিকে আমন্ত্রণ জানালেও সমাবর্তনের তারিখ ঘোষণা করেনি তারা। পিছু হটছে বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়াও (বিসিআই), যারা জানিয়েছিল কাউন্সিলের নির্দেশ ছড়া নালসার থেকে পাস করা কাউকে কোথাও আইনজীবী হিসেবে নথিভুক্ত করা যাবে না। তবে তেলাপোকাদের চাপে বার কাউন্সিল সেই নির্দেশ প্রত্যাহারে বাধ্য হয়েছে। মাত্র চার ঘণ্টার মধ্যে নির্দেশ প্রত্যাহারের কথা জানিয়েছে বিসিআই। যদিও তেলাপোকারা জানিয়েছে, বিসিআইকে তদন্তের হুকুম ও দোষীদের চিহ্নিত করার নির্দেশও প্রত্যাহার করতে হবে।
ভারতের কোনো প্রধান বিচারপতিকে ঘিরে অতীতে এমন অনভিপ্রেত বিতর্ক দেখা যায়নি। সূর্যকান্ত দেশের একশ্রেণির বেকার যুবকদের ‘তেলাপোকা ও পরজীবী’ বলায় নতুন প্রজন্ম ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) গঠন করে। সেই মন্তব্য জেনজিকে শুধু জোটবদ্ধই করেনি, দেশের শাসক দল বিজেপিকেও কোণঠাসা করেছে। গত ১২ বছরে নরেন্দ্র মোদি সরকার জনতার চাপে যা করেনি, তা করতে বাধ্য হয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতির জন্য শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগে বাধ্য করেছে। তেলাপোকাদের চাপ ও বিরোধীদের দাবির মুখে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ টানা তিন সপ্তাহ সংসদের অধিবেশনে গরহাজির থেকেছেন। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন তটস্থ রেখেছে ঝাড়খণ্ড সরকারকেও। আচমকাই তরুণ প্রজন্ম যেন হয়ে উঠেছে রাজনীতির ভাগ্যনিয়নতা। নালসার-এর ঘটনা তার বড় প্রমাণ।
আচমকা মনে হলেও বিষয়টির শিকড় অনেক গভীরে। আত্মমর্যাদাবোধ কখনো মানুষকে শক্তি ও প্রতাপের কাছে মাথানত করতে দেয় না। তবে বর্তমান সভ্যতায় বড় ধরনের একটি অঘটন ঘটে গেছে। বিজ্ঞান-প্রযুক্তির প্রাগ্রসরতা কিছু মানুষকে দানবে পরিণত করেছে। এইসব মানুষ ভয়ানক মারণাস্ত্র পেয়েছে, পেয়েছে পৃথিবী ধ্বংসের বহু পারমাণবিক অস্ত্র। এদের কারণে রাষ্ট্রের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব এখন আর নিরাপদ নয়। এরা রাষ্ট্রকে ভয় দেখায়, মানুষকে ভয় দেখায়। বিষয়টি ভূরাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ নয়, রাষ্ট্রের ভিতরেও এর সংক্রমণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মনুষ্যত্ব হারালে মানুষ কি আর মানুষ থাকে? তখন তারা দানব হয়ে ওঠে। ওরা এখন ভূরাজনীতিতে এবং দেশের অভ্যন্তরে শক্তি ও প্রতাপের আধিপত্য চালিয়ে যাচ্ছে। এদের মোকাবিলায় প্রয়োজন সাহসী প্রতিরোধ। বর্তমান সভ্যতায়, বিশ্বব্যবস্থায় এবং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে যা চলছে তা শুধু অনৈতিক ও অমানবিক নয়; বৈষশ্যমূলক এবং নৃশংসও বটে। এমন বিশ্বব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ন্যায়সঙ্গত। দ্রোহের সেই পতাকা হাতে তরুণরা এখন নেমে এসেছে রাজপথে। শক্তি ও প্রতাপের যে আধিপত্যবাদ, তার বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান। ধর্ম-বর্ণ-ভাষা নির্বিশেষে সবার ন্যায্য অধিকার তাদের কাম্য। বৈষম্যের বদলে সমতা এবং চাতুর্যের বদলে সততা তাদের লক্ষ্য। এমন পরিবর্তনই বর্তমান সময়ের দাবি।